Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper

শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ২০ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৯ জানুয়ারি, ২০১৯ ২৩:০৯

ফলো দ্য রুলস

মির্জা মেহেদী তমাল

ফলো দ্য রুলস

ছুটির দিন। বেসরকারি একটি ব্যাংকের কর্মকর্তা দিলারা বেগম (ছদ্মনাম) সেদিন বাসায়। ঝুল বারান্দায় বসে মোবাইলে হেড ফোনে গান শুনছিলেন। রবীন্দ্রসংগীত। হঠাৎ গানটি বন্ধ হয়ে যায়। বেজে ওঠে মোবাইল ফোন। অপরিচিত নম্বর। অফিস নেই। এর পরও ফোন! বিরক্তি নিয়ে ফোনটি ধরেন তিনি। একটি মোবাইল ফোন কোম্পানির ডিজিএম পরিচয়ে একজন ভদ্রলোক ফোনটি করেছেন। তিনি বলছেন, ম্যাডাম, ৪২ লাখ টাকা পুরস্কার আপনি পেয়েছেন। গান শোনার মাঝে হঠাৎ এমন ফোনকল পেয়ে হতভম্ব দিলারা বেগম। বলেন কি? এসব আজগুবি কথা বাদ দিন। আপনি ভুল নম্বরে ফোন করেছেন। এ কথা বলেই দিলারা ফোন রাখতে যাবেন, এ সময় লোকটি বলছেন, ম্যাডাম, আপনি ভুল করছেন। আমি ডিজিএম নিজে কথা বলছি। এ কথা শুনে একটু থামেন দিলারা। বলেন, কী বলতে চান বলুন। তখন সেই ভদ্রলোক নানাভাবে দিলারা বেগমকে কনভিন্স করার চেষ্টা করেন। ব্যাংক কর্মকর্তা দিলারা অনেকটাই কনভিন্সড। এরপর বেশ আয়েশ নিয়ে ভদ্রলোক বলতে থাকেন, বিষয়টি নিয়ে কারও সঙ্গে আলোচনা করা যাবে না। লটারির খবর জানাজানি হয়ে গেলে ক্ষতির আশঙ্কা আছে। আপনার ব্যাংকের কর্মকর্তারাই টাকা মেরে দিতে পারেন।  সে আরও বলে, উইনার নম্বর রেজিস্ট্রেশনের জন্য ৩ হাজার টাকা ফি লাগবে। এসব শুনে দিলারা সঙ্গে সঙ্গে ওই টাকা বিকাশ নম্বরে পাঠিয়ে দেন। পরে লটারিতে পাওয়া টাকার ভ্যাট হিসাবে ১৪ হাজার টাকাও পরদিন পাঠান তিনি। এরপর একে একে এনবিআর, পার্লামেন্টের অনুমোদন, আমেরিকান পার্লামেন্টের পারমিশন, টিএনটির ছাড়পত্র, বিটিসিএলের অনুমোদন, দুদকের তদন্ত, বিটিআরসির ক্লিয়ারেন্সসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার নামে এসএমএস আসতে থাকে দিলারার মোবাইলে। ইংরেজিতে লেখা ওইসব এসএমএসে ফোন কোম্পানির কঠোর গোপনীয় রুলস মেনে চলার শর্ত দেওয়া। দিলারা পুরোপুরি বিশ্বাস করে ফেলেন তাকে। এরপর একে একে দিলারা মাত্র তিন মাসে ৪০ দফায় প্রায় ৫০টি পারসোনাল বিকাশ নম্বরে ৪০ লাখ টাকা পাঠান। এর পরও সেই পুরস্কারের চেকের টাকা তোলার প্রক্রিয়া শেষ হয় না। এরই মধ্যে আরও টাকা দাবি করে সেই ডিজিএম। এক পর্যায়ে দিলারা বলেন, দেখুন ভাই আমার কাছে আর টাকা নেই। ডিজিএম বলেন, আপনি তো ব্যাংকে চাকরি করেন। আপাতত ব্যাংক থেকেই টান দিয়ে পাঠিয়ে দেন।

এ কথা শুনেই ব্যাংক কর্মকর্তার হুঁশ ফিরে। তিন মাসে একটুও তার সন্দেহ হয়নি। কিন্তু ব্যাংকের কথা বলার পরই তার সন্দেহ হয়। বুঝতে পারেন, প্রতারকদের খপ্পরে পড়েছেন তিনি। তারপর রমনা থানায় মামলা করতে যান তিনি। ওই সময়ও সেই ডিজিএম টাকার জন্য ফোন দেয়। তখন সেই কথা রেকর্ড করা হয়। এরপর তিনি মামলা করেন। আবারও ফোন দেয় সেই ডিজিএম। ব্যাংক কর্মকর্তা ফোনে বলেন, ‘অনেক কথা শুনিয়েছেন, এবার আমাকে একটু শান্তি দেন ভাইয়া। জবাবে ডিজিএম বলেন, আমার ওপর যদি আপনার ভরসা থাকে তো বলবেন, ‘হ্যাঁ’ আছে, না থাকলে বলবেন নাই। ভরসা যদি না থাকত, সেই এতদিন ধরে কথা বলছি কেন-জবাব দেন দিলারা। এ সময় ডিজিএম বলেন, আমি একটা অর্ডার করতেছি, ওই অর্ডারটা আপনি ফলো করেন। মানে ফলো দ্য রুলস, ফলো দ্য ম্যানেজমেন্ট রুলস, ফলো দ্য ম্যানেজমেন্ট রুলস, বারেবারে বলছি। এইটা কিন্তু আপনার গুরুত্ব হচ্ছে না। ব্যাপারটা হচ্ছে আপনার। ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, আপনি তো আমার কাজ করছেন না। আপনি তো শুধু পেইন দিয়ে যাচ্ছেন। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, এমন বহু অভিযোগ পুলিশের কাছে আসছে। শুধু এই ব্যাংক কর্মকর্তাই নয়, ভুক্তভোগীদের মধ্যে পুলিশের আত্মীয়স্বজনও রয়েছেন। অনেকে আবার প্রতারণার অভিযোগ না দিয়ে পুলিশের সহায়তায় টাকা উদ্ধারের চেষ্টা করছেন। পুলিশ ইতিমধ্যে এই ঘটনায় বিভিন্ন এলাকা থেকে ৮ জনকে গ্রেফতারও করে। কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্র্যান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রতারকরা একেক সময় একেক কৌশলে প্রতারণা করে। বিভিন্ন সফটওয়্যার ব্যবহার করে তারা এসএমএস পাঠায়। নম্বরগুলোর ডিজিট ব্যতিক্রম। দেখলেই ভিআইপি মনে হবে। একেকজন প্রতারক ভুয়া পরিচয় দিয়ে ৫০ থেকে ১০০টির মতো সিম ব্যবহার করে। টাকা তোলার জন্য পারসোনাল বিকাশ নম্বর রেজিস্ট্রেশন করে।’ তিনি বলেন, ‘মোবাইল ফোন কোম্পানি ও বিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ের লোকজনের নানা অনিয়মের কারণে প্রতারকরা এই ধরনের প্রতারণা করার সুযোগ পাচ্ছে। স্থানীয় বিকাশ এজেন্টরা জেনে-শুনেই বেশি লাভের কারণে এসব চক্রের সঙ্গে লেনদেন করছে।’ প্রতারণার বিষয়টি ফোন কোম্পানি ও বিকাশ অফিসের লোকজন জেনেও গোপন করে যাচ্ছে বলে তিনি জানান। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, কারও এমন ফাঁদে পা না দিয়ে পুলিশকে অবগত করতে হবে। নিজেকে সতর্ক না রাখলে এমন সমস্যায় পড়তে হবে বার বার।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর