শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ২৯ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৮ মার্চ, ২০২০ ২৩:৩৮

গ্রামে গ্রামে করোনা ভীতি

চরম অভাবে পঞ্চগড়ের মানুষ, চা পাতার দাম নেই, পাথর তোলা নিষিদ্ধ লকডাউনের কবলে সব দোকানপাট, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান বন্ধ

মাহমুদ আজহার ও সরকার হায়দার, পঞ্চগড় থেকে

গ্রামে গ্রামে করোনা ভীতি

সারা দেশের মতো পঞ্চগড়েও করোনাভাইরাসভীতি চলছে। একদিকে বিদেশ ও ঢাকাফেরত নিয়ে শঙ্কা, অন্যদিকে ভারতের সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় দুই দেশের কিছু কালোবাজারির যাতায়াতেও উদ্বিগ্ন সাধারণ মানুষ। স্থানীয় প্রশাসন হন্যে হয়ে খুঁজলেও তারা লাপাত্তা। এরই মধ্যে লকডাউনের প্রভাবে তীব্র সংকটে পড়েছে পঞ্চগড়ের শ্রমজীবী ও নি¤œআয়ের মানুষ। চরম বিপাকে ক্ষুদ্র চা-চাষিরাও। চা-পাতার উপযুক্ত দর মিলছে না। চা-পাতার দামের চেয়ে উৎপাদন খরচ বেশি। এর মধ্যে বেচাকেনাও বন্ধ। নদীতে পাথর তোলাও নিষিদ্ধ। পাথর শ্রমিকদেরও মাথায় হাত। শ্রমিক শ্রেণি যারা দিন আনে দিন খায়-তারা সবাই এখন ঘরবন্দী।

এদিকে পঞ্চগড় সিভিল সার্জন ও প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, পঞ্চগড়ে এখনো করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কারও সন্ধান পাওয়া যায়নি। আইসোলেশনে নিয়ে একজনকে পরীক্ষা করে করোনাভাইরাস পাওয়া যায়নি। ১৬ মার্চ থেকে হোম কোয়ারেন্টাইন শুরু হয় পঞ্চগড়ে। ৬৮৯ জনের মধ্যে এখন হোম কোয়ারেন্টাইনে আছে ৩৬৮ জন। ভাইরাসটি প্রতিরোধে এই জেলায় চলছে অঘোষিত লকডাউন। শহর ছাড়াও গ্রামে গ্রামে মানুষ এখন ঘরবন্দী। তেঁতুলিয়া উপজেলার প্রায় লক্ষাধিক শ্রমিক সংকটে পড়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা শহর এলাকার কিছু দরিদ্র মানুষের বাড়ি বাড়ি খাবার পৌঁছে দিলেও এখনো গ্রামের মানুষের খোঁজ নেয়নি বলে অভিযোগ করছেন স্থানীয়রা। তবে গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র মানুষের  তালিকা তৈরির কাজে হাত দিয়েছে প্রশাসন। উপজেলার ভজনপুর এলাকার ডিমাগজ গ্রামের শামসুল হক সরকার জানান, কাজ কাম নেই। খাবারের সংকট দেখা দিয়েছে গ্রামে। ডাক্তারপাড়া গ্রামের নজিবুল ইসলাম জানান, প্রতিদিন কাজ করে যা পেতাম তাই দিয়ে সংসার চলত। এখন কোনো কাজ নেই। যে টাকা জমা করেছিলাম তা শেষ। এখন প্রায় না খাওয়া অবস্থা। তেঁতুলিয়ার মহানন্দা পাড়ের হাসিবুল নামে এক পাথর ব্যবসায়ী জানালেন, নদীতে পাথর তোলা বন্ধ। দেশের বাইরে থেকে বিশেষ করে ভারত ও ভুটান থেকে পাথরও আসছে না। আমাদের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এখন পথে বসে যাওয়ার উপক্রম। জানা যায়, কয়েক মাস আগে সরকার প্রকৃতিবিরোধী পাথর উত্তোলনের কাজ বন্ধ করে দেয়। পাথর শ্রমিক ও ক্ষুদ্র পাথর ব্যবসায়ীরাও চরম বিপদে পড়েছে। তাদের জমানো টাকাও প্রায় শেষ। এমন অবস্থায় খাবারের তীব্র সংকটের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে এই জেলার কয়েক লাখ দিনে আনা দিনে খাওয়া মানুষ। এই উপজেলার বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর বন্ধ হয়ে গেছে। চা-শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়েছে। কৃষি শ্রমিক এবং পাথর শ্রমিকরা মহাসংকটের মুখোমুখি এখন। হোটেল, রেস্তোরাঁ বন্ধ হওয়ার কারণে খাবারের সংকটে পড়েছে পথে জীবনযাপন করা মানসিক ভারসাম্যহীন বেশ কয়েকজন মানুষ। এই মানুষদের স্থানীয় হোটেল, রেস্তোরাঁ থেকে খাবার সরবরাহ করা হতো। শহরাঞ্চলের কিছু মানুষ খাবার পেলেও গ্রামের নিঃস্বজনরা এখনো কোনো সাহায্য পায়নি। তারা বলছেন, দ্রুত তাদের কাছে খাবার পৌঁছানো হোক। তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মাসুদুল হক জানান, পঞ্চগড় জেলায় সবচেয়ে বেশি বেকার হয়ে পড়েছে এই উপজেলার মানুষ। কারণ এই এলাকায় অধিকাংশ মানুষ চা, পাথর শিল্প সংশ্লিষ্ট এবং বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের নানা কাজে জড়িত। করোনাভাইরাসের উপদ্রবের কারণে তারা এখন সম্পূর্ণ বেকার। এখন পর্যন্ত যে পরিমাণ ত্রাণ পাওয়া গেছে তা অপ্রতুল। আমরা ইতিমধ্যে তালিকা তৈরির কাজে হাত দিয়েছি। সরকারের পাশাপাশি দরিদ্র মানুষের খাদ্য সহযোগিতায় তিনি স্থানীয় ও দেশের বিত্তশালীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তবে ত্রাণসামগ্রী বিতরণের তালিকা তৈরির কাজে জনপ্রতিনিধিদের সংশ্লিষ্টতাকে অনেকে সন্দেহ করছেন। নিজস্ব ভোটারের নাম দিয়ে তালিকা করতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন তারা। এতে অনেক নিরীহ মানুষ সরকারের সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক সাবিনা ইয়াসমিন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, এখন পর্যন্ত ৮০০ দরিদ্র পরিবারে খাবার দেওয়া হয়েছে। তালিকা করা হচ্ছে, প্রত্যেক দরিদ্র পরিবারে খাবার পৌঁছে যাবে। এই সংকটের সময় জেলা প্রশাসন মানুষের পাশে রয়েছে। আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি। কষ্ট হলেও তিনি সবাইকে ঘরে থাকার আহ্বান জানান।


আপনার মন্তব্য