মঙ্গলগ্রহের ভিতরটা নাকি দেখতে অনেকটা ম্যাকাডেমিয়া কুকির মতো! নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রহটির ম্যান্টলের ভিতরে বিশাল বিশাল শিলাখণ্ড লুকিয়ে আছে। যা আসলে মঙ্গলের প্রাচীনতম ভূত্বকের টুকরো। এই আবিষ্কার ইঙ্গিত দিচ্ছে, পৃথিবীর মতোই মঙ্গলও জন্মের শুরুর দিকে ভয়াবহ মহাজাগতিক সংঘর্ষের শিকার হয়েছিল। ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত নাসার ইনসাইট ল্যান্ডার মঙ্গলের ভিতরে ঘটে যাওয়া ভূমিকম্প ও উল্কাপাতের শব্দ-তরঙ্গ রেকর্ড করেছিল। এই তরঙ্গগুলোর ছড়ানো ও প্রতিফলনের ধরন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা মঙ্গলের অভ্যন্তরের প্রথম বিস্তারিত মানচিত্র তৈরি করেন। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের বিজ্ঞানী কনস্টানটিনোস চারাল্যাম্বসের নেতৃত্বে একটি গবেষক দল আটটি বড় ঘটনাকে ঘিরে তথ্য বিশ্লেষণ করে। ফলাফলে তারা দেখতে পান, প্রায় ৪ কিলোমিটার আকারের টুকরোসহ অসংখ্য ছোট-বড় শিলা এখনো ম্যান্টলের ভিতরে অক্ষত অবস্থায় রয়ে গেছে। যা ৪.৫ বিলিয়ন বছর আগে মঙ্গলের গঠনকালীন সময়ে তৈরি হয়েছিল। তৎকালীন সৌরজগৎ ছিল বিশৃঙ্খলায় ভরা। একের পর এক গ্রহাণু ও মহাজাগতিক বস্তু একে অপরকে ধাক্কা মারছিল।
পৃথিবীতে যেমন একসময় ভয়ংকর সংঘর্ষ চাঁদের জন্ম দিয়েছিল, তেমনভাবেই মহাজাগতিক বোমাবর্ষণে মঙ্গলের নবগঠিত ভূত্বক ভেঙেচুরে গিয়েছিল। চারাল্যাম্বস বলেন, এই আঘাতগুলো এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, মঙ্গল আক্ষরিক অর্থেই গলে গিয়ে বিশাল ম্যাগমার সমুদ্রে পরিণত হয়েছিল। সেই সমুদ্র ঠান্ডা হয়ে জমাট বাঁধার পর বিভিন্ন উপাদান আলাদা হয়ে বড় বড় টুকরো তৈরি করেছিল এবং আমরা মনে করছি, আজও সেগুলোই মঙ্গলের ম্যান্টলে আটকে আছে। পৃথিবীতে প্লেট টেকটনিকের কারণে ভূত্বক ও ম্যান্টল ক্রমাগত নড়াচড়া করে এবং পুরোনো অংশগুলো পুনর্গঠিত হয়ে যায়। তাই এখানে এ ধরনের প্রাচীন শিলাখণ্ড টিকে থাকে না। কিন্তু মঙ্গলের ভূত্বক এক টুকরোতেই অটল থেকে গেছে, যার ফলে এটি আদিম সৌরজগতের এক টাইম ক্যাপসুল হয়ে আছে। গবেষকরা বলছেন, পৃথিবী একমাত্র গ্রহ যেখানে টেকটনিক প্লেট আছে। তাই মঙ্গলকে বোঝা মানে একদিকে পৃথিবীর ইতিহাস বোঝা, অন্যদিকে শুক্র ও বুধের রহস্য উন্মোচনের দিকেও এগোনো। তাদের মতে, মঙ্গলের প্রাচীন ম্যান্টল এখনো ধরে রেখেছে আদিম ভূতাত্ত্বিক রেকর্ড। এটি আমাদের শুধু গ্রহের গঠন প্রক্রিয়াই নয়, বরং বাসযোগ্য পরিবেশের সম্ভাবনাও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করবে। এ গবেষণাটি সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।