শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ২৩:১৬

সন্ধ্যায় পাল্টে গেল দৃশ্যপট

মোস্তফা মতিহার

সন্ধ্যায় পাল্টে গেল দৃশ্যপট

নিয়ম অনুযায়ী বিকাল ৩টায় মেলার শুরুতে দর্শক সমাগম খুব একটা ছিল না। দর্শক কম  হওয়ায় প্রকাশকদের চেহারায়ও ফুটে উঠেছিল বিষণœতার ছাপ। এরপর সময় যত গড়াতে থাকে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে বইপ্রেমীর সংখ্যাও। তবে সন্ধ্যায় দৃশ্যপট একেবারে পাল্টে যায়। হঠাৎ পাঠকের অনেক বেশি উপস্থিতি মেলাপ্রাঙ্গণে এনে দেয় প্রাণের ছোঁয়া। আর প্রকাশকদের চোখেমুখেও ফুটে ওঠে তৃপ্তির হাসি। এমন দৃশ্যই ছিল গতকাল অমর একুশে গ্রন্থমেলার চতুর্থ দিনে। এদিন মেলায় আগতরা শুধু তাকে রাখা বইয়ের ঘ্রাণই নেননি কিংবা নেড়েচেড়ে বই দেখেই রেখে দেননি, প্রিয় লেখকের পছন্দের বইটি কিনেই বাড়ি ফিরেছেন। তবে চিরাচরিত নিয়মে এদিন জনপ্রিয় লেখকদের বই-ই বেশি বিক্রি হয়েছে। আর ঐতিহ্য, অন্যপ্রকাশ, তাম্রলিপি, অনন্যা, কাকলী, অবসর, কথাপ্রকাশ, মাওলা ব্রাদার্স, পাঞ্জেরীসহ শীর্ষস্থানীয় প্রকাশনা সংস্থার প্যাভিলিয়নের সামনে পাঠকের ছিল প্রাণবন্ত উপস্থিতি। ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল, ইমদাদুল হক মিলন ও হুমায়ূন আহমেদের পুরনো বইগুলোই বেশি বিক্রি হয়েছে মেলার চতুর্থ দিনে। পুরান ঢাকার লালবাগ কেল্লার মোড় থেকে মেলায় এসেছিলেন শরীফুল হক ও তার স্ত্রী মুক্তা। মেলার পরিবেশ ও বই কেনার বিষয়ে এই দম্পতি বলেন, ‘মেলার পরিবেশ ভালো লাগছে, পরিসর বড় হওয়ায় স্বচ্ছন্দে ঘোরা যাচ্ছে।’ তবে ধুলোয় ধূসর মেলাপ্রাঙ্গণ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে শরীফুল হকের স্ত্রী মুক্তা শরীফ বলেন, ‘একুশের চেতনায় শানিত বইমেলায় বইপ্রেমীরা ভিড় করবেন, বই কিনবেন এটা জানার পরও আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি ধুলো নিরসনে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এত দিন ধুলো নিরসনের কথা দিয়ে এলেও তা এখনো আশ^াসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।’ পিয়াস মজিদের সাতটি বই : অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০১৯-এ প্রকাশিত হলো বাংলা একাডেমির পরিচালক কবি পিয়াস মজিদের সাতটি বই। এর মধ্যে প্রথমা প্রকাশন প্রকাশ করেছে কাব্যগ্রন্থ ‘ক্ষুধা ও রেস্তোরাঁর প্রতিবেশী’, পাঞ্জেরী এনেছে ‘প্রেমপিয়ানো’, ঐতিহ্য এনেছে প্রবন্ধগ্রন্থ ‘জীবনানন্দ : আমার অসুখ ও আরোগ্য’, সময় প্রকাশন এনেছে ‘ব্যক্তিগত গদ্যের সংকলন নির্জন নোটবুক’, পার্ল পাবলিকেশন্স প্রকাশ করেছে ‘বঙ্গবন্ধুর বয়ানে সাহিত্য ও অন্যান্য’, মাওলা ব্রাদার্স প্রকাশ করেছে সাক্ষাৎকার সংকলন ‘সাক্ষাৎকার ১৭’, কাঠপেন্সিল প্রকাশনী এনেছে কিশোরতোষ বই ‘ভরদুপুরের বিভূতিভূষণ’। এ ছাড়া লেখকের পাঁচটি সম্পাদনাগ্রন্থ এসেছে এবারের মেলায়। সম্পাদিত গ্রন্থগুলো হলো অন্বেষা প্রকাশিত হুমায়ূন আহমেদের অগ্রন্থিত গদ্য ও পত্রগুচ্ছ ‘কিছু হুমায়ূন’, ইকরি-মিকরি এনেছে সৈয়দ শামসুল হকের ‘মৃত্যুভয়াল সিন্ধু’। নতুন বই : বাংলা একাডেমির জনসংযোগ উপবিভাগের তথ্যমতে, গতকাল মেলার চতুর্থ দিনে বই প্রকাশিত হয়েছে ১৪১টি। এর মধ্যে গ্রন্থকুটির এনেছে মোহীত উল আলমের উপন্যাস ‘মুরলী’, জ্যোতি প্রকাশ এনেছে ড. তপন বাগচীর সমালোচনা গ্রন্থ ‘মহসিন হোসাইনের কবিতার বিষয় ও শরীরী নির্মাণ’, হাওলাদার প্রকাশনী এনেছে নীরা কাদরীর আবৃত্তির বই ‘আবৃত্তির নির্বাচিত কবিতা’, পালক পাবলিশার্স এনেছে কাজী খলীকুজ্জমান আহমদের প্রবন্ধ ‘অবস্থা বদলের জন্য ব্যবস্থা বদলের সন্ধানে’, নাগরী এনেছে আবু হাসান শাহরিয়ারের কাব্যগ্রন্থ ‘বিমূর্ত প্রণয়কলা’, অন্যপ্রকাশ এনেছে শিহাব শাহরিয়ারের কাব্যগ্রন্থ ‘পড়ে থাকে অহংকার’ ইত্যাদি।

মূলমঞ্চ : গতকাল বিকালে মেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি অর্জনের সুবর্ণজয়ন্তী শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. নূূহ-উল-আলম লেনিন। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তোফায়েল আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আলোচনায় অংশ নেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক হারুন অর রশিদ, কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব সুভাষ সিংহ রায়। স্বাগত বক্তৃতা করেন হাবীবুল্লাহ সিরাজী।

প্রাবন্ধিক বলেন, ঐতিহাসিক বাস্তবতা হচ্ছে, ১৯৬৯-এর ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে তোফায়েল আহমেদ যখন শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করার ঘোষণা দেন তখন মঞ্চে উপস্থিত ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া), ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন), ডাকসুসহ ছাত্র নেতৃবৃন্দ রেসকোর্সের লাখো মানুষের সঙ্গে দুই হাত তুলে এই ঘোষণার প্রতি সমর্থন জানান। বস্তুত, সর্বসম্মতিক্রমেই শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ’৬৯-এর ২৩ ফেব্রুয়ারি কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতির পক্ষে ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ যখন বাংলার অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধুু উপাধিত ভূষিত করেন তখন মূলত তিনি স্বাধীনতাকামী বাঙালি জাতির আশা-আকাক্সক্ষার মূর্তপ্রতীকরূপে পরিগণিত হন। এ বছর এ উপাধি অর্জনের পঞ্চাশ বছর পূর্তি হচ্ছে।

সভাপতির বক্তব্যে তোফায়েল আহমেদ বলেন, ’৬৯-এ সমগ্র বাঙালি জাতি স্বাধীনতার অগ্নি-আকাক্সক্ষায় উজ্জীবিত হয়েছিল। সংগ্রামী ছাত্রজনতার সঙ্গে মিলেমিশে গিয়েছিল কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষের মুক্তির দাবি। উপনিবেশের শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন সার্বভৌম বাঙালি জাতিরাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল আসাদ, মতিয়ুর, সার্জেন্ট জহুরুল হক, শামসুজ্জোহা প্রমুখের রক্তে। জাতীয় মুক্তিসংগ্রামকে গতিবেগ দিয়েছে মিথ্যা মামলা থেকে বঙ্গবন্ধুর কারামুক্তির দাবি। অবশেষে ছাত্র-জনতার গণসংবর্ধনায় ’৬৯-এর ২৩ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি প্রদানের মাধ্যমে যেন আসন্ন স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক হিসেবে জাতির সামনে উপস্থাপন করা হয়।

সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ করেন মাকিদ হায়দার ও ইকবাল আজিজ। আবৃত্তি পরিবেশন করেন ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় ও মাহমুদা আখতার। সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী ফাতেমা-তুজ-জোহরা, খায়রুল আনাম শাকিল, ইয়াকুব আলী খান, লীনা তাপসী খান ও ক্যামেলিয়া সিদ্দিকা।


আপনার মন্তব্য