শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১ মার্চ, ২০২১ ২৩:৪৬

জাতীয় ভোটার দিবস আজ

ঝুলে আছে দেড় লাখ আবেদন

হারিয়ে যাচ্ছে ফাইল, তিন-চার বছরেও হয় না এনআইডি সংশোধন

গোলাম রাব্বানী

তরুণ ভোটার অর্ঘ্য। পেয়েছেন স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের ভুলের কারণে সেই পরিচয়পত্র দিয়ে তিনি কোনো কাজ করতে পারছেন না। ভোটার হওয়ার সময় ২ নম্বর ফরমে তিনি জন্ম সাল ১৯৯৯ লিখলেও ইসি ভুল করে সেই জন্ম সাল করেছে ১৯৮৯ সাল। সেই হিসাবে তার বয়স বেড়েছে ১০ বছর। ইসির এই ভুলের মাশুল দিতে হচ্ছে এই তরুণকে। তিনি এই পরিচয়পত্র দিয়ে ব্যাংক হিসাব খোলাসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য কাজ করতে পারছেন না। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই ভোটার নিজের সব তথ্য সঠিকভাবে দিলেও ইসির কর্মীরা ভুল করেছেন। তিনি এই ভুল সংশোধনের জন্য কর্মকর্তাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। ২০১৫ সালের ২৮ অক্টোবর জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনের জন্য সাভার নির্বাচন অফিসে আবেদন জমা দেন শামসুন্নাহার। তিনি তার স্বামীর নামের সংশোধন করতে দিয়েছিলেন। মূলত তার স্বামীর নাম জালাল উদ্দিন। ইসির কর্মীরা ভুল করে তা হালাল উদ্দিন লিখেছেন। এই ভুল সংশোধনের জন্য কাগজপত্র ও দলিলাদি দিয়ে তিনি আবেদন করেছিলেন। কিন্তু ৫ বছর ৪ মাসেও তিনি সেই সংশোধন করতে পারেননি। এই ভোটার সম্প্রতি খোঁজ খবর নিয়ে জানতে পারেন। আসলে তার আবেদনপত্র হারিয়ে গেছে ইসির অফিস থেকে। যদিও কমিশন থেকেই সেই বিষয় তাকে জানানোও হয়নি। এই ভোটারের প্রশ্ন ইসির ভুলের দ্বায় কার? আরও কত দিন এই সংশোধনীর জন্য তাকে ভোগান্তি পোহাতে হবে? গত বৃহস্পতিবার ইসির ইটিআই ভবনের নিচে কথা হয় ফারুক নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে। তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, তার মেয়ের বয়স ইসি ভুল করে ১০ বছর বাড়িয়ে দিয়েছে। ইসির এই ভুলের জন্য আমরা বিপদে পড়েছি। মেয়েকে বিয়ে দেব। বিয়ের সময় জাতীয় পরিচয়পত্র লাগবে। তাই সংশোধন করতে এসেছি। শুধু জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন নয়। নতুন ভোটার হওয়া, পরিচয়পত্র হারিয়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে প্রতিদিন ইসিতে শত শত লোক আসেন। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা নির্বাচন অফিসেও এসব সমস্যা নিয়ে মানুষ ভিড় করেন। কিন্তু তারা সঠিক কোনো সমাধান পান না। বিশেষ করে জাতীয় পরিচয়পত্রের সংশোধনীর বিষয়ে ভোগান্তি পোহাতে হয় বেশি। তিন-চার বছরেও সংশোধন হয় না। আবার ফাইল হারিয়েও যায় অনেক ভোটারের। এ ছাড়া প্রবাসীরাও ভোটার হওয়ার ক্ষেত্রে নানা হয়রানির শিকার হন।  

গত ২৫ জানুয়ারি জাতীয় পরিচয়পত্র অনুবিভাগের এক সভায় জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনীর বিষয়ে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির চিত্র প্রকাশ পেয়েছে। সভায় জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনের বর্তমান অবস্থা এবং জানুয়ারি-২০২১ পর্যন্ত ইসির ১০ অঞ্চলের নিষ্পন্ন-অনিষ্পন্ন কাজের প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। সভার কার্যপত্র দেখা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত মোট ১ লাখ ৬৭ হাজার ৭৬৪টি সংশোধনী আবেদন ইসির কাছে ঝুলে আছে। এ ছাড়া মোট ৩ লাখ ৩৯ হাজার ৬৬৯টি আবেদন নিষ্পন্ন হয়েছে। ইসির হিসাবে জানুয়ারি মাস পর্যন্ত আসা মোট আবেদনের এক তৃতীয়াংশই এখনো ঝুলে আছে। এ ছাড়া গত বুধবার পর্যন্ত ৬৯ হাজার ৫১৩টি আবেদন ঝুলে ছিল শ্রেণি নির্ধারণের অপেক্ষায়।

ইসির কর্মকর্তারা জানান, জাতীয় পরিচয়পত্রের সংশোধনী আবেদন কোন পর্যায়ের কর্মকর্তা নিষ্পত্তি করবেন, তা ঠিক করতে ‘ক’ ‘খ’ ‘গ’ ও ‘ঘ’ এই চারটি শ্রেণি তৈরি করা হয়েছে। জানা গেছে, গত জানুয়ারি পর্যন্ত ক শ্রেণিতে ৫৩ হাজার ৬৯৬টি, খ শ্রেণিতে ৪৩ হাজার ৭৭৩টি, গ শ্রেণিতে ৬৯ হাজার ৪৯টি এবং ঘ শ্রেণিতে ১ হাজার ২৪৬টি আবেদন অনিষ্পন্ন অবস্থায় আছে। এর মধ্যে গ শ্রেণির আবেদন ঢাকা অঞ্চলে ঝুলে আছে ১০ হাজার ৩৯১টি, ময়মনসিংহে ১০ হাজার ৬৩৩টি, রংপুরে ৬ হাজার ১৯টি, রাজশাহীতে ৬ হাজার ৭১০টি, কুমিল্লায় ৮ হাজার ৪৫৮টি, চট্টগ্রামে ৪ হাজার ৪৪২টি, সিলেটে ২ হাজার ৮৯৬টি, খুলনায় ৫ হাজার ৮০৬টি, ফরিদপুরে ৩ হাজার ৪৪৮টি এবং বরিশালে ৪৫৫টি। গত এপ্রিল থেকে অনলাইনে সংশোধনীর আবেদন করা যায়। তাতে আবেদন করার প্রক্রিয়া সহজ হলেও এখনো হয়রানি কমেনি। অনলাইনে আবেদন করলেও অনেকেই ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, নাগরিকের ভোগান্তি কোনোভাবেই কাম্য নয়। একইসঙ্গে দেখা যায় দেশে অনেকেই সুযোগ নেয়। বিভিন্ন রকমের অনিয়মের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন করতে চায়। যে কারণে আইন-কানুন আমাদের অনেক শক্তভাবে মেনে চলতে হয়। এটাও একটা সমস্যা হয়ে গেছে। এটা কীভাবে সমাধান করা যায় আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। তিনি বলেন, আমরা চেষ্টা করছি যতখানি সম্ভব সমাধান করার জন্য। জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবস্থাপনার জন্য যে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দরকার, যখন আমরা ২০০৭-২০০৮ সালে কাজ শুরু করেছিলাম তখন ছিল না। এখনো সেই কাঠামো পূর্ণাঙ্গ নেই। জাতীয় পরিচয়পত্রের সেবা কাজটি সুচারুভাবে করতে দক্ষ জনবল, অবকাঠামো ও তথ্যপ্রযুক্তিগত উন্নয়ন প্রয়োজন। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধন করার সুযোগ আছে কি না, সেটাও দেখা প্রয়োজন।

জাতীয় ভোটার দিবস আজ : আজ ২ মার্চ জাতীয় ভোটার দিবস। তৃতীয়বারের মতো সারা দেশে দিবসটি পালন করা হবে। এ জন্য নির্বাচন কমিশন সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে। করোনা মহামারীর কারণে এবার সীমিত পরিসরে ভোটার দিবস পালন হবে। এবারের ভোটার দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘বয়স যদি আঠারো হয়- ভোটার হতে দেরি নয়’। জাতীয় ভোটার দিবসে ‘২০২০ সালের ভোটার তালিকা হালনাগাদের’ চূড়ান্ত ভোটার সংখ্যা আজ প্রকাশ করবে কমিশন।

ইসির যুগ্ম সচিব ও পরিচালক (জনসংযোগ) এস এম আসাদুজ্জামান জানান, আজ মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টায় নির্বাচন ভবন চত্বরে বেলুন উড়িয়ে কমিশন ভোটার দিবস উদযাপন কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন করবে। এ ছাড়া সকাল ১০টায় নির্বাচন ভবনের অডিটরিয়ামে ভোটার দিবসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য নিয়ে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। বিশেষ অতিথি থাকবেন চার নির্বাচন কমিশনার। এ ছাড়া বিকাল ৩টায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার সব আঞ্চলিক, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভার্চুয়াল সভায় অংশগ্রহণ করবেন।


আপনার মন্তব্য