যখন কামানের গোলার শব্দে দুনিয়া ব্যস্ত, ঠিক তখনই সমুদ্রের তলদেশের এক নিভৃত জীবন নিয়ে উঠে এসেছে পিলে চমকানো তথ্য। বিজ্ঞানীরা এক নতুন গবেষণায় দাবি করেছেন, সমুদ্রের রাজা বলে পরিচিত লবস্টারও (গলদা চিংড়ি) মানুষের মতো তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করতে পারে। দীর্ঘকাল ধরে এই প্রাণীদের জীবন্ত ফুটন্ত পানিতে ফেলে রান্না করার যে প্রথা চলে আসছে, তার বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন গবেষকরা। তাদের মতে, ইলেকট্রিক শক দিলে এই প্রাণীরা যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়, তা কেবল সাধারণ প্রতিবর্ত ক্রিয়া নয় বরং গভীর মানসিক এবং শারীরিক কষ্টের বহিঃপ্রকাশ।
গবেষণায় দেখা গেছে যে অ্যাসপিরিন বা লিডোকেনের মতো ব্যথানাশক ওষুধ দিলে লবস্টারদের ছটফটানি বা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা নাটকীয়ভাবে কমে যায়। এর মানে হলো তাদের স্নায়ুতন্ত্র মানুষের মতোই ব্যথার সংকেত মস্তিষ্ক বা স্নায়ুকেন্দ্রে পৌঁছে দেয়। ইউনিভার্সিটি অফ গোথেনবার্গের বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট করে বলেছেন, আমরা যদি গরু বা মুরগির প্রতি মানবিক হওয়ার কথা ভাবি, তবে এই চিংড়ি বা কাঁকড়াদের প্রতিও আমাদের আচরণ বদলানোর সময় এসেছে। তারা দাবি করছেন, লবস্টারকে জীবন্ত সেদ্ধ করা এক চরম নিষ্ঠুরতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
ইতিমধ্যেই নরওয়ে, নিউজিল্যান্ড এবং অস্ট্রিয়ার মতো দেশগুলো আইন করে গলদা চিংড়ি জীবন্ত সেদ্ধ করা নিষিদ্ধ করেছে। এমনকি যুক্তরাজ্যে ২০২২ সালের প্রাণী কল্যাণ আইনের আওতায় কাঁকড়া, লবস্টার এবং অক্টোপাসকে 'সংবেদনশীল প্রাণী' হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই প্রাণীদের বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে মারার আগে তাদের চেতনা নাশক বা ইলেকট্রিক স্টানিংয়ের মাধ্যমে অবশ করে নেওয়া উচিত যাতে তারা মৃত্যুযন্ত্রণা অনুভব না করে। এমনকি অক্টোপাস ফার্মিংয়ের মতো অমানবিক প্রথাও এখন বিশ্বজুড়ে বন্ধ করার দাবি উঠছে।
পৃথিবীর এক প্রান্তে যখন তেলের খনি আর আকাশসীমা দখলের লড়াইয়ে মানুষ মানুষের রক্ত ঝরাচ্ছে, তখন অন্য প্রান্তে বিজ্ঞানীরা শেখাচ্ছেন করুণা ও মায়ার নতুন সংজ্ঞা। একদিকে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে দাউদাউ করে জ্বলছে ফুজাইরার তেলের ট্যাংকার, আর অন্যদিকে ডাইনিং টেবিলের প্লেটে ওঠার আগে লবস্টারের বোবা কান্না বিজ্ঞানীদের ল্যাবরেটরিতে ধরা পড়ছে। বিধ্বংসী যুদ্ধ আর নিরীহ প্রাণীর যন্ত্রণার এই অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আজ পুরো মানবজাতি এক কঠিন নৈতিক পরীক্ষার সম্মুখীন।
মধ্যপ্রাচ্যের এই রণক্ষেত্র আর গবেষণাগারের এই সত্য আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে ক্ষমতা আর নিষ্ঠুরতা আসলে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। ক্ষেপণাস্ত্রের আগুনের শিখা যেমন মানুষের তৈরি শহর পুড়িয়ে দিচ্ছে, তেমনি ফুটন্ত পানির কড়াইয়ে চিংড়ির ছটফটানি আমাদের বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
সূত্র: লাইভ সায়েন্স
বিডি প্রতিদিন/নাজমুল