শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ২৩:৫০

ড্যান্স ক্লাবের আরেক পিঠ

মির্জা মেহেদী তমাল

ড্যান্স ক্লাবের আরেক পিঠ

নারায়ণগঞ্জের মেয়ে সোফিয়া। পারিবারিক অশান্তির মধ্যেই বড় হয়েছেন তিনি। বাবা মায়ের বিচ্ছেদ দেখেছেন ছোট থাকতেই। বাবা আরেকটি বিয়ে করেন। সৎ মায়ের সঙ্গে মানাতে পারেননি। লেখাপড়াও বেশিদূর হয়নি। নাচ শেখার প্রতি ছিল তার প্রবল আগ্রহ। আগ্রহ থেকেই এলাকার একটি ড্যান্স গ্রুপের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ডাক পড়লে সেই গ্রুপের হয়ে নাচ করতেন। তবে তার নিজের খরচও সেটা দিয়ে মেটানো সম্ভব হতো না। বিভিন্ন স্থানে ছোটখাটো চাকরির জন্য গিয়েছেন। হয়নি। গার্মেন্টে কিছুদিন চাকরি করলেও তার ভালো লাগেনি। হঠাৎ একদিন একটা প্রস্তাব পেলেন। মধ্যপ্রাচ্যের ড্যান্স ক্লাবে নাচতে হবে। মাস শেষে মোটা অঙ্কের টাকা পাবেন। প্রস্তাবটা দিয়েছেন তার ড্যান্স গ্রুপেরই একজন। এই প্রস্তাব পেয়ে ভীষণ খুশি সোফিয়া। বিদেশ যাবেন। হাতে টাকা আসবে। তাকে আর কারও মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হবে না।  সোফিয়া জীবন গোছানোর নতুন এক স্বপ্নে বিভোর। কিন্তু তার সেই স্বপ্ন একটা সময়ে দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। তিনি বুঝতে পারেন, ভয়ঙ্কর এক চক্রের ফাঁদে  তিনি পড়েছেন। যেখান থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন। সুন্দর জীবনের আশায় সোফিয়া দেশ ছেড়েছিলেন, সেই সোফিয়ার কাছে জীবন মূল্যহীন হয়ে পড়ে। সোফিয়া জানান, আমি এখানে ড্যান্স শিখেছিলাম। ওই চক্রের এক সদস্য ভালো বেতনে ড্যান্স বারে চাকরির কথা বলে আমাকে দুবাইয়ে নিয়ে যায়। সেখানে পৌঁছানোর পর প্রথম ১০ থেকে ১২ দিন আমার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করছিল চক্রটি। বারে ড্যান্স করার সুযোগও দিয়েছে। এরপরে ওই বারের গেস্টদের ফোন নম্বর দেওয়া হয় এবং আমাকে কথা বলতে বলে। কিন্তু তার প্রস্তাবে আমি রাজি হইনি। এরপরেই আমার ওপর চলতে থাকে নির্যাতন। আমার মতো আরও নারীদের অবস্থাও একই রকম। তিনি বলেন, দুবাইয়ের ওই ড্যান্স বারে টোকেন সিস্টেমে যৌন কাজ হয়। আর প্রতিদিন ২০টি টোকেন না দিতে পারলে ওই চক্রের সদস্যরা মারধর করে। এরপর জোর করে মদ পান করায়, তারপর আমাদের রুমে গেস্ট পাঠিয়ে দেয়। এভাবেই দুবাইয়ে যন্ত্রণাময় কয়েক মাস কাটিয়েছি আমরা। সঙ্গে ওই বারে বাংলাদেশি কয়েকটি মেয়ে ছিল। কথা না শুনলে তাদের ওপর চলত নির্যাতন। তিনি আরও বলেন, প্রতিদিন ২০টি টোকেন না দিতে পারলে মারধরের সঙ্গে টাকা দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হতো। এবং চলতো দিনভর মানসিক নির্যাতন। আর ২০টি টোকেন দিতে পারলেই তাদের মাস শেষে নামমাত্র কিছু টাকা ধরিয়ে দেওয়া হতো। দুবাইয়ে পাচারের শিকার হয়েছিলেন আরেক তরুণী জাহানারা (ছদ্মনাম)। তিনি ফেরত আসার পর বলেন, দুবাইয়ে আমাকে যে স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানে প্রায় ৫ হাজারের মতো বাংলাদেশি তরুণীকে দেখেছি। যারা সবাই প্রতারণার শিকার। তাদের দিয়ে দুবাইয়ের বিভিন্ন বারে দেহ ব্যবসা করানো হতো। তিনি বলেন, যে নির্ধারিত টোকেন না দিতে পারে তাদের ঘরে বন্দী করে দু-তিন দিন খাবার বন্ধ করে দেয় চক্রটি। তাতেও যদি কাজ না হয় তাহলে চলে টানা মারধর। পাচারের শিকার মিতু (ছদ্মনাম) নামে আরেক তরুণী দিলেন সবাইকে সতর্ক বার্তা। তার একটাই অনুরোধ, ভবিষ্যতে যেন কোনো মেয়ে এ ধরনের প্রলোভনে জীবন নষ্ট না করে। কারণ তিনি জানালেন একই কথা, বিদেশে ড্যান্স বারের নামে চলে দেহ ব্যবসা। ওখানে জোরপূর্বক এই শিল্প। তাই জায়গায় ছোট হলেও বাংলাদেশেই যেন মেয়েরা তাদের ড্যান্স ক্যারিয়ার গড়ে। মধ্যপ্রাচ্যের ড্যান্স ক্লাবের আরেক পিঠ রয়েছে। যেখানে শুধুই অন্ধকার। ফেরার পথ খুঁজে পাওয়া যায় না। এ ধরনের পাচারের ভয়ঙ্কর চক্রের সন্ধান পায় র‌্যাবের একটি দল। র‌্যাব-১১ গত ২৩ নভেম্ব^র রাতে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ও রাজধানীর খিলগাঁও থানার গোড়ান এলাকা থেকে আটক করে অনীক হোসেন, মনির হোসেন, আক্তার হোসেন, আফতাউল ইসলাম পারভেজ ও আবদুল হান্নান নামে পাচারকারী চক্রের ছয় সদস্যকে। ওই রাতেই চার তরুণীকে উদ্ধার করা হয়, যাদের পাচার করার প্রস্তুতি চলছিল। এ সময় ৭০ তরুণীর পাসপোর্ট, ২০০ পাসপোর্টের ফটোকপি, অর্ধশত বিমানের টিকিট, অর্ধশত ট্যুরিস্ট ভিসার ফটোকপিসহ অন্যান্য সরঞ্জাম উদ্ধার করে। র‌্যাব জানায়, আটকদের মধ্যে আকাশ এবং হান্নান ‘মোবিন এয়ার’ নামের একটি ট্রাভেল এজেন্সির মালিক। এ ছাড়া আক্তার হোসেন নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার ‘গাঙচিল’ ও ‘তারার মেলা’ নামে দুটি ড্যান্স ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা প্রশিক্ষক এবং অনীক হোসেন রাজধানীর উত্তরার ‘এডিসি অনীক ড্যান্স  কোম্পানি’র প্রতিষ্ঠাতা প্রশিক্ষক। তারা স্বীকার করেছে তারা দুবাই ও মালয়েশিয়াসহ সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন স্টেট ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ড্যান্স ক্লাবে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে গত এক বছরে অর্ধ সহস্রাধিক তরুণীকে পাচার করেছে। র‌্যাবের অনুসন্ধান ও অভিযান পরিচালনাকারী দলের কর্মকর্তারা বলেন, মূলত এ পাচারকারী চক্রের প্রধান লক্ষ্যই হচ্ছে বিভিন্ন গার্মেন্টে কর্মরত স্বল্পশিক্ষিত সুন্দরী তরুণীসহ পারিবারিক ভাঙন ও বিবাহ বিচ্ছেদের শিকার তরুণীরা। এ ধরনের প্রলোভনে পড়ে কেউ যেন আর বিদেশে পাড়ি না দেন, সে বিষয়ে সতর্ক করলেন র‌্যাব কর্মকর্তারা।


আপনার মন্তব্য

close