শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ৩০ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৯ নভেম্বর, ২০১৯ ২২:৪৫

চ্যালেঞ্জে এসডিজি অর্জন

পিছিয়ে দলিত ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী

শামীম আহমেদ

চ্যালেঞ্জে এসডিজি অর্জন

এক দশকের ব্যবধানে বাংলাদেশে প্রাথমিকে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার অর্ধেকের বেশি কমে ১৮ দশমিক ৬০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। প্রাথমিকে ভর্তির হার প্রায় ৯৮ শতাংশ। কমেছে দারিদ্র্যের হার। উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে দেশ যখন এগিয়ে যাচ্ছে, তখন কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে হরিজন পল্লীর ৩১টি স্কুলবয়সী দলিত শিশুর মধ্যে স্কুলে যায় মাত্র ছয়জন। রাজধানীর গাবতলী বেড়িবাঁধ সিটি কলোনির একমাত্র স্নাতক পড়ুয়া তেলেগু মেয়ে সরস্বতী দাস উচ্চশিক্ষা শেষে ভূমিহীন হরিজনের সন্তান পরিচয়ে চাকরি পাওয়া নিয়ে শঙ্কিত। একসময় প্রচুর ভূসম্পত্তির মালিক ‘বানাই’ নামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অধিকাংশই এখন ভূমিহীন ও দারিদ্র্যসীমার নিচে। এখন পর্যন্ত রিপন বানাই নামে একজন মাত্র এই জনগোষ্ঠী থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করতে পেরেছেন। কিন্তু আদমশুমারিতে দলিত ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর পৃথক তথ্য না থাকায় উঠে আসছে না অনগ্রসর এই জনগোষ্ঠীর প্রকৃত সংখ্যা ও আর্থ-সামাজিক অবস্থা। ফলে অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে সরকার নানা উদ্যোগ নিলেও আসছে না কাক্সিক্ষত ফল। এতে চ্যালেঞ্জে পড়েছে ‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়’- স্লোগানে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, দেশে এখন দারিদ্র্যের হার ২১ দশমিক ৮ শতাংশ। অন্যদিকে উন্নয়ন সংস্থা হেকস/ইপারের পরিসংখ্যান বলছে, পেশা ও বর্ণের ভিত্তিতে বৈষম্যের শিকার দলিতদের ৯০ শতাংশ ও সমতলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ৮০ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে। এ ছাড়া দেশে মাথাপিছু গড় আয় প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার টাকা হলেও দলিত ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে তা ৮০ হাজার টাকার নিচে। বাসস্থান, লিঙ্গসমতা, অসমতা হ্রাস, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ন্যায়বিচারসহ এসডিজির অন্তত সাতটি (১, ৩, ৪, ৫, ৮, ১০ ও ১৬) সূচকে পিছিয়ে এই জনগোষ্ঠী। আদমশুমারি ও সরকারের এসডিজি ট্র্যাকারে এই জনগোষ্ঠীর পৃথক তথ্য না থাকায় তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা জানা যাচ্ছে না। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে বিশেষ কর্মসূচি নিতে গেলে সবার আগে তাদের অবস্থান, সংখ্যা, আর্থ-সামাজিক অবস্থা, মৌলিক সুবিধাগুলো প্রাপ্তির সুযোগ ইত্যাদি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দরকার। এজন্য জাতীয় আদমশুমারি সবচেয়ে ভালো সুযোগ। আর সমাজের একটা অংশকে পিছিয়ে রেখে এসডিজি অর্জন কখনো সম্ভব হবে না।’

পরিসংখ্যান নিয়ে বিভ্রান্তি : বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠী অধিকার আন্দোলনের (বিডিইআরএম) হিসাবে দেশে দলিত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৬৫ লাখ। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ২০১৬ সালে দলিত, হরিজন ও বেদে সম্প্রদায়কে অবহেলিত, বিচ্ছিন্ন, উপেক্ষিত জনগোষ্ঠী উল্লেখ করে একটা পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। তাতে দেখা যায়, দেশে ৪৩ লাখ ৫৮ হাজার দলিত, ১২ লাখ ৮৫ হাজার হরিজন, ৭ লাখ ৮০ হাজার বেদে, ১০ হাজার হিজড়া জনগোষ্ঠী রয়েছে। তবে সমাজসেবা অধিদফতর বর্তমানে দলিত শব্দটি তুলে দিয়ে সবাইকে ‘অনগ্রসর জনগোষ্ঠী’ হিসেবে দেখিয়েছে। পাশাপাশি সংখ্যা কমিয়ে দেশে ১৩ লাখ ২৯ হাজার ১৩৫ জন অনগ্রসর জনগোষ্ঠী ও ৭৫ হাজার ৭০২ জন বেদে জনগোষ্ঠী রয়েছে বলে উল্লেখ করেছে। দুই পরিসংখ্যানে পার্থক্য প্রায় ৫০ লাখ। জেলে, সন্ন্যাসী, ঋষি, বেহারা, নাপিত, ধোপা, তেলী, পাটিকর, বাঁশফোর, ডোমার, রাউত, তেলেগু, ডোমসহ যেসব জনগোষ্ঠীকে আগে ‘দলিত’ বলা হয়েছিল তাদেরকেই ‘অনগ্রসর’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিডিইআরএমের সাধারণ সম্পাদক উত্তম কুমার ভক্ত বলেন, ‘সরকার দলিতদের উন্নয়নে বিভিন্ন ভাতা, উপবৃত্তি দিলেও মূলধারার জনগোষ্ঠীর তুলনায় তা অপ্রতুল। চলতি অর্থবছর বেদে ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে বরাদ্দ ৫৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। ৬৫ লাখ অনগ্রসর মানুষের জন্য এটা নগণ্য। আবার দলিত শব্দ তুলে দেওয়ায় মূলধারার অনগ্রসর জনগোষ্ঠী সুবিধাভোগীর তালিকায় ঢুকে যাচ্ছে। এজন্য ২০১১ সালের আদমশুমারিতে ৮৮টি দলিত সম্প্রদায়ের তথ্য আলাদাভাবে সংগ্রহের জন্য পরিসংখ্যান ব্যুরোয় আবেদন করেছিলাম। কিন্তু হয়নি। আশা করছি সামনের আদমশুমারিতে সরকার তা করবে।’ জানতে চাইলে বিবিএসের পরিচালক জাহিদুল হক সরদার বলেন, ‘চলতি বছর সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ৫০টি নৃ-গোষ্ঠীর তালিকা গেজেট করায় তাদেরকে শুমারিতে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। তবে দলিতদের ব্যাপারে কোনো গেজেট বা নির্দেশনা পাইনি।’ এ ব্যাপারে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘মানুষ হিসেবে দলিত ও তৃতীয় লিঙ্গ সবাইকে একইভাবে দেখা উচিত। তবে পেশা হিসেবে আমরা আরেকটা শুমারি করব, তখন দলিতদের তথ্য আলাদাভাবে সংগ্রহ করা হবে। এই সরকারের আমলে কেউ পিছিয়ে থাকবে না। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ৫০টির বাইরেও যদি থাকে তাদেরকেও পরে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।’ দলিতদের প্রকৃত অবস্থা জানতে কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর বাজার হরিজন পল্লীতে ঢুকতেই দেখা গেল স্কুলবয়সী অনেক শিশু এখানে-সেখানে দাঁড়িয়ে। রাখি, নয়ন, বৃষ্টি, সুমন, সেঁজুতি ও জ্যোতি নামে শিশুদের বয়স ছয় থেকে ১২ বছর। পল্লীর বাসিন্দা রানী হরিজন বললেন, ‘কেউই স্কুলে যায় না।’ আঙুলের কর গুনে রানী বলেন, ‘পল্লীতে ৩১টি ছেলেমেয়ের মধ্যে ছয়জন স্কুলে যায়।’ তার সাত সন্তানের মধ্যে স্কুলে যায় দুজন। পৌরসভার অস্থায়ী পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসেবে তারা স্বামী-স্ত্রী পান ৪ হাজার টাকা। নয়জনের সংসার চলে না। হরিজন হওয়ায় বাসাবাড়ি বা রেস্তোরাঁয় ছুটা কাজে তাদের নেয় না। তাই অন্য সন্তানরা কেউ মুচি, কেউ ছুটা পরিচ্ছন্নতা কর্মীর কাজ করে। শহুরে হরিজনদের পরিস্থিতি জানতে রাজধানীর গাবতলী বেড়িবাঁধ সিটি কলোনিতে গিয়ে পাওয়া গেল ৩০টি তেলেগু পরিবার। কলোনির তেলেগু সম্প্রদায়ের একমাত্র ¯œাতক পড়ুয়া সরস্বতী দাস বলেন, ‘২০১০ সাল থেকে কলোনিতে এসএসসি পাস করেছে মাত্র চারজন। লেখাপড়া করলেও হরিজনের সন্তানরা অন্য চাকরি পাবে না ভেবে বাবা-মা স্কুলে পাঠান না।’ উপবৃত্তি প্রসঙ্গে সরস্বতী ও স্কুল পার করা আরেকজন লক্ষ্মী দাস এক সুরেই বলেন, ‘কখনোই পাইনি। কলোনির কেউ উপবৃত্তি পায় বলে জানা নেই।’ যদিও সমাজসেবা অধিদফতরের হিসাবে গত অর্থবছরে দলিতদের ১৯ হাজার শিক্ষা উপবৃত্তি দেওয়া হয়েছে। দলিতদের মতো নানামুখী সংকটে সমতলের ৩৯টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীও। হাজার দুই জনসংখ্যার এমনই একটি নৃ-গোষ্ঠী ‘বানাই’। অতিদরিদ্র এই জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক অবস্থার প্রতিফলন নেই আদমশুমারিতে। বানাই সম্প্রদায়ের একমাত্র উচ্চশিক্ষা শেষ করা ব্যক্তি রিপন চন্দ্র বানাই বলেন, একসময় বানাইদের অনেক জমিজমা ছিল। ধোবাউড়ায় উল্লাস চন্দ্র বানাইয়ের ছিল প্রায় ১০০ একর জমি। মারা যাওয়ার আগে ১৫ একরের মতো জমি দিয়ে যেতে পেরেছিলেন দুই ছেলেকে। এখন এ সম্প্রদায়ের ৮০ ভাগই ভূমিহীন ও দরিদ্র। শিক্ষা নেই বললেই চলে। নারীদের মধ্যে একমাত্র শতাব্দী বানাই আনন্দমোহন কলেজে পড়ছেন। হাতে গোনা তিন-চারজন মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়ছেন। বানাইদের মূল পেশা মাছ ধরা ও তাঁত বন্ধ হওয়ায় ক্রমেই তারা দরিদ্র হচ্ছেন।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর