শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৬ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ৫ আগস্ট, ২০১৯ ২৩:২৫

পাঠ্যবইয়ে নিম্নমানের কাগজ অর্থ লোপাটের পাঁয়তারা

নিজস্ব প্রতিবেদক

পাঠ্যবইয়ে নিম্নমানের কাগজ অর্থ লোপাটের পাঁয়তারা

শিক্ষার্থীদের হাতে বছরের প্রথম দিনেই পাঠ্যপুস্তক পৌঁছে দিয়ে দেশে ও বিদেশে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছে আওয়ামী লীগ সরকার। যেসব ক্ষেত্রে সরকার সাফল্য অর্জন করেছে তার মধ্যে অন্যতম বিনামূল্যে বছরের প্রথম দিনে পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়া। তবে এ অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার পাঁয়তারা করছে একটি স্বার্থান্বেষী মহল। নিম্নমানের কাগজে বই ছাপিয়ে সরকারি কোষাগার থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ লোপাটের পাঁয়তারা করছে সংঘবদ্ধ ও অসাধু চক্রটি। এর আগেও চক্রটি নিম্নমানের কাগজে বই ছাপিয়ে সরকারকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। এরই মধ্যে ২০২০ শিক্ষাবর্ষের জন্য নতুন বই ছাপানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন বছরের শুরুতে প্রায় ৩৫ কোটি নতুন বই পাবেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। জানুয়ারি মাসের প্রথম দিনেই বই উৎসব করে প্রি-প্রাইমারি, প্রাইমারি, মাধ্যমিক, মাদ্রাসা পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়া হবে। সরকারের চাহিদা মোতাবেক বিপুল পরিমাণ বই ছাপতে কাগজের দরকার প্রায় ৬০ হাজার মেট্রিক টন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, কাগজের প্রায় ৬০ শতাংশই নিম্নমানের। আন্তর্জাতিক মান মোতাবেক একটি পাঠ্যবইয়ের কাগজে যে পরিমাণ ব্রাইটনেস থাকা দরকার সেটি থাকছে না। দরপত্রের কারিগরি নির্দেশনা ও নিয়ম মোতাবেক ব্রাইটনেস (উজ্জ্বলতা) থাকা দরকার ৮৫ শতাংশ। কিন্তু রয়েছে মাত্র ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ। একইভাবে কাগজের পুরুত্ব (জিএসএম) ৬০ থেকে ৬৪ শতাংশের মধ্যে থাকার কথা থাকলেও নমুনায় আছে অনেক কম। আর ব্যবহৃত কাগজ কতখানি মজবুত তার নির্দেশনাকারী ‘বাস্টিং ফ্যাক্টর’ যেখানে ন্যূনতম ১২ শতাংশ থাকার কথা, তা আছে ৭-৮ শতাংশ। দামে সস্তা হওয়ায় এসব নিম্নমানের কাগজে নতুন বছরের বই ছাপানোর কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ লোপাট করতে পারবে অসাধু চক্রটি। ধারণা করা হচ্ছে এতে প্রায় ৬০ কোটি টাকা তসরূপ হতে পারে। সূত্র জানিয়েছে, এরই মধ্যে নিম্নমানের কাগজ সরবরাহ শুরু হয়েছে। বই ছাপানোর দরপত্র যেসব প্রিন্টিং প্রতিষ্ঠান পেয়েছে এমন অনেক প্রতিষ্ঠান কাগজ কিনতে শুরু করেছে। বস্তুত, ভালো মানের ব্রাইটনেসযুক্ত কাগজ কিনতে প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ হাজার টাকা দরকার প্রতি টনে। কিন্তু যে কাগজে ছাপানো পাঠ্যবই শিক্ষার্থীরা হাতে পাবেন তার দাম ৬৫ থেকে ৭০ হাজার টাকা টন।

জানা গেছে, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড-এনসিটিবি প্রতি বছর নিজেরাই কাগজ কিনে কিছু প্রিন্টারস প্রতিষ্ঠানকে সরবরাহ করে বই ছাপানোর জন্য। এবারও এনসিটিবি আল নূর পেপার ও বোর্ড মিলস নামক একটি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ৪ হাজার টন কাগজ কিনছে। যার মধ্যে ৩০০ টন কাগজ এরই মধ্যে আল নূর এনসিটিবিকে সরবরাহ করেছে। এনসিটিবি কাগজগুলো একটি প্রিন্টারস কোম্পানিকে বই ছাপাতে দিয়েছে। বই ছাপানোর দায়িত্ব পাওয়া মৌসুমি প্রিন্টারসের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যে কাগজ তাদের দেওয়া হয়েছে তার মান একেবারেই খারাপ। বিষয়টি তারা এনসিটিবিকে জানিয়েছেন। তবে যেহেতু একটি শক্ত সিন্ডিকেট এখানে সক্রিয়, তাই অভিযোগ দিয়েও কোনো লাভ হয়নি। অবশ্য এ ব্যাপারে আল নূরের ব্যবস্থাপনা পরিচালক-এমডি মো. ফজলুল হককে টেলিফোন করলেও তিনি এমডি নন জানিয়ে ফোন কেটে দেন। পরে আবার ফোন করলে তিনি ধরেননি। অবশ্য এনসিটিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা সাংবাদিকদের বলেন, পাঠ্যবইয়ের মানের ব্যাপারে আমরা কোনো আপস করছি না। মান যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে তিন স্তরে। আমাদের নিজেদের টিম কাজ করছে। আবার দুটি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, কোনো প্রিন্টিং প্রতিষ্ঠান যদি মনে করে নিম্নমানের কাগজ দেওয়া হয়েছে, আমাদের লিখিতভাবে জানালে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব। কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার করা বইয়ে ছাপা অস্পষ্ট হতে পারে। ছাপানো ছবি থেকে কালি উঠতে পারে। এ বই কতদিন টিকবে তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হবে। স্কুলপড়ুয়া ছেলেমেয়েদের হাতে এমনিতেই বই বেশি ছিঁড়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। আর সরকারকে প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে। একটি কাগজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কাগজ সরবরাহে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এ সিন্ডিকেট আল নূর, সৈয়দপুর ইকো পেপার মিলস, ইথিক্যাল পাল্প ও পেপার লিমিটেড, বেস পেপারস লিমিটেড এবং বিসিএল পেপার মিলস লিমিটেডের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রিন্টিং প্রতিষ্ঠানকে নিম্নমানের কাগজ দিয়ে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে সক্রিয় রয়েছে।

এর বাইরেও আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান থেকে নিম্নমানের কাগজ নিয়ে প্রিন্টিং প্রতিষ্ঠানগুলোকে দিচ্ছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এর সঙ্গে এনসিটিবির একটি চক্রও জড়িত। ঘুষের বিনিময়ে তারা এসব কর্মকা- দেখেও না দেখার ভান করছে।

প্রতিষ্ঠানটির একজন কর্মকর্তা বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশন বেশ সক্রিয়। এখানেও প্রতিষ্ঠানটির অভিযান জরুরি হয়ে পড়েছে। তাহলে সব অবৈধ কর্মকা- বেরিয়ে আসবে। অর্থের বিনিময়ে নিম্নমানের কাগজে আবারও বই ছাপানো হচ্ছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেন, বইয়ের মানের সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না। আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখব। এ ধরনের অনিয়ম শেখ হাসিনার সরকার কোনোভাবেই বরদাস্ত করবে না। এটি হলো প্রধানমন্ত্রীর একটি বিশেষ উদ্যোগ। বছরের প্রথম দিন শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই পৌঁছে দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এখানে কোনো ধরনের অনিয়ম বরদাস্ত করা হবে না।


আপনার মন্তব্য