শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৭ অক্টোবর, ২০২০ ০০:১৭

কুষ্টিয়ায় পরিমল থিয়েটারের জমি জালিয়াতি করে বাণিজ্যিক ভবন

জহুরুল ইসলাম, কুষ্টিয়া

কুষ্টিয়ায় পরিমল থিয়েটারের জমি জালিয়াতি করে বাণিজ্যিক ভবন

শহরের ঐতিহ্যবাহী নাট্য সংগঠন পরিমল থিয়েটারের ২০ কোটি টাকার জমি জালিয়াতির মাধ্যমে বিক্রি করে দিয়েছে একটি চক্র। সেই জমিতে নির্মাণ করা হয়েছে ১০ তলা বাণিজ্যিক ভবন। ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই ক্ষোভে ফুঁসছেন স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীরা। অবিলম্বে জমির মালিকানা পরিমল থিয়েটারের অনুকূলে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি করেছেন তারা।

জেলার একদল সংস্কৃতিকর্মী ১৯১২ সালে পরিমল থিয়েটার স্থাপনের উদ্যোগ নেন। শহরের প্রাণকেন্দ্র এনএস রোডে প্রায় ১৯ শতক জায়গার ওপর গড়ে তোলা হয় বিশাল থিয়েটার ভবন। সেখানে নিয়মিত চলত সংস্কৃতিচর্চা। অভিনেতা রাজু আহমেদ, আহমেদ শরীফ, মিজু আহমেদ, কায়েস ও সুজাতা এবং গায়ক আবদুল জব্বার, খালেদ হোসেন, ফরিদা পারভীন, সোহরাব হোসেন, আনোয়ার উদ্দিন ও নারগিস পারভীন ছাড়াও অসংখ্য অভিনেতা-অভিনেত্রী, গায়ক-গায়িকা, কবি-সাহিত্যিক এই পরিমল থিয়েটার থেকে উঠে এসেছেন। এখানে অভিনয় করেছেন ছবি বিশ্বাসসহ কলকাতার বিখ্যাত সব অভিনয়শিল্পী। জানা যায়, ২০১৪ সালের ১৭ জুলাই পরিমল থিয়েটারের অন্য সদস্যদের না জানিয়ে দুটি দলিলের মাধ্যমে থিয়েটারের ভবনসহ ১৯.৩৭ শতক জমির মধ্যে প্রায় ১০ শতক জমি দুজনের নামে রেজিস্ট্রি করে দেন সাধারণ সম্পাদক আবু তাহের, দলিল নম্বর ৬৯৫৩/১৪ ও ৬৯৫৪/১৪। জেলা রেজিস্ট্রি অফিস সূত্রে জানা যায়, প্রথম দলিলে থিয়েটারের উপদেষ্টা ও ভাতিজা শেখ সাজ্জাদ হোসেন সবুজের নামে ৮.৭১ শতক এবং দ্বিতীয় দলিলে স্ত্রী আয়েশা খাতুনের নামে ০.৯৭ শতক জমি রেজিস্ট্রি করে দেন সাধারণ সম্পাদক আবু তাহের। দলিলে শনাক্তকারী ছিলেন থিয়েটারের সভাপতি সানোয়ার উদ্দিন রিন্টু। দলিলের ৬ নম্বর পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, পরিমল থিয়েটারের ২০১৪ সালের ১১ জুলাই বার্ষিক সাধারণ সভায় সর্বসম্মতিক্রমে থিয়েটারের জমি বিক্রির সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। সেই রেজুলেশনের কপিও দলিলের সঙ্গে জমা দেওয়া হয়েছে।

তবে থিয়েটারের সভাপতি সানোয়ার উদ্দিন রিন্টু বলেন, ‘জমি রেজিস্ট্রির সময় আমি গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলাম। হাসপাতালের বেডে শোয়া অবস্থায় সাধারণ সম্পাদক তাহের ও উপদেষ্টা সবুজ দুইটা দলিল নিয়ে গিয়ে আমাকে স্বাক্ষর করতে বলেন। আমি স্বাক্ষর দিতে না চাইলে অনেকটা জোরপূর্বক আমার কাছ থেকে স্বাক্ষর নেওয়া হয়।’ সভাপতি বলেন, ‘পরিমল থিয়েটারের কোনো বার্ষিক সাধারণ সভায় জমি বিক্রির সিদ্ধান্ত হয়নি। দলিল রেজিস্ট্রির সময় যে রেজুলেশন জমা দেওয়া হয়েছে, সেটি জাল রেজুলেশন। আমার স্বাক্ষর জাল করে রেজুলেশন জমা দেওয়া হয়েছে।’ জানা যায়, ২০১২ সালে পরিমল থিয়েটারের নির্বাচিত কমিটির সভাপতি ছিলেন সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আ স ম আখতারুজ্জামান মাসুম ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মতিউর রহমান মতি। রাতের আঁধারে বুকে পিস্তল ঠেকিয়ে নির্বাচিত ওই কমিটিকে হটিয়ে পরিমল থিয়েটার দখলে নেয় শহরের ত্রাস ও জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক শেখ সাজ্জাদ হোসেন সবুজ। তিনি হন থিয়েটারের উপদেষ্টা। তারই আরেক সেনাপতি আবু তাহেরকে সাধারণ সম্পাদক করে রাতারাতি ২১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি ঘোষণা করা হয়। সে সময় প্রাণভয়ে থিয়েটারের তিন শতাধিক সদস্যের কেউ মুখ খুলতে সাহস পাননি। সাবেক যুগ্ম-সম্পাদক খাদেমুল ইসলাম বলেন, সন্ত্রাসীদের থাবায় দেশের ঐতিহ্যবাহী নাট্য সংগঠনটি হারিয়ে গেছে। থিয়েটারটি এখন বহুতল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান।

সাবেক সাধারণ সম্পাদক মতিউর রহমান মতি বলেন, জমি আত্মসাৎ করতে নির্বাচিত কমিটিকে হটিয়ে রাতারাতি দেশের ঐতিহ্যবাহী নাট্য সংগঠনটির দখল নেয় প্রভাবশালীরা। সম্প্রতি জেলার কয়েকজন জমি জালিয়াত গ্রেফতার হলে কিছুটা হলেও মনে জোর পান পরিমল থিয়েটারের সদস্যরা। তারা জালিয়াতির বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেন। এ ঘটনার প্রতিবাদে পথে নেমেছেন স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীরা। তারা মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশের পাশাপাশি জমির মালিকানা ফেরত পেতে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন জানিয়েছেন।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর