শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৬ মে, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ৫ মে, ২০২১ ২৩:২৩

বেদের বেশে ইয়াবা পাচার

নিজস্ব প্রতিবেদক

বেদের বেশে ইয়াবা পাচার
Google News

ওরা বেদের বেশে ইয়াবা পাচার করত। পূর্বপুরুষ বেদে সম্প্রদায়ের হলেও তারা বেদে পরিচয় ব্যবহার করত ইয়াবা পাচারের নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে। সাপের বদলে তাদের কাছে থাকত মরণনেশা ইয়াবা। তবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজরদারি এড়াতে সঙ্গে রাখত ইমিটেশনের অলঙ্কার, চুড়ি-ফিতা। সচরাচর সড়ক এড়িয়ে ভিন্ন পথে গ্রামের ভিতর দিয়ে চলাচল করত তারা। কখনো হেঁটে, কখনো সিএনজিচালিত অটোরিকশা কিংবা নৌপথে ভেঙে ভেঙে কক্সবাজার থেকে ইয়াবার চালান পৌঁছে দিত ঢাকায়। তবে শেষরক্ষা হয়নি। র‌্যাবের হাতে পাকড়াও হয়েছেন এ চক্রের পাঁচ সদস্য। মঙ্গলবার রাত সোয়া ১১টার দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বসিলা থেকে তাদের আটক করে র‌্যাব-২-এর মেজর ও সহকারী পুলিশ সুপার মো. আবদুল্লাহ আল মামুনের নেতৃত্বে একটি দল। অভিযান চালিয়ে অভিনব পন্থায় ইয়াবা পাচারকারী এ চক্রের পাঁচ সদস্যকে আটক করেন তারা। আটক ব্যক্তিরা হলেন মো. তারিকুল ইসলাম (২৩), মো. সিনবাদ  (২৩), মো. মিম মিয়া (২২), মো. ইমন (১৯) ও মো. মনির (২৮)। এ সময় তাদের সঙ্গে থাকা টিনের চুলার ভিতর অভিনব কায়দায় লুকিয়ে রাখা ৭৭ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। গতকাল বিকালে রাজধানীর কারওয়ানবাজারে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র‌্যাব-২-এর অধিনায়ক (সিও) লে. কর্নেল ইমরান উল্লাহ সরকার। তিনি বলেন, গোয়েন্দাতথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, একদল কারবারি মাদকের একটি বড় চালান নিয়ে বুড়িগঙ্গা নদী দিয়ে মোহাম্মদপুরের বসিলা ব্রিজ এলাকায় হস্তান্তরের উদ্দেশ্যে আসছে। ওই তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। এ সময় ছদ্মবেশ ধারণের সরঞ্জামাদি, রান্নার হাঁড়ি-পাতিল, বালতি, বহনযোগ্য ডিসপ্লে র‌্যাক এবং নানা ধরনের ইমিটেশনের অলঙ্কার জব্দ করা হয়। আটক ব্যক্তিরা কক্সবাজারের হয়ে বাংলাদেশে আসা ইয়াবা রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করে আসছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে অভিনব কায়দা হিসেবে বেদের ছদ্মবেশ ধারণ করে মাদক বহন করে নিয়ে আসতেন। মাদক পরিবহনের জন্য টিনের তৈরি সহজে বহনযোগ্য রান্না করার চুলার মধ্যে বিশেষ কায়দায় ইয়াবা লুকিয়ে তা আবার ঝালাই করে জোড়া লাগিয়ে দিতেন। তারা মাদকের চালান কক্সবাজার থেকে ঢাকায় নিয়ে আসার ক্ষেত্রে কখনই মহাসড়ক ব্যবহার করতেন না। কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত আসার ক্ষেত্রে তারা মহাসড়ক ব্যবহার না করে বিকল্প হিসেবে গ্রামের ভিতরের রাস্তা দিয়ে বিভিন্ন ইজিবাইক, সিএনজি, টেম্পুতে পথ পাড়ি দিতেন। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা আসার ক্ষেত্রে তারা চট্টগ্রাম সিটি গেটসহ বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চেকপোস্ট এড়াতে প্রথম ধাপে চট্টগ্রামের আনোয়ারা থেকে হাটহাজারী-মানিকছড়ি-গুইমারা-রামগড় হয়ে ফেনী আসতেন। সেখান থেকে তারা নোয়াখালীর চৌমুহনী-সোনাইমুড়ী এবং চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ হয়ে মতলব লঞ্চঘাট পর্যন্ত আসতেন। দ্বিতীয় ধাপে তারা সেখান থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় মুন্সীগঞ্জ হয়ে বুড়িগঙ্গা নদী দিয়ে ঢাকার প্রবেশ করতেন। এতে তাদের চার-পাঁচ দিন বা এক সপ্তাহ পর্যন্ত লেগে যেত। এ দীর্ঘ সময় তারা বেদের মতোই যাপন করতেন। সাধারণ মানুষের সন্দেহ দূর করতে পথের মধ্যে বিভিন্ন মনিহারি দ্রব্য যেমন চুড়ি, কড়ি, চুল বাঁধার ফিতা, শিশুদের কোমরে বাঁধার ঘণ্টি, চেইন, সেইফটি পিন, বাতের ব্যথার রাবার রিং ইত্যাদি বিক্রি করতেন। মাদক পরিবহনের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ ধরনের কৌশলের মুখোমুখি এর আগে কখনো হয়নি। তারা যে রুটটি ব্যবহার করছেন তাও একেবারে নতুন বলা চলে। র‌্যাব জানায়, আটকদের পূর্বপুরুষরা বেদেই ছিলেন। তবে বাপ-দাদার আমলে তারা বেদেজীবন থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরেন। ইয়াবা ব্যবসায়ীদের খপ্পড়ে পড়ে লাভের আশায় ফের ভাসমান বেদের ছদ্মবেশ নিয়ে ইয়াবার কারবার শুরু করেন এ পাঁচ যুবক। এক প্রশ্নে তিনি বলেন, তারা নিরবচ্ছিন্নভাবে নৌপথ বা সড়কপথ কোনোটাই ব্যবহার করেননি। সুযোগ বুঝে যেটা নিরাপদ মনে হয়েছে ব্যবহার করেছেন। এজন্য এ চক্রে রয়েছেন একজন গাইড বা লাইনম্যান। মূলত নিরাপত্তার বিষয়টি তিনি ডিল করতেন। তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সম্পর্কে তথ্য দিয়ে ইয়াবা বহনকারীদের সহায়তা করতেন। নতুন এ পন্থার ফলে প্রথাগত পথের বাইরেও র‌্যাবের অভিযান ও নজরদারি অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।

দারুসসালামে ১৬ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার : মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে র‌্যাব-৪-এর একটি দল রাজধানীর দারুসসালামে অভিযান চালিয়ে একটি লবণবাহী কাভার্ড ভ্যান থেকে ১৬ হাজার ১০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করেছে। এ সময় মো. ইব্রাহিম (২৭) নামে এক মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করা হয়। তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে র‌্যাব-৪-এর অপস্ অফিসার সহকারী পুলিশ সুপার জিয়াউর রহমান চৌধুরী বলেন, এ চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে লোকচক্ষুর আড়ালে দেশের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে কাভার্ড ভ্যানের মাধ্যমে লবণ পরিবহনের আড়ালে বিশেষ কায়দায় ইয়াবা নিয়ে আসত। পরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের কাছে তা বিক্রি করত।

এই বিভাগের আরও খবর