প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৮ মে, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৭ মে, ২০২১ ২৩:০৬

সুইসাইডাল নোট ছিল বিছানায়

মির্জা মেহেদী তমাল

সুইসাইডাল নোট ছিল বিছানায়
Google News

যে মেয়েটি স্কুলে না গিয়ে থাকতে পারত না, সেই মেয়েটি এখন আর স্কুলেই যেতে চায় না। সব সময় ভালো থাকলেও স্কুলে যাওয়ার সময় আসলেই কেমন অসুস্থ হয়ে পড়ে। প্রায় প্রতিদিনই তার এমন হচ্ছে। মেয়েটির মায়ের চোখে বিষয়টি ধরা পড়ে। মেয়েকে প্রশ্ন করে মা, কী রে, স্কুলের সময় হলেই তুই কেন অসুস্থ হয়ে পড়িস! মেয়ে প্রথমে কিছু বলে না। পরে বলে, তার ভালো লাগে না স্কুলে যেতে। স্কুলের রিমি ম্যাডাম, আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন। এ জন্য স্কুলে যেতে ইচ্ছা হয় না। মেয়ের এমন কথা শুনে রেগে যান মা। বকাঝকা করেন। মেয়ে বোঝানোর চেষ্টা করে। বোঝেন না মা। মেয়েটির নাম সুমাইয়া আক্তার মালিহা। বয়স ১৪। দশম শ্রেণির ছাত্রী। এক রাতে এই মেয়েটির লাশ উদ্ধার হয় সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায়। তার ঘরের বিছানা থেকে উদ্ধার করা হয় একটি ‘সুইসাইড নোট’। নোটে মালিহার হাতের লেখায় লেখা আছে, ‘আমার সুইসাইড করার কারণ একমাত্র রিমি ম্যাডাম। সে অযথা পরীক্ষায় আমার খাতা নিয়েছে। আর পরীক্ষায় কম নম্বর দিয়েছে। তোমরা যদি পার তাহলে সেই ম্যাডামকে মানসিক চিকিৎসা দাও, মেন্টাল হসপিটালে পাঠাও। ম্যাডাম আমারে অভিশাপ দিয়েছে, তাই আমার ভালো রেজাল্ট খারাপ হয়েছে।’ রুল করা কাগজে দশম শ্রেণির ছাত্রী মালিহা আত্মহত্যার আগে লিখে গেছে তার কষ্টের কথা। লিখেছে সে কেন মৃত্যুর পথ বেছে নিল। সন্তানকে হারিয়ে মালিহার পরিবার পাগলপ্রায়। মা বুক চাপড়িয়ে কাঁদছিলেন আর বলছিলেন কেন মেয়ের কথা আমি শুনলাম না! মা উপলব্ধি করতে পেরেছেন, তার সন্তানের কথাগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু এই উপলব্ধি করাটা হয়েছে অনেক দেরিতে। রাজধানীর শাহজাহানপুর থানা পুলিশ এই সুইসাইড নোট এবং প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে শিক্ষক রিমি আক্তারকে গ্রেফতার করে। মালিহার চাচাতো ভাই আলমগীর মিয়া জানান, ঘটনার ১০/১২ দিন আগে তার পরীক্ষা শেষ হয়। মালিহার কাছ থেকেই তারা জানতে পেরেছেন, পরীক্ষার সময় স্কুলের ব্যবসায় শিক্ষার শিক্ষিকা রিমি আক্তার মালিহার পরীক্ষার খাতা কেড়ে নেন এবং নম্বর কম দেন। কিন্তু আমরা চাইনি শিক্ষকের বিরুদ্ধে মালিহা কিছু বলুক। আমরা আসলে শুনতেও চাইনি। বিষয়টি নিয়ে মালিহা মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং পরীক্ষায় তার ফল খারাপ হবে বলে ধারণা করতে থাকে। পরে এক রাতে মালিহার মা মুনমুন বেগম ছোট মেয়ে সামিহাকে নিয়ে পাশের ঘরে ছিলেন। মালিহা তার ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে গলায় ফাঁস দেয়। উত্তরার একটি কলেজের ১০ম শ্রেণির ছাত্রী নাফিসা নেওয়াজ ইথিকা ভবনের ৪র্থ তলা থেকে পড়ে নিহত হয়। স্কুল কর্তৃপক্ষ দাবি করছে সে পা ফসকে পড়ে যায়। থানা পুলিশ বলছে, তারা কোনো অভিযোগ পাননি। অভিযোগ পেলে মামলা নেওয়া হবে। কিন্তু ওই কলেজের শিক্ষার্থীরা দাবি করছে, ইথিকা আত্মহত্যা করেছে। পরীক্ষার নম্বর নিয়ে সে মানসিক চাপে ছিল। জানা গেছে, প্রিটেস্ট পরীক্ষায় গণিতে ইথিকা ১০০ নম্বরের মধ্যে ৩৯ পায়। এক নম্বরের জন্য তিনি ওই বিষয়ে ফেল করেন। কিন্তু ইথিকা নম্বরপত্রে সেটাকে ৬৯ করেন। এটা শিক্ষকের কাছে ধরা পড়ে এবং তাকে টিসি দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। যখন তাকে জোর করে প্রিন্সিপালের কাছে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন সে সিঁড়ি থেকে লাফ দেয়। শিশুদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বাড়িতে শারীরিক শাস্তি নিয়ে ইউএনডিপি একটি জরিপ পরিচালনা করে ২০১৩ সালে। সাক্ষাৎকারভিত্তিক সেই জরিপে দেখা যায়, প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে নয়জন জানিয়েছে যে, তারা তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক শাস্তির শিকার হয়েছে। আর ইউনিসেফের জরিপ বলছে, ২০১০ সাল পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শতকরা ৯১ ভাগ শিশু শারীরিক শাস্তির শিকার হয়েছে। জরিপে বলা হয়, বাংলাদেশের স্কুলগুলোতে বেত বা লাঠির ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে এবং ৮৭ দশমিক ৬ শতাংশ ছাত্র এই বেত বা লাঠির শিকার হয়। ২০১১ সালে হাই কোর্ট শিশুদের শারীরিক শাস্তি দেওয়ার বিষয়টি বেআইনি এবং অসাংবিধানিক ঘোষণা করে। আর হাই কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে একটি পরিপত্রও জারি করে। এই পরিপত্রই আইন। বলা হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কেউ শিশুদের শারীরিক শাস্তি দিলে ১৯৭৯ সালের সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালার পরিপন্থী হবে এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। অভিযোগের জন্য অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ১৯৮৫-এর আওতায় অসদাচরণের অভিযোগে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে। প্রয়োজনে ফৌজদারি আইনেও ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে। কিন্তু মানসিক শাস্তির বিষয়ে কোনো কিছু স্পষ্ট করে বলা হয়নি। ভুক্তভোগী বেশ কয়েকজন অভিভাবক বলেন, ‘স্কুলে শিশুরা শারীরিক শাস্তির পাশাপাশি মানসিক পীড়নের শিকার হচ্ছে। ফলে দুঃখজনক অনেক ঘটনা ঘটছে। অভিভাবকরা প্রতিবাদ করলে তাদের সন্তানরা শাস্তির মুখে পড়ে। অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের নিয়ে রীতিমতো টিসি আতঙ্কে থাকেন। কথায় কথায় সন্তানকে টিসি দিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক বলেন, ‘শিক্ষা হবে আনন্দের মধ্য দিয়ে। শিশুরা পড়াশোনা বা পরীক্ষাকে ভয় পাবে না। এটাই শিক্ষার আধুনিক কৌশল। কিন্তু আমাদের এখানে এর উল্টো ব্যবস্থা চলছে। শিক্ষার্থীদের নানাভাবে শারীরিক ও মানসিক চাপে রাখা হয়। আর এর ফলে অনেক দুঃখজনক ঘটনা ঘটে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে এ রকম অভিযোগও আছে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের কাছে বা কোচিংয়ে না পড়লে তাদের নানাভাবে হয়রানি করা হয়।’ তৌহিদুল হক বলেন, পরীক্ষার রেজাল্ট নিয়ে শিক্ষার্থীরা অনেক মানসিক চাপে থাকে। এটা দূর করতে হবে। উন্নত বিশ্বে এই পরিস্থিতি এড়াতে পরীক্ষার ফল শিক্ষার্থীকে এককভাবে জানানো হয়। যাতে সে তার ক্লাসমেট বা বন্ধুদের কাছে খারাপ ফলের জন্য হেয় বা অপমানিত না হয়।

এই বিভাগের আরও খবর