শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ২৩:৪৫

নদীর কান্না

দখলে-দূষণে নাভিশ্বাস হালদার

রেজা মুজাম্মেল, চট্টগ্রাম

দখলে-দূষণে নাভিশ্বাস হালদার
দখল দূষণে বেহাল দশা হালদার -বাংলাদেশ প্রতিদিন

চট্টগ্রাম নগরের একটি বিশাল অংশের আবাসিক ও শিল্প বর্জ্য খন্দখিয়া খাল ও বামনশাহী খাল হয়ে পড়ছে উপমহাদেশের অন্যতম প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীতে। হালদা নদী সংলগ্ন অন্তত ১০টি কাঁচাবাজারের বর্জ্যও পড়ছে এ নদীতে। আছে বিষাক্ত কীটনাশকের থাবা। নতুন যোগ হয়েছে পর্যটক বর্জ্য। সঙ্গে আছে জগদ্দল পাথরের মতো দীর্ঘদিন ধরে জেঁকে থাকা রাবার ড্যাম। অবৈধভাবে উত্তোলন করা হয় বালি। অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত হয়েছে বাঁধ ও স্লুইস গেট। এভাবে অক্টোপাশের মতো বহুমাত্রিক অত্যাচারে নাভিশ্বাস উঠেছে প্রাকৃতিক এ সম্পদটির। গত দুই বছরে এ নদীতে মারা গেছে ২২টি ডলফিন।

উপমহাদেশে প্রাকৃতিকভাবে রুই, কাতলা ও কার্প জাতীয় মাছ প্রজননের অন্যতম ক্ষেত্র হালদা নদী। চট্টগ্রামের হাটহাজারী, রাউজান ও ফটিকছড়ি উপজেলাকে কেন্দ্র করে গড়ে নদীটির দৈর্ঘ্য ১২৩ কিলোমিটার। এ নদী ঘিরে জীবিকানির্বাহ করেন আশপাশের প্রায় আড়াই হাজার জেলে। খাগড়াছড়ি জেলার রামগড় উপজেলার ১ নং পাতাছড়া ইউনিয়নের হালদা ছড়া থেকে উৎপত্তি হয়ে নদীটি কালুরঘাটের কাছে কর্ণফুলীতে গিয়ে মিশছে। হালদায় ৩৬টি ছড়া ও খাল এসে যুক্ত হয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির সমন্বয়ক ও চবি প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, ‘তিনটি কারণে নদী বৈশিষ্ট্য হারায়। দূষণ, পানির স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা প্রদান এবং দখল। দুঃখজনক সত্য হলো, তিনটিই এখন বিদ্যমান। তবে বর্তমানে মুজিববর্ষে হালদা নদীকে ‘বঙ্গবন্ধু মৎস্য হ্যারিটেজ’ ঘোষণার সিদ্ধান্তে নদীটি রক্ষায় নীতিমালা প্রণয়নসহ প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। আশা করছি এর মাধ্যমে সকল প্রতিবন্ধকতা দূর করা সম্ভব হবে।’ হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, গত এক বছরে দিন-রাত মিলে প্রায় একশত অভিযান পরিচালনা করা হয়। সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, হালদা নদীতে সরাসরি বর্জ্য পড়ে দূষণ করা খালগুলো হলো- মাদার্শা ইউনিয়নের খন্দকিয়া, কাটাখালী ও মাদারী খাল। এর সঙ্গে আছে শিকারপুর ইউনিয়নের কুয়াইশ, বাথুয়া, হামিদিয়া ও কৃষ্ণখালী খাল। প্রায় তিন বছর ধরে নগরীর বায়েজিদ থেকে কুলগাঁও এলাকার শিল্প কারখানার খাল হয়ে গিয়ে পড়ছে হালদা নদীতে। তাছাড়া চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) ‘অনন্যা’ আবাসিক এলাকার কাটা মাটি ও আবাসিক বর্জ্য প্রকল্পের মূল নালা হয়ে কুয়াইশ, কৃষ্ণখালী ও খন্দকিয়া খাল হয়ে হালদায় পড়ছে। দূষণের মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে হালদায়। বিষাক্ত কীটনাশক : হালদা নদীর দুই পাশে আছে বড় আকারের বিস্তৃত দুটি বিল। এখানে বছরে দুবার ফসল উৎপাদন করা হয়। আছে ছোট-বড় প্রায় ১৫টি বাণিজ্যিক চা বাগান। এসবে ব্যবহৃত হয় প্রচুর পরিমাণ কীটনাশক। কীটনাশক পানির সঙ্গে মিশে পড়ে হালদা নদীতে। এর মধ্যে আছে অর্গানোকোরিন, অর্গানোফসফরাস, অর্গানোকার্বনেট, সিনথেটিক পাইরিথ্রয়েড গ্রুপের মারাত্মক ক্ষতিকারক কীটনাশক। কীটনাশকের প্রভাবে মাছ ও জলজ প্রাণীর ওপর নানা ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। অপরিকল্পিত রাবার ড্যাম : অপরিকল্পিতভাবে হালদা নদীতেই নির্মিত হয়েছে রাবার ড্যাম। এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, হালদার উজানে ২০১১ সালে ফটিকছড়ি উপজেলার ভূজপুর অংশে ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫৫ মিটার দৈর্ঘ্যরে ও ৪ মিটার উচ্চতার একটি রাবার ড্যাম নির্মিত হয়। ২০১২ সালে হালদার উজানে ফটিকছড়ি এলাকার  হারুয়ালছড়ি খালে ৩০ মিটার দৈর্ঘের ও সাড়ে ৪ মিটার উচ্চতার একটি রাবার ড্যাম নির্মিত হয়। হালদা নদীর পানির অন্যতম উৎস হারুয়াছড়ি খালেও প্রায় ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় একটি রাবার ড্যাম। তাছাড়া ধুরং খালে আছে কংক্রিট ড্যাম। অন্যদিকে কাটাখালী, খন্দকিয়া, বজ্জাখালী, সাকাদা, মাদারী খাল, কুমারখালী, মখদাইর, ডোমখালী, কাগতিয়া, পোড়াকপালী, সোনাইখাল, চেঙ্গাখালী, বোয়ালিয়াসহ ছোট-বড় অন্যান্য খালের মুখে অপরিকল্পিত বাঁধ দেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে প্রতিনিয়ত কাটা হচ্ছে নদীর পাড়। এতে হারাচ্ছে নদীর নাব্যতা। আছে ১২টি বাঁক : বর্তমানে হালদা নদীতে ১২টি বাঁক কেটেছে স্থানীয়রা। এর মধ্যে ভাটিতে নয়টি ও উজানে তিনটি। বাঁক কাটার কারণে হালদা নদীর দৈর্ঘ্য কমেছে ২৫ কিলোমিটার। সর্বশেষ ২০০১ সালে গড়দুয়ারার সোনাইয়ারছড়া পয়েন্টে একটি বাঁক কাটা হয়। তাছাড়া ১৯০৫-১০ সালের দিকে গুজরা, ১৯২৮ সালে মাছুয়াঘোনা এলাকায়, ১৯৪৮ সালে ফটিকছড়ির আবদুল্লাহপুর গ্রাম, হাটহাজারীর ছিপাতলী গ্রাম ও বাড়িঘোনা এলাকায় পৃথক তিনটি, ১৯৬২ সালে ফটিকছড়ির ভূজপুরে, ১৯৬৪ সালে অংকুরিঘোনা গ্রামে, ১৯৭৫ সালে হারুয়ালছড়ি ও সুন্দরপুর গ্রামে দুটি, ১৯৮৮-৮৯ সালে রাউজানে সোনাইরচর এলাকায় একটি ও ২০০২ সালে কাগতিয়ার চর এলাকায় একটি বাঁক কাটা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত মা মাছ নদীর বাঁকের অগভীর অংশে ডিম ছাড়ে। কিন্তু বাঁক কাটার কারণে প্রজনন এলাকা কমে গেছে। আগে যেসব পয়েন্টে মাছ ডিম দিত বাঁক কাটার কারণে সেখানে আর ডিম দেয় না।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর