শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ২৩:৪৩

রাজপথ যেন মৃত্যুর ফাঁদ

আলী আজম

রাজপথ যেন মৃত্যুর ফাঁদ

যে কোনো মৃত্যু মানুষের জন্য বেদনাদায়ক। সে মৃত্যু যদি হয় দুর্ঘটনায় তাহলে বেদনার চিত্রটা হয় আরও করুণ। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা নতুন নয়। বর্তমানে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের হার বাড়ছে। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনায় ঝরে পড়ছে বহু তাজা প্রাণ। মরণফাঁদ এখন রাজপথ। ঘর থেকে বের হয়ে গন্তব্যস্থলে না পৌঁছে লাশ হয়ে ঘরে ফিরছে মানুষ।

চালকের অসাবধানতা, অদক্ষতা, যান্ত্রিক ত্রুটি, অতিরিক্ত যাত্রী ও মালামাল বহন, গাড়ির প্রতিযোগিতা, রাস্তার দুরবস্থাসহ নানা কারণেই সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে। এসব দুর্ঘটনায় হাসপাতালের বেডে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে পঙ্গুত্ববরণ করা অংসখ্য মানুষ। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে বহু পরিবার। গত ২৭ জানুয়ারি বিকালে রাজধানীর গুলশানের নদ্দা ফুটওভার ব্রিজের কাছে ভিক্টর ক্ল্যাসিক পরিবহনের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী একাত্তর টিভির ভিডিও এডিটর গোপাল সূত্রধরের (৩৫) মৃত্যু হয়। ২৩ জানুয়ারি রাতে মাতুয়াইলে রাস্তা পারাপারের সময় একটি মিনিবাসের চাপায় বাংলাদেশ প্রতিদিনের সার্কুলেশন বিভাগের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ আলমগীর হোসেনের (৪২) মৃত্যু হয়। ২১ জানুয়ারি ভোরে শান্তিনগর মোড়ে ট্রাকের ধাক্কায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার যাত্রী ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক মো. নাসির উদ্দিন দুলালের (৫০) মৃত্যু হয়।

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২০ সালে সারা দেশে ৪ হাজার ৯৯১টি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৬ হাজার ৬৮৬ আর আহত হয়েছেন ৮ হাজার ৬০০ জন। বিআরটিএর তথ্যানুযায়ী ২০২০ সাল পর্যন্ত দেশে রেজিস্টার্ড গাড়ি ৪৫ লাখ ৬৮ হাজার ৮৭৮টি আর ২০১৯ সালে ছিল ৪১ লাখ ৯১ হাজার ২১৮টি। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাকের সর্বশেষ গবেষণায় সড়ক দুর্ঘটনার ৯টি কারণ চিহ্নিত হয়েছে। এগুলো হলো বেপরোয়া গাড়ি চালনা; চালকের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের অভাব; ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন; বিভিন্ন গতির যানের একই সড়কে চলাচল; সড়কের ধারে ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকান্ড; সড়কের নকশায় ত্রুটি; ট্রাফিক আইনের দুর্বল প্রয়োগ; সড়ক নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতনতার অভাব ও পথচারীর ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ; দুর্ঘটনা ঘটিয়ে চালকদের পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি ও অপ্রতুল শাস্তির বিধান প্রভৃতি।

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর চেয়ারম্যান, চলচ্চিত্র অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে ২৮ বছর ধরে কাজ করছে নিসচা। শুরুতে দেশে সাড়ে ১০ কোটি লোক ছিল। তখন বছরে ১৫-১৬ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যেত। এখন তা কমে এসেছে। তবে গাড়ির অনুপাতে দুর্ঘটনার সংখ্যা এখনো অনেক।’ তিনি বলেন, ‘বর্তমানে দেশে প্রায় ১৮ কোটি মানুষ। ৪৪ লাখ রেজিস্টার্ড গাড়িই রয়েছে, যার মধ্যে মোটরসাইকেল ৩১ লাখ। রেজিস্ট্রিবিহীন যানবাহন, ইজিবাইক-নসিমন-করিমন-ভটভটিসহ অসংখ্য গাড়ির হিসাব নেই। বর্তমানে এমন কোনো দিন নেই যেদিন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটছে না। গত জানুয়ারিতে ১৩০টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আরোহীরা মারা গেছেন।’

ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে ৬ শতাংশ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বেড়েছে। ২০১৬ সালে রেজিস্টার্ড মোটরসাইকেল ছিল ৭ লাখ। ২০১২ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ৮ হাজার লোক মারা যায়। ২০১৩ সালে মারা যায় ৭ হাজার, ২০২০ সালে ৫ হাজার। ক্রমেই সড়ক দুর্ঘটনা কমছে। কিন্তু এটাও আমাদের কাম্য নয়।’ পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) মো. সোহেল রানা বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনাসহ সার্বিক ট্রাফিক ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রে ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং, এডুকেশন, এনফোর্সমেন্টসহ নানা বিষয় জড়িত। এর মধ্যে কেবল ট্রাফিক এনফোর্সমেন্ট বা আইন বাস্তবায়নের অংশটিতে অন্যান্য সংস্থার পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন করে পুলিশ। রাস্তার ডিজাইনে ত্রুটি, ভাঙাচোরা ও ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা, যানবাহনের তুলনায় অপর্যাপ্ত সড়কপথ, রোড ডিভাইডার ও স্পিডব্রেকার না থাকা, দুর্ঘটনাপ্রবণ যানবাহন, লাইসেন্সধারী ও লাইসেন্সবিহীন বেপ?রোয়া চালক, ড্রাইভার ও পথচারীদের আইন না মানার প্রবণতা ইত্যাদি বিষয় রয়েছে যা সড়ক দুর্ঘটনা ও সড়?কে বিশৃঙ্খলায় ভূমিকা রাখছে। কিন্তু এসব বিষয় কার্যত সব ক্ষে?ত্রে পুলিশিংয়ের সঙ্গে যুক্ত নয়। এমনকি ট্রাফিক সিগন্যালগুলোর নিয়ন্ত্রণও পুলিশের হাতে নয়। তবু এনফোর্সমেন্ট নিশ্চিতের পাশাপাশি মানুষকে নানাভাবে সচেতন ও আইন মানতে উদ্বুদ্ধ করতে পুলিশের নানামুখী দৃশ্যমান কর্মসূচি রয়েছে। হাইওয়েতে স্পিড নিয়ন্ত্রণে স্পিডগান ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যাপক তৎপরতা চালাচ্ছে পুলিশ। দেশব্যাপী পুলিশের তৎপরতায় ইতিমধ্যে সড়ক দুর্ঘটনার হার প্রতি ১০ হাজার গাড়িতে ২০১৯ সালের ৯.৮৯-এর বিপরীতে ২০২০ সালে ৯.১৯-এ নেমে এসেছে।’ বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘মহামারী করোনা সংকটে মহাসড়কে গণপরিবহন বন্ধ ছিল। এ সময় মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা, অটোরিকশা, ইজিবাইকসহ এ ধরনের গাড়ি চলাচল করেছে। গণপরিবহন চালু হলেও ওইসব গাড়ি এখনো মহাসড়কে চলছে। ছোট ছোট রাস্তা থেকে দ্রুতগতিতে এসব গাড়ি মহাসড়কে উঠে পড়ছে। এগুলোই দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।’

তিনি বলেন, ‘দেশে পরিবহনব্যবস্থা উল্টো পিরামিড গতিতে চলছে। পর্যাপ্ত গাড়ির ফলে যানজট, দুর্ঘটনা, জনজট, প্রাণহানি, জ্বালানি খরচ, যাতায়াত ব্যয় বেড়েই চলেছে। ব্যক্তিগত যানবাহনের লাগাম টানতে হবে এখনই। গণপরিবহননির্ভর হতে হবে। সময় সময় দুর্ঘটনা বাড়ে, আবার সময় সময় কমে। বর্তমানে গাড়ির গতি ও ঘন কুয়াশার জন্য দুর্ঘটনা বাড়ছে। মালিক-শ্রমিক, পুলিশ ও বিআরটিএ যৌথভাবে দুর্ঘটনার কারণ চিহ্নিত করে পদক্ষেপ নিতে হবে।’ সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের ৫ লাখ এবং নিহত পরিবারকে ২০ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদানের দাবিও জানান তিনি।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর