শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৮ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ৭ এপ্রিল, ২০২১ ২৩:০৬

অনলাইনেই চলছে বাজেট প্রণয়ন

আকার হতে পারে ৫ লাখ ৯২ হাজার ৫৬৫ কোটি, অগ্রাধিকার করোনা মোকাবিলা ও স্বাস্থ্য খাতের সুরক্ষায়। অর্থনীতির গতি স্বাভাবিক রাখতে কর্মসংস্থানের জন্য পৃথক কর্মসূচি

মানিক মুনতাসির

অনলাইনেই চলছে বাজেট প্রণয়ন

বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস সংক্রমণের বছর পেরিয়ে গেলেও সংক্রমণ মোটেই কমেনি। দেশে দেশে চলছে মৃত্যুর মিছিল। বাংলাদেশেও প্রতিদিনই সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়ছে সমান তালে। ভাইরাসের বিস্তার রোধে জনজীবনে বিধিনিষেধ আরোপসহ নানা কর্মসূচি নিলেও কাজে আসছে না কোনোটাই। এরই মধ্যে শুরু হয়েছে আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের কাজ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রাক-বাজেট আলোচনাগুলোও চলছে অনলাইন প্ল্যাটফরমে। অর্থ বিভাগ ও পরিকল্পনা কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোও ই-ফাইলিংয়ের মাধ্যমে নিজেদের চাহিদাপত্র জমা দিচ্ছে। অর্থ বিভাগ থেকে ই-ফাইলিংয়ের মাধ্যমে মতামত, সুপারিশসহ অন্য সব ধরনের বাজেটীয় কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বাজেট প্রণয়ন ও দৈনন্দিন সব কাজকর্ম অনলাইনেই সম্পাদন করছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য। অর্থ বিভাগ সূত্র জানায়, এবারের বাজেটে করোনা মোকাবিলা ও স্বাস্থ্য খাতের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। অর্থনীতির গতি স্বাভাবিক রাখতে কর্মসংস্থানের জন্য থাকবে পৃথক কর্মসূচি। কৃষি ও শিল্প খাতের জন্য কর্মসূচি থাকবে উৎপাদন সচল রাখতে। আসছে বাজেটের আকার হতে পারে ৫ লাখ ৯২ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা। করোনা মোকাবিলায় চলতি বাজেটে ১০ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে মার্চ পর্যন্ত খরচ হয়েছে আড়াই হাজার কোটি টাকা। বাকি সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা আগামী বাজেটে এ খাতের জন্য বরাদ্দ রাখা হতে পারে বলে জানা গেছে।

এ ব্যাপারে অর্থনীতিবিদ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমাদের সম্পদ সীমিত। কিন্তু ব্যয়ের তালিকা অনেক লম্বা। করোনা মহামারী অনেকাংশে আমাদের ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এ ছাড়া করোনার আঘাতে অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফলে রাজস্ব আয়ও কাক্সিক্ষত হচ্ছে না। তাই ঘাটতি বাজেট দিতে হয়। আর ঘাটতি অর্থায়নে যেসব রাস্তা রয়েছে সেগুলোও সীমিত।’ তিনি বলেন, ঘাটতি অর্থায়নে দেশীয় ও বিদেশি উৎস ভরসা। বিদেশি উৎস থেকে অর্থায়ন করলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের প্রবাহ ঠিক থাকে। আর দেশীয় মানেই ব্যাংক, সঞ্চয়পত্র। ব্যাংক থেকে অনেক বেশি অর্থ নিলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। এ জন্য সরকারের উচিত হবে বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিনিয়োগবান্ধব কর্মসূচিকে প্রাধান্য দেওয়া।

সূত্র জানায়, করোনা মহামারীর আঘাতে বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে টেনে তুলতে চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য ‘অর্থনীতি পুনরুদ্ধারমূলক’ বাজেট দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী। মনে করা হয়েছিল অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই কেটে যাবে করোনা মহামারী। এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের সেই ধারণা আর সরকারের কোনো প্রক্ষেপণই কাজে আসেনি। বরং দিন দিন করোনার ভয়াবহতা বেড়েই চলছে সারা বিশ্বে। সাধারণত প্রতি বছর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে নতুন বাজেট প্রণয়নের                  প্রস্তুতি শুরু করে সরকার। এর অংশ হিসেবে অর্থ বিভাগ, এনবিআর, পরিকল্পনা কমিশন মিলে ত্রিপক্ষীয় সভা করে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর চাহিদাপত্রের পরিপ্রেক্ষিতে বাজেট বরাদ্দের বিষয়ে খসড়া প্রণয়ন করে। কিন্তু করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে দেশের অর্থনীতিকে চাঙা রাখতে এ বছর তা ডিসেম্বর থেকেই শুরু করেছে অর্থ বিভাগ। সে আলোকে বিভিন্ন দফতর, বিভাগ ও মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয়ও করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, বাজেট প্রণয়ন প্রস্তুতির খসড়া অনুযায়ী আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটের আকার হতে পারে ৫ লাখ ৯২ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা। বিশাল এই ব্যয়ের বাজেটের খসড়া রূপরেখায় মোট আয়ের পরিকল্পনা হচ্ছে ৩ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা, যা হবে জিডিপির ১০ দশমিক ৮ শতাংশ। যদিও অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে সেটি হওয়ার কথা ৪ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। করোনার কারণে রাজস্ব আয় অবশ্য কমিয়ে ধরছে এনবিআর। একইভাবে আসছে বাজেটে মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির টার্গেটও কমিয়ে ৭ দশমিক ৭ ধরা হচ্ছে। বিশাল আকারের এ বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ ছাড়িয়ে যাবে ২ লাখ কোটি টাকা।

এদিকে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি মোকাবিলায় অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত ১ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজগুলো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এবারের বাজেটেও থাকবে এ ধরনের বাড়তি কর্মসূচি। এ ছাড়া ইতিমধ্যে করোনা মহামারীর প্রভাব মোকাবিলায় দেশের কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে গতির সঞ্চার, গ্রামীণ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন এবং অতিদরিদ্র বয়স্ক ও বিধবাদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী নতুন দুটি প্রণোদনা কর্মসূচি অনুমোদন করেছেন। যদিও ওই দুটি প্যাকেজের প্রায় অর্ধেক অর্থই এখানো বিতরণ করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। সূত্র জানায়, সরকার মনে করে গত বছর শুরু হওয়া করোনা মহামারীতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়া অর্থনীতি এখনো শতভাগ স্বাভাবিক হয়নি। এর ফলে আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমিয়ে ৭ দশমিক ৭ শতাংশ ধরা হচ্ছে। চলতি বছরের টার্গেট রয়েছে ৮ দশমিক ২ শতাংশ। অবশ্য সরকার মনে করছে, চলতি অর্থবছর শেষে ৮ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধিই অর্জিত হবে। যদিও এর সঙ্গে একমত হয়নি বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ কোনো উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাই। করোনাভাইরাসের অচলাবস্থার কারণে গত অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ৫ দশমিক ২ শতাংশ। অবশ্য ডিসেম্বর ২০২০ সময়ে বিশ্বের প্রায় সব দেশই জিডিপিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশই সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি পেয়েছে করোনা মহামারী সত্ত্বেও।

এদিকে অর্থ বিভাগের খসড়া হিসাব অনুযায়ী, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের শুরুতে করোনার প্রথম ধাক্কা সামলে গতি ফিরে পেয়েছিল অর্থনীতি। কয়েক মাস ধরে আমদানি-রপ্তানি বেড়েছে, স্থানীয় উৎপাদন ও সরবরাহেও ফিরেছে গতি। ফলে রাজস্ব আদায়ও বেড়েছে। রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৪৩ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি থাকলেও বেড়েছে আহরণ ও প্রবৃদ্ধি। চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারিতে গত অর্থবছরের ফেব্রুয়ারির তুলনায় প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আহরণ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ১৮ শতাংশ। আর অর্থবছরের আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) গত অর্থবছরের তুলনায় সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি আহরণ হয়েছে। প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ১৭ শতাংশ। এনবিআরের হিসাবমতে, জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে ১ লাখ ৯৬ হাজার ১৪৭ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব এসেছে ১ লাখ ৫১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। সামগ্রিক লক্ষ্যমাত্রা থেকে রাজস্ব আহরণের ঘাটতি ৪৪ হাজার ৬৭৫ কোটি টাকা। সূত্র জানায়, আগামী বাজেটে যেসব খাত থেকে রাজস্ব আদায় করার পরিকল্পনা হচ্ছে, তাতে নতুন কোনো খাত নেই। আবার নতুন করে বিপুলসংখ্যক মানুষকে করের আওতায় আনতেও এক ধরনের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে করোনাভাইরাস মহামারী। কেননা করোনাভাইরাসের অচলাবস্থার কারণে দেশের প্রায় সব শ্রেণির মানুষের আয় কমে গেছে। ফলে চলতি অর্থবছরের মধ্যে বা আগামী কয়েক বছরে নতুন করে যাদের করের আওতায় আনার পরিকল্পনা হয়েছিল, সে বিষয়টিও পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর