Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ৮ মে, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ৭ মে, ২০১৯ ২৩:০৩

জন্মহারে রেকর্ড রোহিঙ্গা ক্যাম্পে

২০ মাসে লক্ষাধিক শিশুর জন্ম, উদ্বাস্তু জীবনে চলছে বিয়ের উৎসব

ফারুক তাহের, চট্টগ্রাম

জন্মহারে রেকর্ড রোহিঙ্গা ক্যাম্পে

রোহিঙ্গাদের উচ্চ জন্মহারের কারণে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের ক্যাম্পগুলোয় বেড়েই চলেছে অনিয়ন্ত্রিত শিশু জন্মদান। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে পরবর্তী তিন মাসে মিয়ানমারে সেনা নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা। আগে থেকেই কক্সবাজার এলাকায় আশ্রিত ছিল আড়াই লাখ রোহিঙ্গা। নতুনদের মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার রোহিঙ্গা নারী গর্ভবতী অবস্থায় বাংলাদেশে আশ্রয় নেন বলে বিভিন্ন সূত্রের তথ্য। রোহিঙ্গাদের উদ্বাস্তু জীবনেও থেমে নেই বিয়ে-শাদির মতো সামাজিক অনুষ্ঠান। নতুন করে অনুপ্রবেশের পর গত ২০ মাসে এখানে জন্ম নিয়েছে আরও প্রায় ১ লাখ শিশু। সন্তানসম্ভবা রয়েছেন আরও অন্তত ২০ হাজার নারী। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছে প্রশাসন। তাদের মতে, যে হারে রোহিঙ্গা শিশুর সংখ্যা বাড়ছে, তাতে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠবে। রোহিঙ্গা নারী-পুরুষদের জন্মনিয়ন্ত্রণের আওতায় আনতে না পারলে প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের জেলা কক্সবাজারে জনবিস্ফোরণ ঘটবে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। তথ্যমতে, ক্যাম্পগুলোয় প্রতিদিন গড়ে জন্ম নিচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ শিশু। বিপুল এই জনস্রোতের পরিসেবা জোগাতে হিমশিম খাচ্ছে প্রশাসন। ক্রমাগত অপরাধকান্ডে  জড়িয়ে পড়া রোহিঙ্গাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। অনিয়ন্ত্রিত এই উচ্চ জন্মহার যেন গোদের ওপর বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেখানে আমাদের দেশের জন্মনিয়ন্ত্রণ নীতিতে চলমান রয়েছে ‘ছেলে হোক মেয়ে হোক দুটি সন্তানই যথেষ্ট’- এই ধারণা, সেখানে একেকটি রোহিঙ্গা পরিবারের সন্তানসংখ্যা ৫ থেকে ১০। জন্মনিয়ন্ত্রণকে রোহিঙ্গা নারী-পুরুষদের অধিকাংশই মনে করেন ‘পাপকাজ’। তারা কোনো ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করেন না। উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইউনিসেফ কর্মী জানান, শরণার্থীদের মধ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণের কোনো বালাই নেই। ক্রমে বাড়ছে রোহিঙ্গা জন্মহার। পাশাপাশি রয়েছে বাল্যবিয়ের প্রচলন। কক্সবাজার রোহিঙ্গা প্রতিরোধ ও প্রত্যাবাসন কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরি বলেন, ‘আমরা আতঙ্কে রয়েছি। রাতে ঘুম হয় না ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে। পাহাড়-পর্বত ফসলি জমি সব রোহিঙ্গাদের দখলে চলে গেছে। দিনের পর দিন তাদের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি তাদের অপরাধের মাত্রাও বাড়ছে।’ টেকনাফ ২১ নম্বর ক্যাম্পে কর্মরত ডা. আয়েশা কবির বলেন, ‘রোহিঙ্গা নারীদের মধ্যে গর্ভধারণের প্রবণতা অনেক বেশি। আমার দেখা ২০ বছরের একজন রোহিঙ্গা নারীর তিনটি করে সন্তান আছে। কিছু ধর্মীয় কথাবার্তাকে পুঁজি করে তারা আরও বেশি সন্তান জন্ম দিতে আগ্রহী। পরিবার-পরিকল্পনার কথা বললেও তারা রাজি হয় না। বরং ডাক্তার, নার্সদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করে।’ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষের জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে উদাসীনতা থাকায় রাখাইনে জনসংখ্যার হার ছিল অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বেশি। এখানে প্রতিটি পরিবারে ৫ থেকে ১০টি করে সন্তান রয়েছে। এ কারণে বাংলাদেশের তুলনায় রোহিঙ্গা পরিবারগুলোয় শিশুর সংখ্যা অনেক বেশি। কক্সবাজার পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরসূত্র জানান, রোহিঙ্গাদের জন্মনিয়ন্ত্রণের আওতায় নিয়ে আসতে সরকার তিনটি পদ্ধতিতে এগোচ্ছে। সেগুলো হলো- তিন মাস মেয়াদি ইনজেকশন, জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি ও কনডম। এজন্য জন্মনিয়ন্ত্রণসহ অন্যান্য চিকিৎসাসেবা প্রদানে সাতটি মেডিকেল টিম কাজ করছে। ২০০ কর্মী বিভিন্ন ক্যাম্পে গিয়ে রোহিঙ্গাদের জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে অবহিত করছেন। কক্সবাজার পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের উপপরিচালক ডা. পিন্টুকান্তি ভট্টাচার্য বলেন, ‘রোহিঙ্গারা যখন বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে আসে, তখন প্রথম তিন মাসে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল ৩৪ হাজার ৪৮০ জন গর্ভবতী নারীকে। এর মধ্যে বিভিন্ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে প্রসব হয় সাড়ে ৫ হাজার শিশু আর বাকিগুলো হোম ডেলিভারি হয়। ২০১৭ সালের আগস্টের পর থেকে পরবর্তী ১২-১৫ মাসে রোহিঙ্গা নারীদের গর্ভধারণ হার আগের মতোই ছিল। সে হিসাবে রোহিঙ্গা নবজাতকের সংখ্যা ৭০ হাজারের কম নয়। গত কয়েক মাস আমরা জন্মনিয়ন্ত্রণ নিয়ে কাজ করার পর অনেক সচেতন হয়েছে রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ। আমরা এ পর্যন্ত ৬৮ হাজার জনকে ইনজেকশন দিয়েছি, ৬৫ হাজার জনকে জন্মনিয়ন্ত্রণ ওষুধ দিয়েছি।

এ ছাড়া তিন বছর ও ১০ বছর মেয়াদি ইনজেকশন দিয়েছি আরও প্রায় ৬ হাজার জনকে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় সদ্যসন্তান প্রসব করবে এমন নারীর সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। রোহিঙ্গাদের জন্ম নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে দেশের জন্য ভয়াবহ সংকট তৈরি করবে।’


আপনার মন্তব্য