শিরোনাম
প্রকাশ : ২১ জুন, ২০২১ ০৮:২৪
আপডেট : ২১ জুন, ২০২১ ১০:৪০
প্রিন্ট করুন printer

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন

‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ কৌশল কি বদলে যাচ্ছে?

অনলাইন ডেস্ক

‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ কৌশল কি বদলে যাচ্ছে?
Google News

সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কৌশলে কি পরিবর্তন আসছে? বিদেশের মাটিতে বিপুল সংখ্যক পশ্চিমা জোটের সৈন্য মোতায়েনের দিন কি শেষ? বিশ বছর পর আফগানিস্তান ছেড়ে যাবার জন্য পশ্চিমা দেশগুলোর সৈন্যদের তাড়াহুড়ো দেখে কারো কারো এটা মনে হতে পারে।

মার্কিন-নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশনের যে অবশিষ্ট কয়েক হাজার সৈন্য এতদিন আফগানিস্তানে মোতায়েন ছিল- তারাও এমাসে বিদায় নিচ্ছে।

ইরাকে ব্রিটেন ও অন্য পশ্চিমা দেশগুলোর যে সৈন্যরা এখন আছে- তাদের এখন আর কোনও বড় রকম সরাসরি যুদ্ধের ভূমিকা পালন করতে হচ্ছে না।

আফ্রিকার দেশ মালিতে ফ্রান্সের সৈন্যদের যে সামরিক ভূমিকা ছিল-তাও এখন বহুলাংশে কাটছাঁট করার ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ যে তথাকথিত “সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ” ঘোষণা করেছিলেন- তার ২০ বছর পর এখন কি পশ্চিমা বিশ্ব থেকে বহুদূরের কোনও দেশের যুদ্ধক্ষেত্রে বড় সংখ্যায় সৈন্য মোতায়েনের দিন শেষ হয়ে আসছে?

হয়তো এখনো কথাটা পুরোপুরি সঠিক তা বলা যাবে না। এখনও সাহেল অঞ্চলে জিহাদিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বেশ বড় সংখ্যায় পশ্চিমা সৈন্য নিযুক্ত আছে।

কিন্তু এসব মিশন ভবিষ্যতে কীভাবে চালানো হবে- সে ব্যাপারে একটা বৈপ্লবিক নতুন চিন্তাভাবনা এখন শুরু হয়ে গেছে।

পশ্চিমা দেশগুলো দেখছে যে বড় আকারের দীর্ঘমেয়াদি সেনা মোতায়েনের জন্য আর্থিকভাবে যেমন- তেমনি প্রাণহানি ও রক্তপাতের দিক থেকে এবং দেশের ভেতরে রাজনৈতিক দিক থেকেও অনেক বেশি মূল্য দিতে হচ্ছে।

যেমন, আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির পেছনে খরচ হয়েছে এক ট্রিলিয়ন বা এক লাখ কোটি ডলারেরও বেশি।

তার পরে আছে প্রাণহানি, হাজার হাজার মৃত্যু- এবং তা শত্রু মিত্র উভয়পক্ষেই।

আফগানিস্তানে নিহত হয়েছে শুধু পশ্চিমা সৈন্যরা নয়, তাদের শত্রু বিদ্রোহীরা, তারপর আছে আফগান বাহিনী এবং সর্বোপরি আফগান বেসামরিক লোকেরা।

আফগানিস্তানে সবচেয়ে বেশি বিদেশি সৈন্য ছিল ২০১০ সালে- ১ লাখেরও বেশি।

তারপরও ২০ বছর মোতায়েন থাকার পর যখন অবশিষ্ট কয়েক হাজার বিদেশি সৈন্য বিদায় নিচ্ছে, তখন তালেবান ক্রমাগত আরও বেশি করে ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ দখল করছে।

‘একিলিসের গোড়ালি’

প্রকৃতপক্ষে যেকোনও বিদ্রোহী তৎপরতা দমনের জন্য যত বেশি সংখ্যায় এবং যত বেশি সময়ের জন্য সেনাবাহিনী ব্যবহার করা হয়- ততই তাদের ভেতরে তৈরি হয় নানারকম ‘একিলিসের গোড়ালি’ অর্থাৎ ‘দুর্বল জায়গা’।

এর মধ্যে একটি হচ্ছে নিহতের সংখ্যা। বিদেশে যতই সৈন্য মারা যেতে থাকে- ততই এসব সামরিক উপস্থিতি জনপ্রিয়তা হারাতে থাকে।

ভিয়েতনাম যুদ্ধে নিহত হয়েছিল ৫৮ হাজারেরও বেশি মার্কিন সেনা। আফগানিস্তানে নিহত হয় প্রায় ১৫ হাজার সোভিয়েত সেনা। এই সংখ্যাগুলো এসব অভিযানের অবসান ডেকে আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

সে তুলনায় ফ্রান্স- ২০১৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত মালিতে মাত্র ৫০ জনের কিছু বেশি সৈন্য হারিয়েছে। কিন্তু ফ্রান্সের ভেতরে ইতোমধ্যেই তাদের এই মিশন অনেকখানি জনসমর্থন হারিয়ে ফেলেছে।

অর্থনৈতিক ক্ষতি

এরপর আছে আর্থিক ব্যয়- যা প্রায় সব সময়ই হিসেবের বাইরে চলে যায়।

সৌদি আরব যখন ২০১৫ সালে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপ করেছিল- তারা কখনও ভাবেনি যে ৬ বছর পরও তাদের সেই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে।

মনে করা হয়, এই যুদ্ধের খরচ বাবদ সৌদি রাজকোষ থেকে এর মধ্যেই ১০ হাজার কোটি ডলার বেরিয়ে গেছে।

মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগও একটি সামরিক অভিযানকে পথভ্রষ্ট করে ফেলতে পারে।

আফগানিস্তানে বিয়ের পার্টির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলা, ইয়েমেনে বেসামরিক মানুষের ওপর সৌদি বিমান হামলা, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মিত্রদের ইয়েমেনের ভেতরে মানবাধিকার লংঘন- এধরনের সব ঘটনাই জড়িত দেশের ভাবমূর্তি বা সুনামের হানি ঘটিয়েছে।

ইউএই’র ক্ষেত্রে যা হয়েছিল তা হলো- শিপিং কন্টেইনারের ভেতরে তালাবন্ধ অবস্থায় থাকা বন্দীদের শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যাবার ঘটনাটি এত গুরুতর প্রভাব ফেলে যে দেশটিকে ইয়েমেন যুদ্ধ থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিতে হয়।

তারপর এমন সম্ভাবনাও আছে যে স্বাগতিক দেশের সরকারকে হয়তো একটি বৈরি শক্তির সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে হতে পারে।

যেমন মালি থেকে পাওয়া খবরে বলা হচ্ছে, সেখানকার সরকার জিহাদিদের সাথে এক গোপন আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে এবং তা এমন পর্যায়ে গেছে যে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাকরন হুমকি দিয়েছেন, তিনি দেশটি থেকে সব ফরাসি সৈন্যকে প্রত্যাহার করে নেবেন।

ইরাকের পরিস্থিতি প্রসঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত ব্রিটিশ সামরিক কর্নেল জেমস কানলিফ বলছেন, “সেখানে ইরানের প্রভাবের ব্যাপারে- বিশেষত শিয়া মিলিশিয়াদের ব্যাপারে - এখনও ব্যাপক উদ্বেগ রয়েছে।”

আফগানিস্তানে ২০০১ সালে তালিবান ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিল। কিন্তু তারা এখন ক্ষমতায় ফিরে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।

পশ্চিমা নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বলেন, তালেবান যদি আফগান সরকারের একটি অংশীদার হয়, তাহলে সব রকমের গোয়েন্দা সহযোগিতা বন্ধ হয়ে যাবে।

কোনও সহজ উত্তর নেই

ব্যর্থ রাষ্ট্র এবং বিপজ্জনক একনায়করা যে ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করে তার কোন সহজ সমাধান নেই।

‘যুদ্ধক্ষেত্রের মাটিতে সৈন্যের সংখ্যা থাকবে কম’
যদি ‘বুটস অন দ্য গ্রাউন্ড’ কম হয়, অর্থাৎ প্রকৃত যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যের সংখ্যা কম হয়- তাহলে তার অর্থ হলো, একেবার সর্বাধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা বেড়ে যাবে। এর সাথে যুক্ত হবে কৃত্রিম বৃদ্ধিমত্তাও।

সাম্প্রতিক কিছু যুদ্ধ থেকে এমন কিছু প্রবণতা বেরিয়ে এসেছে- যা কৌশলগত অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক রকমের নতুন সব চিন্তাভাবনার জন্ম দিয়েছে।

কিছুদিন আগে ককেশাস অঞ্চলে আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের সংক্ষিপ্ত যুদ্ধের সময় দেখা গেল, আর্মেনিয়ার ট্যাংকগুলোকে ধ্বংস করা হচ্ছে সস্তা, মনুষ্যবিহীন ও সশস্ত্র ড্রোন দিয়ে।

আজারবাইজানের বাহিনীকে এসব ড্রোন সরবরাহ করেছিল তুরস্ক।

এগুলোকে সহজেই উড়িয়ে নিয়ে টার্গেটে আঘাত করা হয়েছে, কিন্তু ড্রোনগুলো যে পরিচালনা করছে- তাকে প্রায় কোনই ঝুঁকির মুখে পড়তে হয়নি।

বিডি প্রতিদিন/কালাম

এই বিভাগের আরও খবর