Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১১ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১০ এপ্রিল, ২০১৯ ২৩:৪৫

পা হারানো রাসেলকে পাঁচ লাখ টাকার চেক

বাকি ৪৫ লাখ এক মাসে

নিজস্ব প্রতিবেদক

পা হারানো রাসেলকে পাঁচ লাখ টাকার চেক

বাসচাপায় পা হারানো রাসেল সরকারকে আদালতে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার পর বাকি ৪৫ লাখ টাকা পরিশোধে গ্রিন লাইন পরিবহনকে আরও ৩০ দিন সময় দিয়েছে হাই কোর্ট। গতকাল বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাই কোর্ট বেঞ্চে এ সংক্রান্ত মামলা শুনানিতে রাসেলকে পাঁচ লাখ টাকার চেক দেয় গ্রিন লাইন কর্তৃপক্ষ। পরে রাসেল ও গ্রিন লাইনের মালিক হাজী মো. আলাউদ্দিনের উপস্থিতিতেই শুনানি হয়। গত বছর ২৮ এপ্রিল যাত্রাবাড়ীর মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারে গ্রিন লাইন পরিবহনের একটি বাস চাপা দেয় প্রাইভেট কারচালক রাসেল সরকাকে। তাকে বাঁচাতে একটি পা কেটে ফেলতে বাধ্য হয়েছে চিকিৎসকরা। ক্ষতিগ্রস্ত অন্য পায়ের চিকিৎসার জন্যও গ্রিন লাইন কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করার নির্দেশ দিয়েছে হাই কোর্ট। ক্ষতিপূরণ চেয়ে সাবেক সংসদ সদস্য উম্মে কুলসুমের করা এক রিট আবেদনে রাসেলকে ৫০ লাখ টাকা দিতে নির্দেশ দিয়েছিল হাই কোর্ট। পরে আপিল বিভাগেও ওই আদেশ বহাল থাকে। কিন্তু ৪ এপ্রিল গ্রিন লাইনের মহাব্যবস্থাপক আবদুস সাত্তার আদালতে হাজির হয়ে বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠানের মালিক চিকিৎসার জন্য ভারতে গেছেন, ফিরবেন ৯ এপ্রিল। এরপর হাই কোর্ট রাসেলকে ৫০ লাখ টাকা পরিশোধ করে ১০ এপ্রিলের মধ্যে আদালতে হলফনামা দাখিলের নির্দেশ দেয় গ্রিন লাইন কর্তৃপক্ষকে। তা না হলে গ্রিন লাইনের সব বাস জব্দ করা হবে বলেও হুঁশিয়ার করে আদালত। গতকাল সকালে রিটকারী আইনজীবী উম্মে কুলসুম শুনানির শুরুতেই আদালতকে বলেন, গ্রিন লাইন কর্তৃপক্ষ কোনো ধরনের যোগাযোগই করেনি। গ্রিন লাইনের আইনজীবী অজি উল্লাহ তখন বলেন, কোম্পানির মালিক হাজী আলাউদ্দিন অসুস্থ। তাছাড়া আরও কিছু জটিলতা আছে। টাকা দিতে তাদের এক মাস সময় প্রয়োজন। বিচারক তখন বলেন, ‘উনি অসুস্থ, কিন্তু উনার ব্যবসা তো থেমে নেই, ব্যবসা তো চলছে। আজকে যদি একটা কিছু নিয়ে আসতেন তাহলে আমরা বুঝতাম একটা মানবিকতা আপনারা দেখিয়েছেন। কিন্তু কিছুই দেন নাই এখন পর্যন্ত। কিছু কমপ্লাই করে ৩টায় আসেন।’ বিকালে আবার আদালত বসলে আইনজীবী অজি উল্লাহ পাঁচ লাখ টাকার একটি চেক দেখিয়ে বলেন, ‘এই চেক আমরা এখন হাতে হাতে দিতে চাচ্ছি। ১৫ তারিখ এটা ক্যাশ করা যাবে।’ বিচারক তখন বলেন, ‘মাত্র ৫ লাখ টাকা নিয়ে এসেছেন। এতদিন হয়ে গেল। এক্সিডেন্টটা কবে হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি থাকল, আপনারা কোনো খোঁজখবরও নিলেন না।’ এরপর রাসেল সরকারকে ডেকে বিচারক জানতে চান তার কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে কি না। রাসেল অ্যাকাউন্ট আছে জানালে বিচারক তাকে চেক নিতে বলেন এবং ওই চেক বুঝে নেওয়ার বিষয়ে বিবাদীপক্ষকে লিখিতভাবে জানাতে বলেন। বাকি টাকা দিতে গ্রিন লাইন কর্তৃপক্ষ কেন সময় চাইছে আদালত তা জানতে চাইলে অজি উল্লাহ বলেন, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতিও এই মামলায় পক্ষভুক্ত হতে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছে। বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহাসান তখন বলেন, ‘ওসব আমরা শুনতে চাই না। এক মাস সময় দিলাম। এর মধ্যে বাকি টাকা দিয়ে দিবেন।’ সেই সঙ্গে রাসেলের অন্য পায়ের চিকিৎসার জন্য অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে গ্রিন লাইন কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয় আদালত। অজি উল্লাহ তখন বলেন, একটা এনজিও রাসেলের অন্য পায়ের চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছে। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে গ্রিন লাইন কর্তৃপক্ষ সহযোগিতা করবে। রাসেল আদালতকে বলেন, তিনি যখন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন, তখন তার বাবা ও ভাই গ্রিন লাইনের মালিকের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেছিলেন। সে সময় হজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন হাজী আলাউদ্দিন। উনি যাওয়ার আগে বলেছিলেন, এসে বিষয়টা দেখবেন। বলেছিলেন- দোয়া করে দেব। কিন্তু খোঁজখবর নেওয়া বা টাকা দেওয়া- কোনোটাই তারা করেনি। এ সময় গ্রিন লাইনের মালিককে সামনে ডেকে বিচারক বলেন, ‘আপনি একটা ব্যবসা চালান, আপনার পরিবহনের সুনাম আছে। আমরাও কখনো কখনো ওই পরিবহনে চড়েছি। ধরে নিলাম এই ঘটনায় তার দায় আছে কিন্তু একটা দায় সবারই আছে। ওর চিকিৎসা করানোর একটা মানবিক দায়িত্ব আছে। হাজী আলাউদ্দিন তখন বলেন, রাসেল সরকারের ঘটনার পর আমিও পারিবারিকভাবে তিনটা এক্সিডেন্টের মুখোমুখি হয়েছি। আমার বড় ছেলের চোখ চিরতরে নষ্ট হয়ে গেছে। আমার স্ত্রীর কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে। আমিও এক মাস ধরে অসুস্থ। আমার যে ব্যবসা, তা এখন লসে আছে। আদালতের আদেশের পর রাসেল সরকার সাংবাদিকদের বলেন, টাকা বড় কথা না। সব থেকে বড় কথা হলো মানুষের একটা অঙ্গ। যে অঙ্গ একমাত্র উপরওয়ালা ছাড়া আর কেউ দিতে পারে না। আমি যদি আজ পাঁচ কোটি টাকা দিয়েও পা লাগাই, তা হলেও আমি আগের জীবনে ফিরে যেতে পারব না।


আপনার মন্তব্য