শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১০ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:১১

নিউমোনিয়া, উচ্চ রক্তচাপসহ নানা রোগে আক্রান্ত ওরা

৩৮ ঝুঁর্কিপূর্ণ কাজে শিশু

জিন্নাতুন নূর

৩৮ ঝুঁর্কিপূর্ণ কাজে শিশু
রাজধানীর একটি যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানায় শিশু শ্রমিক -রোহেত রাজীব

রাজধানীর কালশী মোড়ে শুক্রবার একটি গ্যারেজে মোবিল দিয়ে মোটরসাইকেলের যন্ত্রাংশ পরিষ্কার করছিল আট বছরের সুজন। এ সময় তার পাশে সাত থেকে ১৫ বছর বয়সী আরও ৭-৮ জনের কেউ ঝালাই, কেউবা পোড়া মোবিল বদলানোসহ ভারী সব কাজ করছিল। সরেজমিন গেলে তারা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানায়, বড় মেকাররা গ্যারেজের বিপজ্জনক কাজ ছোটদের ভরসায় রেখে খেতে গেছেন। তারা বলেন, হাতে মোবিলের দুর্গন্ধ থাকায় খাবার খেতে ভালো লাগে না। কেউ বলে মাথা ও হাত-পায়ে ব্যথা হয়। তারপরও অল্প কিছু টাকার বিনিময়ে তারা এই কাজ করছে। অথচ শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে শিশুদের গ্যারেজে কাজ করাকে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। শিশুরা যাতে এ কাজ না করে এজন্য সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশনাও আছে। কিন্তু গ্যারেজসহ শিশুরা প্রকাশ্যেই ঝুঁকিপূর্ণ ৩৮টি কাজ করছে। সরকার ২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন এবং ২০২৫ সালের মধ্যে দেশ থেকে সব ধরনের শিশুশ্রম বন্ধের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে। এজন্য সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বিভিন্ন পদক্ষেপও নিয়েছে। এরই মধ্যে ৩৮টি কাজকে শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আর এসব কাজে কোনো শিশুকে যেন নিয়োগ করা না হয় এজন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এতকিছুর পরও শুধু কম পারিশ্রমিক দিয়ে বেশি কাজ করানোর জন্য অনেক কারখানা মালিক শিশু শ্রমিক নিয়োগ দিচ্ছেন।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ২০১৭-১৮-এর বার্ষিক প্রতিবেদনে শিশুদের জন্য যে ৩৮টি কাজ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় সেগুলো হচ্ছে- অ্যালোমিনিয়ামজাতদ্রব্যাদি তৈরি, অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ বা গ্যারেজের কাজ, ব্যাটারি চার্জিং, বিড়ি ও সিগারেট তৈরি, ইট ও পাথর ভাঙা,  ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের লেদ মেশিন, কাচ ও কাচের সামগ্রী তৈরি, দিয়াশলাই তৈরি, প্লাস্টিক ও রাবারসামগ্রী তৈরি, লবণ তৈরি, সাবান ও ডিটারজেন্ট তৈরি, স্টিল ফার্নিচার ও গাড়ি রং, চামড়াজাত দ্রব্যাদি তৈরি, ওয়েলডিং ও গ্যাস বার্নারের কাজ, কাপড়ের রং ও ব্লিচ করা, জাহাজ ভাঙা, চামড়ার জুতা তৈরি, ভলকানাইজিং, মেটাল ওয়ার্ক, চুনাপাথরের কাজ, স্পিরিট ও অ্যালকোহল দ্রব্যাদি প্রক্রিয়াকরণ, জর্দা ও তামাক তৈরি, কীটনাশক তৈরি, স্টিল ও মেটাল কারখানার কাজ, আতশবাজি তৈরি, ইমিটেশন ও চুড়ির কারখানার কাজ, ট্রাক/টেম্পো ও বাসের হেলপার, স্টেইনলেস স্টিলসামগ্রী তৈরি, ববিন ফ্যাক্টরিতে কাজ, তাঁতের কাজ, ইলেকট্রিক মেশিনের কাজ, বিস্কুট ও বেকারি কারখানার কাজ, সিরামিক কারখানার কাজ, নির্মাণ কাজ, কেমিক্যাল কারখানার কাজ, কামারের কাজ ও জাহাজে মালামাল হ্যান্ডেলিংয়ের কাজ। আর পুরান ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানেই শিশুদের হরহামেশাই এই কাজগুলো করতে দেখা যাচ্ছে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়- ঝুঁকিপূর্ণ এসব কাজ করার জন্য শিশুরা নিউমোনিয়া, রক্ত কাশি, আঙ্গুলে ক্ষত, শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া, শ্বাসনালির সংক্রমণ, ফুসফুস সংক্রমণ, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, পাকস্থলির ঘা, দৃষ্টিশক্তি হ্রাস, চোখের প্রদাহ, বাতজ্বর, ক্ষুধামন্দা, হাতে ব্যথা, মূত্রাশয় ক্যান্সার, হাঁপানি, রক্তশূন্যতা, অ্যালার্জি, যকৃতের প্রদাহ, চোখের সমস্যা, শারীরিক দুর্বলতা, জ্বর, ডায়রিয়া, গিরায় ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, বমি হওয়া, ওজন কমে যাওয়া, কাশি, মাথা ঘোরা, কোষ্ঠকাঠিন্য এবং কণ্ঠনালিতে ক্যান্সারের মতো রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট এলিনা খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দরিদ্রতার কারণেই ঝুঁকিপূর্ণ ৩৮টি কাজ থেকে শিশুশ্রম বন্ধ করা যাচ্ছে না। এসব কাজে যেহেতু শিশু স্বাস্থ্যের বিষয়টিও জড়িত এজন্য সরকারকে মনিটরিং বাড়াতে হবে। আবার দরিদ্র অভিভাবকরাও তাদের সন্তানরা যাতে ঠিকমত খেতে-পরতে পারে সে জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কাজে পাঠায়। আইন বাস্তবায়ন না হওয়ায় শিশুশ্রম বন্ধ হচ্ছে না।


আপনার মন্তব্য