Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা
আপলোড : ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০৭

শিক্ষা খাতে অনিয়ম বিশৃঙ্খলা

নিয়মনীতি নেই কোথাও চাইলেই পাওয়া যাচ্ছে এমফিল-পিএইচডি ডিগ্রিও

আকতারুজ্জামান ও জয়শ্রী ভাদুড়ী

শিক্ষা খাতে অনিয়ম বিশৃঙ্খলা

অনিয়ম আর নৈরাজ্য চলছেই শিক্ষা খাতে। কিন্ডারগার্টেন থেকে শুরু করে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক এমনকি উচ্চশিক্ষার বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়েও যেন কোনো নিয়ম-নীতির বালাই নেই। অবৈধ উপায়ে কেউ কেউ এমফিল, পিএইচডি ডিগ্রিও বাগিয়ে নিচ্ছেন সুযোগ বুঝে। লাগামহীনভাবে চলছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আর ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলো। স্কুলে স্কুলে আছে ভর্তি নিয়ে নৈরাজ্য, লাগামহীন অর্থ আদায়ের অভিযোগ। অভিভাবকদের আছে আর্তনাদ, কিন্তু সেসব আর্তনাদ স্কুল কর্তৃপক্ষ বা সরকার— কারও শোনার সময় নেই। এসএসসির ফরম পূরণে বোর্ড নির্ধারিত ফি থেকে অতিরিক্ত ফি না নিতে আদালতের নির্দেশনা ছিল। সে নির্দেশনা মানছে না সারা দেশের স্কুলগুলো। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আউটার ক্যাম্পাসের মাধ্যমে চালিয়ে যাচ্ছে অবাধে বাণিজ্য। ভুলেভরা বই নিয়ে চলছে হৈচৈ। কিন্তু এসবের কোনোই সমাধান মিলছে না। হাজার হাজার শিক্ষার্থী প্রতি বছর জিপিএ-৫ পেলেও শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে। এসব ব্যাপারে জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, শিক্ষা খাতের সর্বত্র নানা ধরনের অব্যবস্থাপনা রয়েছে। এ কারণে আমাদের নানা অর্জন ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা পরীক্ষাভিত্তিক হয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগেই শিক্ষার্থীদের চারটি পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। পৃথিবীর কোথাও এমনটা নেই। এজন্য বাড়ছে কোচিং নির্ভরতা, গাইড বইয়ে নির্ভরতা। পরীক্ষার বোঝা না কমলে কোচিং বাণিজ্যও বন্ধ হবে না।

জানুয়ারির ১ তারিখে বই হাতে পেয়ে আনন্দে উদ্বেলিত হয়েছিল শিক্ষার্থীরা। ঘটা করে সারা দেশে বই বিতরণের আয়োজন নতুন উৎসবের আবহ সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু লাখো-কোটি শিক্ষার্থীর জন্য এ উৎসব স্থায়ী হয়নি। পাঠ্যবইয়ের ভিতরে ভাঁজে ভাঁজে নানা অসঙ্গতি আর ভুল পেয়ে বিমর্ষ হয়ে গেছে শিশু-মন। শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের মলাট ঝকঝকে হলেও ভিতরে ছাপার মান নিম্নমানের। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, ভুল চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া চলছে। কিন্তু কবে নাগাদ এসব ভুল শোধরানো হবে, এমন কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। বই উৎসবের অর্জন ম্লান করে দিয়েছে আন্তর্জাতিক টেন্ডারে ছাপা কাজ। বিদেশে ছাপা হওয়া বেশির ভাগ বই যথাসময়ে পৌঁছেনি। ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি লাকী আক্তার এর আগে বলেছিলেন, এবারের পাঠ্যবই ভুলেভরা, সাম্প্রদায়িক। শিক্ষা মন্ত্রণালয় শুধু ভুলের বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলছে। আড়ালে থেকে যাচ্ছে সাম্প্রদায়িকতার মতো বিষয়গুলো। স্কুলে শিক্ষার্থী ভর্তি নিয়ে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি চলছেই। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলগুলোয় নতুন শিক্ষার্থী ভর্তিতে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভর্তি নীতিমালা অমান্য করে নেওয়া হয় গলা কাটা ফি। এক শ্রেণি থেকে অন্য শ্রেণিতে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর কাছ থেকে কত টাকা নেওয়া যাবে— এ সংক্রান্ত নীতিমালা না থাকায় ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকেও বাড়তি অর্থ আদায় করা হচ্ছে। এ ছাড়া ঢাকার বাইরেও বিভিন্ন স্কুলে নির্ধারিত অর্থের চেয়ে বেশি আদায় করা হচ্ছে। বাড়তি অর্থ আদায় রোধে শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি কমিটি করলেও কমিটি যথাযথভাবে কাজ করছে না বলে অনেকের অভিযোগ।

ইংলিশ মিডিয়ামে অনিয়মই নিয়ম : ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল তদারকির জন্য কোনো নীতিমালাই নেই সরকারের। নিজের খেয়াল-খুশি মতো চলছে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ফলে রাজধানীসহ সারা দেশে ব্যাঙের ছাতার মতোই এখন গজিয়ে উঠছে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল। অনেক স্কুল নিয়ে আছে মালিকানার দ্বন্দ্বও। সব মিলিয়ে লাগামহীন ঘোড়ার মতোই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে শিক্ষাহীন এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। অনেক ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে জাতীয় দিবস পালন করা হয় না। উত্তোলন করা হয় না জাতীয় পতাকা। এমনই একটি স্কুল হচ্ছে কার্ডিফ ইন্টারন্যাশনাল। অভিভাবকদের অভিযোগ, মাসিক বেতনের জন্যও আটকে রাখা হয় শিশু শিক্ষার্থীদের ব্যাগ। বিভিন্ন অভিযোগ এনে থানায় অভিযোগ করছেন তারা। কার্ডিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল ঢাকার (সিআইএসডি) প্রতিষ্ঠাতা জিএম নিজামউদ্দিন বাংলাদেশ প্রতিদিনের কাছে এসব অভিযোগ স্বীকার করে বলেন, স্কুলটি প্রতিষ্ঠার পর ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে খাইরুল বাশারকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এরপরই নানা অভিযোগ আসতে শুরু করে। আমি আবার স্কুলটিকে আগের অবস্থানে নিয়ে আসতে ব্যবস্থা নিচ্ছি। নীতিমালা না থাকায় এ স্কুলগুলো শিক্ষার্থীদের কাছে আদায় করছে গলা কাটা ফি। অথচ শিক্ষকদের নামমাত্র বেতন দিচ্ছে। কতজন শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিল, অ্যাডমিশন ও টিউশন ফি বাবদ কত টাকা আদায় করা হলো, সেসব বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কোনো তথ্যই নেই। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর উত্তরায় আগা খান স্কুলে ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে প্লে ও কেজি ওয়ান শ্রেণিতে ভর্তি আদায় করা হয়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৬০৮ টাকা। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রতি মাসের টিউশন ফি নেওয়া হয়েছে ১৩ হাজার ৫৪৫ টাকা। নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার সময় টিউশন ফি, ভর্তি ফিসহ মোট ১ লাখ ৮৯ হাজার ৭২৯ টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে। তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হতে একজন শিক্ষার্থীকে পরিশোধ করতে হয়েছে ১ লাখ ৯০ হাজার ৩৭৪ টাকা। বারিধারার আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে কেজি ওয়ান শ্রেণিতে টিউশন ফি আদায় করা হয়েছে ২৩ হাজার ৫৬০ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় সাড়ে ১৮ লাখ টাকা। গ্রেড-১২ শ্রেণির টিউশন ফি নেওয়া হয়েছে ২৯ হাজার ৩৩০ ডলার, বাংলাদেশি টাকায় এ অঙ্ক ২৩ লাখ টাকার বেশি। ধানমন্ডিতে অবস্থিত সানিডেল স্কুলে খোঁজ নিতে গেলে সেখানে পড়া এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, এখানে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হতে পরিশোধ করতে হয় আড়াই লাখ টাকা। মাসিক টিউশন ফি দিতে হয় ১৩ হাজার টাকা।

আইন মানে না বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় : ফ্রি-স্টাইলে চলছে বেশির ভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। নিয়ম না মানা যেন কালচার হয়ে দাঁড়িয়েছে কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেন, আইন অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ট্রাস্টি বোর্ড, একাডেমিক কাউন্সিল, সিন্ডিকেট সভা ও অর্থ কমিটির বৈঠক হতে হবে নিয়মিত। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এসব সভা করে না। আইন অনুযায়ী অনুমোদনের পর সাত বছরের মধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্থায়ী জমিতে ক্যাম্পাস পরিচালনা করতে হবে। কিন্তু অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এই নিয়ম মানেনি। খোদ ইউজিসি চেয়ারম্যান বলছেন, আইন না মানার প্রবণতা রয়েছে এমন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা কম নয়। প্রতিষ্ঠার পর দশ বছরের বেশি অতিবাহিত হলেও কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় যায়নি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। দেশে ৯৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে এদের মধ্যে মাত্র ১৩টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী জমিতে ক্যাম্পাস পরিচালনা করছে। অথচ শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসিও তাদের বিরুদ্ধে কঠোর কোনো পদক্ষেপ নিতে নারাজ।

কাজে আসছে না সৃজনশীল পদ্ধতি : শিক্ষাব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন আনতে, গতানুগতিক মুখস্থ বিদ্যা থেকে শিক্ষার্থীদের বের করে আনতে ২০০৮ সালে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করা হয়। কিন্তু সৃজনশীল নিয়ে খোদ শিক্ষকদেরই ভীতি কাটেনি। শিক্ষাবিদরাও বলছেন কাজে আসছে না সৃজনশীল পদ্ধতি। শিক্ষকরা সৃজনশীল পদ্ধতিতে পাঠদান করতে গিয়ে শেখাতে পারছেন না ছাত্রছাত্রীকে। প্রশ্ন তৈরি করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, সৃজনশীল পদ্ধতির উপযোগিতা আছে কিনা তা ভেবে দেখতে হবে। এ পদ্ধতিতে কাজ হচ্ছে না। 

বইয়ের বোঝায় অতিষ্ঠ শিক্ষার্থী : কমিশনের লোভে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তকের বাইরে অতিরিক্ত বই চাপিয়ে দিচ্ছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। এতে করে বয়সের তুলনায় অতিরিক্ত বইয়ের চাপে মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। রাজধানীর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক অভিযোগ করে বলেন, স্কুল কর্তৃপক্ষ প্রত্যেক বছর বিভিন্ন কোম্পানির মানহীন বাংলা এবং ইংরেজি ব্যাকরণ বইয়ের লিস্ট ধরিয়ে দেন। এসব বইতে প্রচুর পরিমাণে বানান এবং তথ্য ভুল থাকে। কিন্তু ক্লাসে এবং সিলেবাসে ওই বইয়ের পৃষ্ঠা নম্বর উল্লেখ করায় বাধ্য হয়েই ছেলেমেয়েদের এসব বই কিনে দিতে হয়। আর মাঝখানে কমিশন পান শিক্ষকরা। প্রধানমন্ত্রী গত বছর বয়সের সঙ্গে সামঞ্জস্য করে বই পড়ানোর ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েছেন। এ ছাড়া আদালতও শিশুদের বইয়ের বোঝা কমানোর নির্দেশনা দিয়েছে। এসব নির্দেশ-নির্দেশনা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। শিশুদের বইয়ের বোঝাও কমেনি।


আপনার মন্তব্য

এই পাতার আরো খবর