শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ২৩:৪৯

মহামারীতে বেড়েছে নারী সহিংসতা

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শৈথিল্য, আট মাসে ধর্ষণ ৮৮৯, যৌতুকের ঘটনা ১৬৩

জিন্নাতুন নূর

মহামারীতে বেড়েছে নারী সহিংসতা

করোনার মহামারীতে নারীর ওপর সব ধরনের নির্যাতন ও সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে। নারীনেত্রী ও মানবাধিকারকর্মীরা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, করোনা সংক্রমণ শুরুর প্রথম দিকে গ্রামাঞ্চলে মানুষের চলাচলে বিধিনিষেধ থাকায় নির্যাতিত নারীরা চাইলেও কারও সহযোগিতা পাননি। এমনকি নারী যে তার বাপের বাড়ি গিয়ে আশ্রয় নেবেন সে সুযোগও ছিল না। চলাচলে বিধিনিষেধ থাকার সুযোগে গত কয়েক মাসে বহু ধর্ষণকারী নিজের কুপ্রবৃত্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। আবার সামাজিক নিরাপত্তার কারণে নারী নির্যাতন-সংশ্লিষ্ট মামলার আইনজীবীরা চাইলেও ভুক্তভোগীকে সহযোগিতা করতে পারেননি। থানাগুলোতেও অনলাইনে মামলার তদন্ত-সংশ্লিষ্ট ও ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কাজ করতে সমস্যা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শৈথিল্যে ধর্ষণকারীরাও ছিল বেপরোয়া। আবার করোনা সংক্রমণ শুরুর প্রথম কয়েক মাসে দেশে আদালত বন্ধ থাকায় নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনাগুলো বৃদ্ধি পায়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়ে ৮৮৯ জন নারী ধর্ষণের শিকার হন। এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হন ১৯২ জন। ধর্ষণের পর মৃত্যু হয় ৪১ জনের। ধর্ষণের চেষ্টা করা হয় ১৯২ জনকে আর ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেন ৯ জন নারী।

এই আট মাসে স্বামীর নির্যাতনে মারা যান ১৬৩ নারী। যৌতুকের কারণে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন ৬৬ জন। শারীরিক নির্যাতনের কারণে ৫৫ জন মৃত্যুবরণ করেন। এই সময়ে অ্যাসিড হামলার শিকার হন ১৭ জন নারী। তবে শুধু নারীরাই নয়, করোনাকালে কন্যাশিশুদের ওপরও চলে নির্মম অত্যাচার। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের দেওয়া তথ্যে, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়ে ৩২৪ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয় আর যৌন নির্যাতনের শিকার হয় ১০৪ জন শিশু। বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট এলিনা খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, করোনাকালে সামাজিক নিরাপত্তার কারণে চলাচলে সীমাবদ্ধতা থাকায় নারী নির্যাতনের মামলাগুলোতে আইনজীবীরা ভুক্তভোগীকে সহযোগিতা করতে পারছেন না। আবার থানাগুলোতে অনলাইনে মামলার তদন্ত-সংশ্লিষ্ট ও ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কাজ করতে গিয়ে সমস্যা হচ্ছে। করোনার এই সময়েও ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারগুলোতে ভুক্তভোগী নারীরা আসছেন। অর্থাৎ অপরাধ কিন্তু কমেনি। সাধারণ সময়েও নারীর ওপর সহিংসতা হয় কিন্তু করোনায় অর্থনৈতিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতন একসঙ্গে সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা এই সময়ে চাইলেও অনেক মামলা করতে পারছি না। কর্মক্ষেত্রে জনবল কমে যাওয়ায় তদন্তের জন্য লোক পাঠাতে পারছি না। এর ওপর করোনার প্রথম কয়েক মাসে দেশে আদালত বন্ধ ছিল। এখন খুললেও খুব সীমিত পরিসরে সেখানে কাজ হচ্ছে। করোনা মহামারী যেন নারী সহিংসতাকেও মহামারীতে পরিণত করছে। আমরা দেখছি যে, মহামারীর সময় পারিবারিক সহিংসতা যেমন আছে, তেমনি নারী পাচারের ঘটনাও ঘটছে। আবার রেড লাইট এরিয়াগুলোও সেভাবে মনিটর করা যাচ্ছে না। এ সময় জবাবদিহি অনেক কমে গিয়েছে। আবার অ্যাক্সেস টু জাস্টিসের সুযোগও কম।’ সংশ্লিষ্টরা বলেন, করোনায় গৃহকর্মী অনেক নারীর চাকরি চলে যাওয়ায় তারা এখন উপার্জন ছাড়া দুর্দিন কাটাচ্ছেন। এদের অনেককেই স্বামীকে হাতখরচের জন্য টাকা দিতে হয়। কিন্তু উপার্জন না থাকায় সে অর্থ দিতে না পারায় এই গৃহকর্মীদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে। আবার পুরুষদেরও কাজের সুযোগ কমে আসায় তারা মোবাইলে ইন্টারনেটের অপব্যবহার করছেন, যা সমাজে যৌন সহিংসতার ঘটনা উসকে দিচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শৈথিল্যে ধর্ষণকারীরাও ধরে নিয়েছে যে তারা অপরাধ করে পার পেয়ে যেতে পারবে। তবে এ সমস্যা শুধু বাংলাদেশের নয়, পাশের দেশ ভারতেও এ সমস্যা দেখা যাচ্ছে। তারা আরও বলেন, কর্মহীন যে পুরুষরা বাসায় বসে আছেন, আয় করতে পারছেন না, তারা খাওয়াসহ প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে নারীর ওপরই অত্যাচার বেশি করছেন। ঘরের বাইরেও নারীর প্রতি সহিংসতা হতে দেখা যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কিছু জঘন্য চরিত্রের লোক কন্যাশিশু ও নারী যাকে পাচ্ছে তাকেই ধর্ষণ করছে। মহামারীতে চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকায় সময়টাকে কাজে লাগিয়ে তারা নিজেদের কুপ্রবৃত্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে। নারীনেত্রী এবং মানবাধিকারকর্মী খুশী কবির বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘মহামারীতে নারীর প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধির পেছনে অনেকগুলো কারণ দেখতে পাচ্ছি। করোনা সংক্রমণ শুরুর প্রথম দিকে গ্রামাঞ্চলে যখন মানুষের চলাচলে কঠোর বিধিনিষেধ ছিল, তখন নির্যাতিত নারীরা চাইলেও সহজে কারও সহযোগিতা পাননি। হয়তো এই সহযোগিতা নির্যাতিত নারীরা স্থানীয় সরকার, পরিবার, গ্রাম্য সমিতি বা সংগঠন, স্থানীয় থানা, ইউএনও থেকে পেতেন। কিন্তু লকডাউনের সময় তাদের পক্ষে সে সহযোগিতা নেওয়া সম্ভব হয়নি। এমনকি নারী যে তার বাপের বাড়ি গিয়ে আশ্রয় নেবেন সে সুযোগও ছিল না। বলা যায় সে সময় নারীরা বন্দী হয়েই নির্যাতন সহ্য করেছেন। এমনকি আশপাশের মানুষও নির্যাতিতাকে সহযোগিতা করতে পারেননি। মূল কথা হচ্ছে সরকারের আইন, নীতি ও ব্যবস্থাপনা সবকিছু থাকার পরও যেহেতু এ ধরনের মামলাগুলোর বিচার দ্রুততার সঙ্গে হচ্ছে না এবং অপরাধীর বিচার হচ্ছে না, এ জন্য সমাজে এসব অপকর্ম নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।’


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর