শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ২৬ মে, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৫ মে, ২০১৯ ২৩:৩৪

নিষিদ্ধ ৫২ পণ্য বাজার থেকে সরাতে ব্যর্থ তদারকি প্রতিষ্ঠান

বিএসটিআইর মান পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ

জিন্নাতুন নূর

নিষিদ্ধ ৫২ পণ্য বাজার থেকে সরাতে ব্যর্থ তদারকি প্রতিষ্ঠান

রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকার ঢাকা জেনারেল স্টোরের মুদিদোকানি মো. রাকিব। এই ব্যবসায়ী মঙ্গলবার দুপুরে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) সম্প্রতি নিষিদ্ধ হওয়া ৫২টি পণ্যের একটি মোল্লা সল্টের আয়োডিনযুক্ত লবণ বিক্রি করছিলেন। নিষিদ্ধ হওয়ার পরও কেন তিনি এই পণ্যটি বিক্রি করছিলেন জানতে চাইলে পণ্যটি নিষিদ্ধ নয় বলে রাকিব দাবি করেন। ১২ মে হাই কোর্টের একটি বেঞ্চ বাজার থেকে ৫২টি পণ্য ১০ দিনের মধ্যে অপসারণ করে তা ধ্বংস করার আদেশ দেয়। তবে তদারকি প্রতিষ্ঠান নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদফতর বাজার থেকে এসব নিষিদ্ধ পণ্য সরাতে ব্যর্থ হয়েছে। সরেজমিন রাজধানীর কারওয়ান বাজার মুদি মার্কেট ঘুরে বেশ কয়েকটি দোকানেই বিএসটিআইর নিষিদ্ধ পণ্যগুলো বিক্রি করতে দেখা যায়। এর মধ্যে রূপা স্টোরে মোল্লা সুপার সল্ট রাখতে দেখা যায়। একইভাবে হযরত শাহ আলী স্টোরেও মোল্লা সল্ট বিক্রির জন্য রাখা হয়েছে। কুমিল্লা জেনারেল স্টোরে রাখা ছিল প্রাণের হলুদ গুঁড়া। একই দিন রাজধানীর কারওয়ান বাজার কিচেন মার্কেটে বিএসটিআইর মোবাইল কোর্ট অভিযান চালিয়ে ৫০ কেজি প্রাণ হলুদ গুঁড়া জব্দ করে। এর বাইরে কারওয়ান বাজারের বেশ কয়েকটি মার্কেটে বনফুলের লাচ্ছা সেমাইও রাখতে দেখা গেছে। বাংলাদেশ প্রতিদিনকে এই কাঁচাবাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, নিষিদ্ধ পণ্যগুলো অনেক ব্যবসায়ীই বিক্রি করছেন। তবে কীভাবে এবং কেন এই পণ্য বিক্রি করছেন তা জানতে চাইলে তারা জানান, এ বিষয়ে তারা কিছু জানেন না। ব্যবসায়ীদের অনেকে নিষিদ্ধ পণ্য বিক্রির জন্য অজুহাত হিসেবে বলেন, রোজার মাসে পণ্যের চাহিদা বাড়তি থাকে। আর এই সময়ই বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে ভেজালবিরোধী অভিযান চালানো হয়। কিন্তু এই পণ্যগুলো তারা রোজার আগে থেকেই মজুদ করেন। নিষিদ্ধঘোষিত পণ্যগুলোর মধ্যে গতকাল ঢাকার শ্যাওড়াপাড়ার কাঁচাবাজারেও বেশ কয়েকটি পণ্য বিক্রি ও দোকানে মজুদ করে রাখতে দেখা গেছে। সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, পূর্ব শ্যাওড়াপাড়ার আল-মদিনা স্টোরে বনফুলের লাচ্ছা সেমাই পাওয়া যাচ্ছে। জানতে চাইলে দোকানটির মালিক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, তিনি সেমাইগুলো গুছিয়ে রেখে দিয়েছেন। কোম্পানির লোকেরা সেমাইগুলো নিয়ে যাওয়ার কথা। তবে রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় চিত্র কিছুটা ভালো। নিউমার্কেট কাঁচাবাজারে নিষিদ্ধ পণ্যগুলো দেখতে পাওয়া যায়নি। কিন্তু দু-একটি দোকানে সান চিপস বিক্রি করতে দেখা গেছে। এ ছাড়া বিক্রয় নিষিদ্ধ এসিআই (পিওর সল্ট)-এর সাড়ে ৫৭ কেজি লবণ এবং ১২ কেজি বাঘাবাড়ী ঘি জব্দ করেছে বিএসটিআই-এর বাজার সার্ভিল্যান্স ও মোবাইল কোর্ট।  গত ২২ মে রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মোহাম্মদপুর ও মালিবাগ এলাকায় অভিযান চালিয়ে এগুলো জব্দ করা হয়। উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা ও মোবাইল কোর্টকে উপেক্ষা করে রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজার এবং পাড়া-মহল্লার মুদিদোকানে দেদার বিক্রি হচ্ছে বিএসটিআইর নিষিদ্ধ পণ্য। জনস্বার্থে খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণকারী সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে দেশের বাজারগুলো থেকে এসব পণ্য দ্রুত তুলে নেওয়া, এর বিপণন ও উৎপাদন বন্ধ করার জন্য ১০ দিনের সময়ও বেঁধে দিয়েছিল উচ্চ আদালত। কিন্তু নির্ধারিত সময়সীমা পার হলেও এখনো বাজার থেকে নিষিদ্ধ এসব ভেজাল পণ্যের বেচাবিক্রি বন্ধ করা যায়নি। খোদ রাজধানীর বাজারগুলো ঘুরে গত দুই-তিন দিন নিষিদ্ধ এসব পণ্য বিক্রি করতে এবং দোকানে মজুদ রাখতে দেখা যায়। আবার কিছু পণ্য উৎপাদনকারী নিজেদের উৎপাদিত পণ্য ভিন্ন নামে বাজারজাত করছে। রাজধানীর বাইরে অবস্থা আরও শোচনীয়। সচেতনতা কম থাকায় সেখানে নিষিদ্ধ পণ্য বিক্রি করা বেশ সহজ বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। আর যথাযথ তদারকি না থাকায় অনলাইনের মুদিপণ্য কেনাবেচায় জড়িত কয়েকটি দোকানের ওয়েবসাইটে এখনো নিষিদ্ধ পণ্যগুলো বিক্রি হতে দেখা যাচ্ছে।

এ অবস্থায় আরও আশঙ্কার কথা জানান ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনার সঙ্গে জড়িত দায়িত্বপ্রাপ্ত সূত্রগুলো। তারা জানান, ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনার জন্য সারা দেশে জনবলের যথেষ্ট অভাব। অভিযান পরিচালনার জন্য নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের আছে মাত্র ১৭ জন লোক। অন্যদিকে দেশজুড়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের ২৪৯ জন জনবল থাকার কথা। কিন্তু সেখানে আছে ২১৮ জন। দেশের ১৮টি জেলাতেই এই প্রতিষ্ঠানের লোকবল নেই। এরই মধ্যে নিষিদ্ধ পণ্যগুলো বাজার থেকে সরিয়ে না নেওয়ায় মানহীন ৫২টি পণ্যের উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করেছে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম লস্কর বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বাজার থেকে মাত্র ১০ দিনের মধ্যে নিষিদ্ধ খাদ্যগুলো তুলে নেওয়া বা বিপণন বন্ধ করা সম্ভব নয়। দেখা গেল যে আজ একটি পণ্য ধ্বংস করা বা তুলে নেওয়া হলো। কিন্তু এক মাস পর সেই পণ্যটি আবারও বাজারে পাওয়া যাবে। এ জন্য এ ধরনের ভেজাল পণ্যের বিক্রি বন্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে নজরদারির ব্যবস্থা রাখতে হবে।

প্রসঙ্গত, বিএসটিআইর মান পরীক্ষার একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর একটি রিট আবেদনে ১২ মে হাই কোর্টের একটি বেঞ্চ বাজার থেকে ৫২টি পণ্য দ্রুত অপসারণ করে তা ধ্বংস করার আদেশ দেয়। এ ছাড়া আদালতের আদেশে এসব পণ্য মানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়া পর্যন্ত উৎপাদন বন্ধ রাখতেও নির্দেশ দেওয়া হয়। আর এই নির্দেশ বাস্তবায়নের জন্য নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদফতরকে ১০ দিনের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়।


আপনার মন্তব্য