শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ২ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১ ডিসেম্বর, ২০২০ ২৩:৪৬

৬ হাজার মামলা তদন্তে ৩০ হাজার ফরেনসিক

তৈরি হচ্ছে অপরাধের সঙ্গে জড়িত ২ লাখ মানুষের ফিঙ্গার প্রিন্টের ডাটাবেজ

মাহবুব মমতাজী

২০১৬ সালের এপ্রিলে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ থানায় জুয়েলারি দোকানে চুরির ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার এক মাস পরে নারায়ণগঞ্জ সদর থানা এলাকায় একই কায়দায় আরেকটি জুয়েলারি দোকানে চুরি হয়। চুরির পর ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট। মামলা তদন্তে সোনারগাঁ থানা পুলিশের কোনো অগ্রগতি না থাকায় দায়িত্ব দেওয়া হয় জেলা গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি)। আসামি গ্রেফতার ও চুরির রহস্য উদঘাটন না করেই মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় ডিবি। আর সদর থানার চুরির মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় সিআইডিকে। গত বছর রাজধানীর কদমতলী থানার একটি মামলায় গ্রেফতার হয় ইউনুছ আলী নামে এক ব্যক্তি। পরে নারায়ণগঞ্জের চুরি হওয়া ঘটনাস্থলের আলামতের ফরেনসিক ও বিভিন্ন কাপড় এবং জিনিসপত্রের ওপর থাকা আঙুলের ছাপ স্ক্যানিং ও কোডিং করে দেখা যায় ইউনুছের আঙুলের ছাপের সঙ্গে মিলে যায়। পরে তাকে নারায়ণগঞ্জ সদর থানার চুরির মামলায় শোন অ্যারেস্ট করে সিআইডি। এরপর নারায়ণগঞ্জ ও রাজধানীর বিভিন্ন থানার একাধিক চুরির মামলায় তার সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করে ইউনুছ। এমন হাজারো মামলার তদন্ত ও পরবর্তীতে বিচারিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে ভূমিকা রাখছে সিআইডির ফরেনসিক ডিএনএ টেস্ট রিপোর্ট। সিআইডি সূত্র জানায়, ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে আদালতের নির্দেশে সিআইডির ডিএনএ প্রোফাইলিং শুরু করে। ‘ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরি অব বাংলাদেশ পুলিশ’ এ প্রথম আলামত গ্রহণ করা হয় ওই বছরের ১৫ জানুয়ারিতে। আগেও ছোট পরিসরে সিআইডিতে ডিএনএ প্রোফাইলিং হতো। ২০১৭ সালের ২৩ জানুয়ারি সিআইডির ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। গত ছয় বছরে এই ল্যাব থেকে খুন, ধর্ষণ, অজ্ঞাত লাশ শনাক্তকরণ, পিতৃত্ব বিরোধ/নিষ্পত্তি, ডাকাতিসহ প্রায় ছয় হাজার মামলার বিপরীতে ১৬ হাজারের বেশি আলামত থেকে ৩০ হাজার ডিএনএ প্রোফাইলিং করেছে         সংস্থাটি। যা সিআইডির এলআইএমএস (Laboratory Information Management System)-এর সার্ভারে সংরক্ষিত আছে। এ ছাড়াও গত আট বছরে ১২ হাজার আলামত বিশ্লেষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সাড়ে চার হাজার মামলায় ফরেনসিক রিপোর্ট দিয়েছে সিআইডি। পাশাপাশি বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত দুই লাখ মানুষের ফিঙ্গার প্রিন্টের ডাটাবেজ করেছে সংস্থাটির ফরেনসিক বিভাগ। অপরাধীদের শনাক্তে এই ডাটাবেজ ব্যবহার করছে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা।

ক্লু-লেস বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর মামলার রহস্য উদঘাটন ও বিভিন্ন আলামত, ডিএনএ ও সাইবার টেস্টের মাধ্যমে মামলা তদন্ত ও বিচারকার্যে ভূমিকা রাখছে বলে জানান ফরেনসিক বিভাগের কর্মকর্তারা। তারা জানান, রাসায়নিক পরীক্ষাগারের মধ্যে রয়েছে সব ধরনের মাদকদ্রব্য, মৃত মানুষ ও পশু-পাখির ভিসেরা, কবর থেকে উত্তোলিত হাড়, চুল, মাটি ও সফট টিস্যু, বিষাক্ত বা চেতনাশক পদার্থের উপস্থিতি, রক্ত মিশ্রিত আলামতে রক্তের উপস্থিতি, অ্যাসিড মিশ্রিত আলামতে রক্তের উপস্থিতি, বিস্ফোরক দ্রব্য, দাহ্য পদার্থ, জাল টাকা তৈরিতে ব্যবহৃত কেমিক্যাল, জিএসআরসহ বিভিন্ন আলামতের রাসায়নিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে মতামত দেওয়া হয়। এ ছাড়াও পরীক্ষাগারটিতে রাসায়নিক, ব্যালেস্টিকস, হস্তলিপি, ফিঙ্গারপ্রিন্ট, অণু বিশ্লেষণ, ফুট প্রিন্ট ও জালনোট শনাক্ত করার ব্যবস্থা রয়েছে।

সিআইডির ফরেনসিক বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএস) রুমানা আক্তার এ প্রতিবেদককে জানান, অপরাধের ধরন প্রতিনিয়তই পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই ট্রেডিশনাল তদন্তের পাশাপাশি মামলার তদন্তে প্রযুক্তিগত তদন্তের গুরুত্ব বাড়ছে। গতানুগতিক তদন্তে অনেক সময় আসল রহস্য উদঘাটন নাও হতে পারে। তবে প্রযুক্তিগত তদন্তে সেটা সম্ভব হচ্ছে। তবে ফরেনসিক কিংবা ডিএনএ পরীক্ষার ক্ষেত্রে যথাযথ আলামত সংগ্রহ খুব জরুরি। আলামত সংগ্রহ সঠিক না হলে ওই রিপোর্টে আসল চিত্র উঠে আসে না।

সিআইডি সূত্রে জানা যায়, সারা দেশে আলামত সংগ্রহের জন্য সিআইডির প্রশিক্ষিত ১৬টি ক্রাইম সিন ইউনিট কাজ করছে। তবে এটা যথেষ্ট নয়। যথাযথ আলামত সংগ্রহের জন্য আরও লোকবল প্রয়োজন। সিআইডির ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাব থেকে বিভিন্ন মামলায় দুদক, র‌্যাব, বাংলাদেশ ব্যাংকও সহযোগিতা পাচ্ছে।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর