শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ৩ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২ মার্চ, ২০২১ ২৩:৪০

খুনিরা থাকত খাটের নিচে

মির্জা মেহেদী তমাল

খুনিরা থাকত খাটের নিচে

ময়মনসিংহের আবুল হোসেনের ছেলে রেজোয়ান হোসেন কাজল। তিনি ইন্দোনেশিয়ায় ছিলেন দীর্ঘদিন। সেখানে থাকাকালীন কাজল মিয়া ওই দেশের নাগরিক স্মৃতি ফাতেমা আক্তারকে প্রায় ২০ বছর আগে ভালোবেসে বিয়ে করেন। স্ত্রীকে নিয়ে দেশে ফিরে আসেন কাজল। দেড় যুগ আগে গাজীপুর শ্রীপুরের জৈনা বাজার কলেজ রোডের আবদার গ্রামে দোতলা বাড়ি নির্মাণ করেন। এ বাড়িতেই তিনি স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে বসবাস করতেন। এরপর কাজল মিয়া চলে যান মালয়েশিয়ায়। সেখানেই চাকরি করেন। দেশে আসা-যাওয়ার মধ্যে ছিলেন। সুখের সংসার তাদের। বেশ ভালো দিন কাটছিল তাদের। কিন্তু ভয়ঙ্কর এক ঘটনা কাজল মিয়ার সব কিছু তছনছ করে দেয়। মালয়েশিয়ায় থাকতেই তিনি খবর পান, তার স্ত্রী আর তিন সন্তান বেঁচে নেই। অজ্ঞাতনামা খুনিরা তার পুরো পরিবারকে নৃশংসভাবে খুন করেছে। এমন ঘটনা শুনে মালয়েশিয়া থেকে ফিরে আসেন কাজল মিয়া। আলোচিত ঘটনাটি গত বছর এপ্রিলের।

চার খুনের পর পুলিশ প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। পুলিশ র‌্যাব গোয়েন্দা পিবিআই পৃথকভাবে ঘটনার অনুসন্ধান চালাতে থাকে। কিন্তু খুনিদের শনাক্ত করতে বেগ পেতে হয় পুলিশের। পিবিআই পারভেজ নামে এক যুবককে পাকড়াও করে। পেশায় রিকশাচালক হলেও মাদকাসক্ত। তাকে জেরা করতেই বেরিয়ে আসে খুনের রহস্য। তার সঙ্গে ছিল আরও ছয়জন। খুনের রাতে ছাদ থেকে দড়ি বেয়ে দোতলার ভেন্টিলেটর দিয়ে ঘরে ঢুকেছিল পারভেজ। পরে ঘরের ভিতর খাটের নিচে লুকিয়ে ছিল সে। তার দেওয়া তথ্যে অভিযান চালানো হয় বিভিন্ন স্থানে। র‌্যাব ইতিমধ্যে পাকড়াও করে এ ঘটনায় জড়িত আরও পাঁচজনকে। বেরিয়ে আসে খুনের আদ্যোপান্ত। তারা এও জানায়, কোনো বাসায় চুরি ডাকাতি করতে চাইলে, আগে থেকেই ওই বাসার ঘরে ঢুকে খাটের নিচে লুকিয়ে থাকে। এটি তাদের একটি কৌশল। গ্রেফতার হওয়া পাঁচজন হলেন গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার আবদার গ্রামের রিকশাচালক মো. কাজিম উদ্দিন (৫০), একই এলাকার অটোরিকশাচালক মো. বশির (২৬), সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার গাবি গ্রামের মো. হানিফ (৩২), একই জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলার কাঁঠালবাড়ী গ্রামের শ্রমিক মো. এলাহি মিয়া (৩৫) ও ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার ফকিরপাড়া (আউয়াল নগর) গ্রামের ভাঙারি বিক্রেতা মো. হেলাল (৩০)।

খুনিদের টার্গেটে কেন ওই চারজন র‌্যাবের এমন প্রশ্নে খুনিরা জানিয়েছে নানা তথ্য। বলেছে, কাজল মালয়েশিয়া থেকে হুন্ডির মাধ্যমে প্রায় ২০ থেকে ২২ লাখ টাকা বাড়িতে পাঠিয়েছেন। এমন সংবাদের ভিত্তিতে কাজলের শ্রীপুরের বাসায় ডাকাতির পরিকল্পনা করে কাজিম ও হানিফ। পরে তারা আসামি বশির, হেলাল, এলাহিসহ অন্য আসামিদের সঙ্গে পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয় কাজিমের ছেলে পারভেজ। তাদের আয়ের মাধ্যমে নেশা ও জুয়ার টাকা সংকুলান হচ্ছিল না বিধায় তারা এ অপরাধে যুক্ত হয়।

ডাকাতির পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৩ এপ্রিল রাত সাড়ে ১২টার দিকে প্রবাসী কাজলের বাড়ির পেছনে তারা সবাই জড়ো হন। পরে পারভেজ ভেন্টিলেটর দিয়ে হানিফ গাছ ও পাইপ বেয়ে ছাদে উঠে সিঁড়ির ঢাকনা খুলে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করে। তারা বাড়ির পেছনের ছোট গেট খুলে দিলে কাজিম, হেলাল, বশির, এলাহিসহ কয়েকজন বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করে। এর পর কাজিম এবং হেলালসহ তিনজন প্রথমে ফাতেমার ঘরে ঢোকে এবং কাজিমের হাতে থাকা ধারালো অস্ত্র দিয়ে ফাতেমাকে মেরে ফেলার ভয় দেখিয়ে বিদেশ থেকে পাঠানো টাকাগুলো দিতে বলে। ফাতেমা এত টাকা নেই বলে জানান। পরে ফাতেমা তাঁর রুমের স্টিলের শোকেসের ওপরে রাখা ৩০ হাজার টাকা তাদের বের করে দেন। পরবর্তীতে তারা ফাতেমার স্বর্ণালঙ্কারগুলো ছিনিয়ে নেয় এবং ধর্ষণ করে। আসামি বশির ও এলাহিসহ আরও একজন ধারালো অস্ত্র দিয়ে ভয় দেখিয়ে বড় মেয়ে নূরাকে ধর্ষণ করে এবং গলার চেইনসহ তার স্বর্ণালঙ্কার ছিনিয়ে নেয়। এ সময় ফাতেমার ছোট মেয়ে হাওয়ারিনকে ধর্ষণ করে আসামি বশিরসহ আরও একজন। আসামি পারভেজও হত্যাকান্ড এবং ধর্ষণে অংশগ্রহণ করে।

পারভেজ ২০১৮ সালে সাত বছরের শিশু নিলীমাকে ধর্ষণের পর গলা টিপে হত্যা মামলার আসামি। ওই মামলায় নয় মাস জেল খাটার পর সে জামিনে মুক্তি পায়। মাস দেড়েক আগে ওই বাড়িতে চুরি করতে গিয়ে খাটের নিচে লুকিয়েছিল পারভেজ। এ সময় গৃহকর্ত্রীর হাতে ধরা পড়ে সে।

ডাকাতি ও ধর্ষণের এ ঘটনায় জড়িতদের চিনে ফেলে ফাতেমা ও তাঁর মেয়েরা। তাই ফাতেমা ও তাঁর তিন সন্তানকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে ও গলা কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করে। তবে সর্বশেষে প্রতিবন্ধী শিশু ফাদিলকে হত্যা করা নিয়ে আসামিদের ভিতর দ্বিধা-দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। কিন্তু কোনো প্রকার সাক্ষী না রাখার সিদ্ধান্তে প্রতিবন্ধী শিশু ফাদিলকেও হত্যা করা হয়। লুণ্ঠনকৃত মালামাল ও টাকা কাজিম নিয়ে নেয় এবং সুবিধাজনক সময়ে পরস্পরকে বণ্টন করবে বলে বাকিদের জানায়।


আপনার মন্তব্য