শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩ এপ্রিল, ২০২০ ২৩:৪৪

আমাদের কথা একটু শোনেন...

রুকনুজ্জামান অঞ্জন

আমাদের কথা একটু শোনেন...

কালশী (মাটিকাটা) থেকে মিরপুর ডিওএইচএসের দিকে পিচঢালা রাস্তা ধরে কিছুটা এগিয়ে যেতেই হাতের ডানপাশে তাদের সারি সারি ঘর। ঠিক ঘর নয়, বস্তির মতো মাথা গোঁজার ঠাঁই। এসব ঘরে থাকে মিরপুরে আটকে পড়া পাকিস্তানিদের একটি অংশ। সংখ্যায় কয়েক হাজার। এই লোকগুলো গতকাল বিকালে বিধিনিষেধ ভেঙে হঠাৎ ঘর ছেড়ে রাস্তায় নেমে এলেন। রাস্তায় সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে কয়েকশ মানুষ চিৎকার করছেন... ভিড় করছেন। কারণ তারা ক্ষুধার্ত। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে দেশের মানুষের জন্য যে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কথা, মুখে মাস্ক পরা ছাড়া আর কোনোটাই তারা রক্ষা করছেন না। তাদের হাতে বেশকিছু প্লাকার্ড। সেসব প্লাকার্ডে লেখা, ‘৫ দিন যাবৎ ক্ষুধার্ত, ‘নিরাপত্তা ক্ষুধার চেয়ে বড়ো না’..।  সরকারি ছুটি থাকায় খবর সংগ্রহে সচিবালয়ে যেতে হচ্ছে না। কয়েকদিন ধরে মিরপুরের রূপনগরের বাসা থেকে সরাসরি অফিসে যাচ্ছি। গতকাল বিকালে যখন অফিসের দিকে যাচ্ছিলাম, তখনই কালশীর কাছে হঠাৎ মানুষের এ জটলা চোখে পড়ে। বাইক থামাতেই ঘিরে ধরলেন কিছু নারী-পুরুষ। তাদের কথায় যেটুকু বোঝা গেল, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার দোকানপাট, অফিস-আদালত বন্ধ করে দেওয়ায় তাদের আয়ের পথ একেবারেই থমকে গেছে। খাবার কিনে খাবেন সে টাকা নেই কারও কাছে। ঘরের অল্প কিছু খাবারও ফুরিয়ে গেছে। দরিদ্র মানুষের জন্য নানাদিক থেকে সরকারি-বেসরকারি সাহায্য সহায়তা এলেও তার ছিটেফোঁটাও পাননি তারা। আটকে পড়া এই পাকিস্তানিদের পেশা বিচিত্র। এদের কেউ রিকশা চালান, কেউ কাপড়ে জরি বসান, কেউ নরসুন্দর (চুল কাটার কাজ), কেউ জুতা তৈরি করেন, কেউ দর্জি, কসাইখানায়, কেউবা আবার ফুটপাথে বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করে দিনযাপন করেন। এদের সংসারে নারী ও শিশুরাও এসব কাজকর্মে জড়িত। কিন্তু কয়েকদিন ধরে আটকে পড়া পাকিস্তানি ঘরগুলোর আবালবৃদ্ধবনিতা সবাই কর্মহীন। ‘কাম না পেলেও খাওন লাগে রে বাপ।’ ভিড় ঠেলে একজন সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধা এগিয়ে আসেন। তার নাম নূরজাহান। কয়েকদিন না খেয়ে থাকায় তার মুখ এখন ক্লিশে। কিছুটা এগিয়ে গিয়ে সারিবদ্ধ মানুষগুলোর হাতে ধরা প্লাকার্ডগুলো দেখতে চেষ্টা করি। ‘করোনায় নয়, অনাহারেই মারা যাবো’, ‘আমাদের নিকট কোনো ত্রাণ আসেনি। যদি আপনি দিয়েছেন, তা দালালদের পকেটে গেছে’। সারিবদ্ধ মানুষের পেছনে একটা সাইনবোর্ড যাতে লেখা ‘স্ট্র্যান্ডেড পাকিস্তানিজ’। জানা গেছে, বাংলাদেশে এসব আটকে পড়া পাকিস্তানির সংখ্যা ৫ লাখের ওপরে, যাদের মধ্যে সাড়ে তিন লাখের বসবাস রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় শরণার্থী ক্যাম্পে। বাংলাদেশে এসব মানুষ ‘বিহারি’ নামে পরিচিত। তাদের ভাষায়, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে তাদের দাবি-দাওয়ার বিষয়ে কোনো সরকারই তেমন কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি তাদের আস্থা আছে। ভিড় থেকে একজন মুরব্বি নিজেকে জামালউদ্দিন বলে পরিচয় দিয়ে বললেন, ‘আপনি একটু ভালো করে আমাদের কথা লিখে দেন। এখানে আর কোনো রাজনৈতিক নেতা আমাদের খোঁজ লেয়নি। শেখ হাসিনা খুব দরদি মানুষ। তিনি জানতে পারলে, আমাদের জন্য সাহায্য আসবেই।’ বাংলাদেশে আটকে পড়া এই পাকিস্তানিদের নানা সমস্যা। দীর্ঘদিন এদের মূল সমস্যা ছিল নাগরিকত্ব নিয়ে। এরা বাংলাদেশি না পাকিস্তানি? হাই কোর্টের রায় অনুসারে সেই সমস্যার সমাধান হয়েছে। ১৯৭১ সালের পর জন্ম নেওয়া বিহারিরা জন্মসূত্রে বাংলাদেশি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় আসার পর এরা জাতীয় পরিচয়পত্র পেয়েছে। ভোটাধিকারের সুযোগও সৃষ্টি হয়েছে। এদের সন্তানরা শিক্ষার সুযোগ পেয়েছে। হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা সুবিধাও পাচ্ছে। সে কারণে, যখন হঠাৎ এক আনুবিক্ষণিক নির্জীব ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে সারা বিশ্বের মতো থমকে গেছে বাংলাদেশ, মানুষের আয়-রোজগার গেছে বন্ধ হয়ে, তখন এই ভয়াবহ বিপর্যয়ে ক্ষুধায় কাতর অসহায় মুখগুলো প্রধানমন্ত্রী ছাড়া আর কার কাছেই বা আবেদন জানাবেন...।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর