হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর নতুন করে ‘সার্ভিস ফি’ বা ট্রানজিট টোল আরোপের একটি পরিকল্পনা রূপরেখা তৈরি করেছে ওমান। এই ফি আদায়ের ক্ষেত্রে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম ব্যস্ত আন্তর্জাতিক নৌপথ মালাক্কা এবং সিঙ্গাপুর প্রণালির বর্তমান মডেলটিকে ব্লুপ্রিন্ট বা উদাহরণ হিসেবে ব্যবহারের ইঙ্গিত দিয়েছে দেশটি।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই কৌশলগত জলপথে এমন ফি আদায়ের যৌক্তিকতা এবং আন্তর্জাতিক আইনগত দিক নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন বৈশ্বিক শিপিং ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত মালাক্কা ও সিঙ্গাপুর প্রণালি বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ধমনী। ২০০৮ সালে জাপানের অলাভজনক সংস্থা ‘নিপ্পন ফাউন্ডেশন’-এর উদ্যোগে এই প্রণালি ব্যবহারকারী বিভিন্ন দেশের সরকার, প্রতিষ্ঠান ও শিপিং কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে স্বেচ্ছামূলক আর্থিক অনুদান নিয়ে একটি তহবিল গঠন করা হয়। এই তহবিলের অর্থ মূলত নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, বাতিঘর ও বয়া রক্ষণাবেক্ষণ এবং সামুদ্রিক পরিবেশ রক্ষার কাজে ব্যয় করা হয়।
সিঙ্গাপুর বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জুলাই পর্যন্ত এই তহবিলে মাত্র ২ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার জমা পড়েছে, যার এক-তৃতীয়াংশই দিয়েছে নিপ্পন ফাউন্ডেশন। ফ্রেইট ইন্টেলিজেন্স প্রতিষ্ঠান জেনোটা-এর প্রধান বিশ্লেষক পিটার স্যান্ড জানান, জাপানি স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ছাড়া বিশ্বের আর কোনো পক্ষ এই তহবিলে তেমন একটা অর্থ দেয় না। ফলে এই মডেল হরমুজ প্রণালিতে সফল করা কঠিন হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, মালাক্কা প্রণালির এই কাঠামো হরমুজ প্রণালির ক্ষেত্রে সহজে প্রয়োগ করা সম্ভব নয়। এর অন্যতম কারণ হলো, হরমুজ প্রণালিতে নেভিগেশন বা জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিকভাবে তেমন কোনো জটিল সমস্যা নেই যার জন্য বিশাল কোনো রক্ষণাবেক্ষণ তহবিলের প্রয়োজন পড়বে। উল্টো ওমান ও ইরান সীমান্তবর্তী এই জলপথ থেকে সংগৃহীত অর্থ নৌপথের উন্নয়ন ছাড়াও ইরানের পুনর্গঠনের মতো ভিন্ন রাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ উদ্দেশ্যে ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না।
জাতিসংঘের কনভেনশন বা আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী, হরমুজ এবং মালাক্কার মতো প্রাকৃতিক আন্তর্জাতিক জলপথ বা প্রণালি দিয়ে যেকোনো দেশের জাহাজের মুক্ত চলাচলের অধিকার সুরক্ষিত। এই জলপথগুলো সুয়েজ বা পানামা খালের মতো মানবনির্মিত কৃত্রিম খাল নয়, যেখানে কর্তৃপক্ষ অবকাঠামো নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য সরাসরি বাধ্যতামূলক টোল আদায় করতে পারে।
অবশ্য শিপিং ইন্টেলিজেন্স ফার্ম কেপলার-এর পলিসি প্রধান মিশেল ব্রুহার্ড উল্লেখ করেছেন, চিলির মেগেলান প্রণালির মতো কিছু প্রাকৃতিক জলপথে নেভিগেশন ও নিরাপত্তার জন্য সীমিত ফি আদায়ের নজির রয়েছে। তবে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ পরিবহনের রুট হরমুজ প্রণালিতে বাধ্যতামূলক ফি আরোপের যেকোনো চেষ্টা বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন এবং আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে নতুন করে বড় ধরনের আইনি ও ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সূত্র: সিএনএন
বিডি প্রতিদিন/কেএইচটি