শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৫ মে, ২০১৮ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৪ মে, ২০১৮ ২৩:১০

চোখের আড়ালের অপেক্ষায়

মির্জা মেহেদী তমাল

চোখের আড়ালের অপেক্ষায়

আট বছরের শিশু লিজাকে (প্রকৃত নাম ব্যবহার করা হচ্ছে না) ঘরে রেখে এলাকার পানির কল থেকে পানি আনতে যান তার মা। ঘিঞ্জি এলাকার খুপরি ঘরগুলো একটির সঙ্গে আরেকটি লাগোয়া। মনের মাঝে কিছুটা শঙ্কা থাকলেও শিশুকন্যাটিকে একাই রেখে যেতে বাধ্য হন। কিন্তু ফিরে এসে মেয়েকে খুঁজে না পেয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েন মা। এঘর ওঘর ছুটোছুটি করছেন। শিশুটির মায়ের তখন মাথায় প্রশ্ন এলো, পাশের বাড়িতে যে পুরুষলোকটি দরজার সামনে বসা ছিল, সে কোথায় গেল? তখন তিনি পাশের বাড়ির দরজা ধাক্কাতে থাকেন।  কিন্তু কেউ খোলে না। পাশের ঘরে ছুটে যান। খুঁজে পান না। ঘুরে এসে সেই আগের ঘরের দরজা খোলা পান তিনি। দেখেন ভিতরে তার মেয়ে। কাতরাচ্ছে। কী হয়েছে বাচ্চাটা পুরোপুরি খুলে বলতে পারছে না। বলে, ‘মা দাদা আমার পাজামা খুলে দিয়েছে। নিজের কাপড় খুলেছে। আমি খেলতেছিলাম। মুখ চেপে ধরে নিয়ে গেছে।’ শিশুটির মা কিছুক্ষণ পরেই বুঝতে পারেন তার মাত্র আট বছরের শিশুটিকে প্রতিবেশী বৃদ্ধ ধর্ষণ করেছে। ধর্ষণের শিকার আট বছরের ওই শিশুর মা সামাজিক হেনস্তার মধ্যে পড়েন। ঢাকার মিরপুরের সেই বস্তি ঘরে আর থাকা হয়নি তার। রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার একটি আবাসিক মাদ্রাসার শিক্ষক গ্রেফতার হন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তিনি সেখানকার একটি ছাত্রকে ধর্ষণ করেছেন। পুলিশের কাছে স্বীকারও করেছেন তিনি। তবে ধর্ষণের শিকার ছেলেটির পরিবারের সদস্যরা প্রথমে উদ্যোগ নিলেও পরে আর মামলা করতে এগিয়ে যাননি। পুলিশের পক্ষ থেকে একাধিকবার তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো লাভ হয়নি। গত মার্চের এক দুপুরে নীলফামারী সদর উপজেলার পলাশবাড়ী ইউনিয়নের সীমান্তপাড়ায় তৃতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থী ধর্ষণের শিকার হয়। এ ঘটনায় ওই শিক্ষার্থীর মা অভিযোগ করে বলেন, ‘আমি মানুষের বাড়িতে কাজ করি। আমার স্বামী দিনমজুরের কাজ করে ঢাকার একটি ইটভাটায়। প্রতিদিনের মতো সকালে আমি মানুষের বাড়িতে কাজে গিয়ে সন্ধ্যায় বাড়িতে আসি। এসে দেখি আমার শিশু মেয়ে বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। পরে আমার মেয়ে জানায় সে দুপুরে দিকে বাড়ির বাইরে খেলছিল। এ সময় প্রতিবেশী শুকুর আলী (৪০) তাকে বিস্কুটের প্রলোভন দেখিয়ে বাড়ির পাশের একটি ভুট্টা খেতে নিয়ে ধর্ষণ করে। পরে সে পালিয়ে যায়। তিনি আরও বলেন, সন্ধ্যার দিকে রক্তক্ষরণ বেশি হলে তাকে প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় নীলফামারী আধুনিক সদর হাসপাতালে নিয়ে আসি। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করে। রাত ১১টার দিকে মেয়েটিকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করি। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটছে শিশু ধর্ষণের ঘটনা। পাষণ্ড ধর্ষকরা চকলেট, বিস্কুট, ফলসহ নানা ধরনের প্রলোভন দেখিয়ে শিশুকে ঘরের বাইরে নিয়ে যায়। আবার কখনো আদর করার অজুহাতে শিশুদের শরীরের নানা অংশে হাত চালায়। ধর্ষণের ঘটনার মধ্যে কোনোটি মিডিয়ায় প্রচার হয়, অনেক ঘটনা থেকে যায় আড়ালে। মান-সম্মানের কথা বিবেচনা করে এসব ঘটনা অনেকেই প্রকাশ করতে কিংবা মামলা করতে চায় না। কন্যা শিশু যে শুধু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, তা নয়। ছেলে মেয়ে উভয় শিশুই ধর্ষণের শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। সেইসঙ্গে ছেলে শিশুদের ধর্ষণের ঘটনাগুলোর ক্ষেত্র এখন আরও বেড়েছে বলে মনে করেন অপরাধ  বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ছেলে এবং মেয়ের আনুপাতিক হিসাবে ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের যৌন নির্যাতনের সংখ্যা বেশি। কিন্তু ছেলেদের ধর্ষণের ঘটনা আগে সীমিত ছিল। বোর্ডিং স্কুল বা মাদ্রাসায় হতো। এখন সেই ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হয়েছে। লঞ্চ-ঘাটে, বাস টার্মিনালে কিংবা বিপণিবিতানে যেসব শ্রমজীবী শিশু থাকে কিংবা যারা পথশুিশ তারাও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। পরিবারের সদস্যদের দ্বারাও ধর্ষণের ঘটনা হচ্ছে। তবে সেগুলো চার দেয়ালের বাইরে আসে না। ঘরে বাইরে আবডালে মানুষরূপী দানবেরা ওতপেতে আছে। বাবা মায়ের চোখের আড়াল হওয়ার সুযোগে তারা রয়েছে। সুযোগ পেলেই ছোঁ মেরে শিশুদের সরিয়ে ফেলবে। পাশবিক নির্যাতনের পর রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে রেখে পালিয়ে যাবে। এ কারণে শিশু সন্তানদের যার তার কাছে দেওয়া যাবে না। বাইরের কেউ যেন শরীরে ধরে আদর করতে না পারে, সেদিকটা অবশ্যই বাবা মাকে খেয়াল রাখতে হবে। পরিবারের একদম ঘনিষ্ঠজন ছাড়া কারও কাছে শিশুদের না দেওয়াটা ভালো। বাবা মায়ের একটু অসচেতনতার কারণেই শিশু সন্তানদের বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এ ধরনের ঘটনা বাড়ার পেছনে কাজ করে। অনেকে অজ্ঞতার কারণে আর বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে অনেকেই আদালত বা পুলিশের দোরগোড়ায় পৌঁছাচ্ছেন না। ফলে এসব অপরাধ ঘটছেই। অনেক শিশু বা অভিভাবকই জানে না কোথায় অভিযোগ জানাতে হয়। আর অনেকে দেখছেন অনেক নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে কিন্তু বিচার তো হচ্ছে না। বাইরে মিটমাট হয়ে যাচ্ছে। ফলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি শক্তিশালী হয়ে উঠছে। অনেক দেশে কিন্তু দ্রুত বিচার আইনে সাজা হয় এবং মানুষ তা দেখে সচেতন হয়। তিনি বলেন, বাবা মাকে অনেক সচেতন হতে হবে। তাদের সন্তানদের চোখে চোখে রাখতে হবে। শিশুদের বয়স হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বোঝাতে হবে। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম বলছে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে সারা দেশে ১৭৬ জন শিশু ধর্ষিত হয়েছে। এর মধ্যে গণধর্ষণ করা হয়েছে ২০ জনকে আর ধর্ষণের পর ২৫ জনকে হত্যা করা হয়। এ ছাড়া ২১ শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। রেহাই পায়নি প্রতিবন্ধী শিশুরাও। গেল তিন মাসে আটজন প্রতিবন্ধী শিশু ধর্ষিত হয়েছে। তাদের তথ্য মতে, ২০১৭ সালে মোট ৫৯৩ শিশু ধর্ষিত হয়। এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয় ৭০ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ২২ শিশুকে। ২০১৬ সালে ৪৪৬ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। ৬৮ জন গণধর্ষণের শিকার হয়। আর ২১ শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়।

আর সরকারি তথ্যমতে, ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনায় ১৭ হাজার ২৮৯টি মামলা হয়েছে। একই সময়ে ৩ হাজার ৪৩০টি মামলার বিচার শেষ হয়েছে। যা হতাশাজনক বলে মনে করছেন মানবাধিকার কর্মীরা।


আপনার মন্তব্য