শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৮ মে, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৭ মে, ২০২১ ২৩:০৬

গাবরাখালী পাহাড় থেকে দেখা যায় মেঘালয়ের মেঘ

রুকনুজ্জামান অঞ্জন, হালুয়াঘাট থেকে

গাবরাখালী পাহাড় থেকে দেখা যায় মেঘালয়ের মেঘ
Google News

চারপাশে ছোট-বড় টিলা দাঁড়িয়ে আছে ধ্যানমগ্ন ঋষির মতো। ধীর পায়ে তার ওপর উঠে উত্তরে তাকালেই চোখে পড়ে মেঘালয় রাজ্যের তুরা পাহাড়। সীমান্তের ওপারে উঁচু ওই নীল পাহাড় থেকে পাখিদের সঙ্গে উড়ে আসে সাদা সাদা মেঘ। কাঁটাতারের বেড়া পেরিয়ে নির্বিঘ্নে ভেসে আসে গারো পাহাড়ে। সবুজ অরণ্য, পাখিদের কলতান ও ছোট ছোট মেঘরাশি- এই তিন মিলে পর্যটকের মনে তৈরি করে এক মোহময় বিভ্রম। গারো পাহাড়ের ধ্যানমগ্ন প্রতিকৃতি সৌন্দর্যপিপাসুদের মন কেড়ে নেয়।

ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাট উপজেলার ভারত সীমান্তঘেঁষা এই দর্শনীয় জায়গাটির নাম গাবরাখালী। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত এই গারো পাহাড়েই ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ও হালুয়াঘাট উপজেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় গড়ে তোলা হচ্ছে গাবরাখালী গারো হিল পর্যটন কেন্দ্র।

সংশ্লিষ্টরা জানান, করোনা মহামারী ঠেকাতে সরকার ঘোষিত লকডাউনের কারণে যখন গ্রামীণ অর্থনীতিতে কিছুটা ধীরগতি দেখা দিয়েছে, তখন ময়মনসিংহের উত্তরের সীমান্তে গারো পাহাড়ে চলছে অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ। একটি পর্যটন কেন্দ্র ঘিরে সেখানে গড়ে উঠছে দোকানপাট, ব্যবসা বাণিজ্য কেন্দ্র। স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে গৃহীত হচ্ছে আয়বর্ধক কর্মকান্ড। ফলে গারো পাহাড়ের সীমান্ত এলাকায় স্থানীয় মানুষের জীবনমানের উন্নতি ঘটছে। স্থানীয়রা জানালেন, এ পর্যটন কেন্দ্রটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে অর্থনৈতিকভাবে এ অঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী উপকৃত হবে, তৈরি হবে কর্মসংস্থানেরও। জানা গেছে, জননিরাপত্তা বিভাগের উপসচিব ও ময়মনসিংহের সাবেক জেলা প্রশাসক মিজানুর রহমান গাবরাখালী পর্যটন কেন্দ্রটি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। বিভাগীয় কমিশনার মো. কামরুল হাসান এনডিসির দিকনির্দেশনায় বর্তমানে পর্যটন কেন্দ্রের উন্নয়ন কর্মকান্ড এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল হক। আর পর্যটন কেন্দ্রটি বাস্তবায়ন কর্মকান্ড সমন্বয় করছেন হালুয়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। হালুয়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এই পর্যটন কেন্দ্রের চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য  দেখে দর্শনার্থীদের চোখ ফেলা দায়। গারো পাহাড়ে গড়ে তোলা এই পিকনিক স্পটটি শুধু পর্যটন কেন্দ্র নয়, এটিকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের জন্য নেওয়া হচ্ছে নানা আয়বর্ধক কর্মকান্ড। এ এলাকায় কিছু মানুষের কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়েছে। তিনি আরও জানান, ঐতিহ্যবাহী গারো পাহাড়ের অপরূপ প্রাকৃতিক  সৌন্দর্য মুগ্ধ করে সব বয়সের মানুষকে। বাইরের এলাকা থেকেও পর্যটকরা আসেন এই প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করার জন্য। পর্যটকদের জন্য রয়েছে নানা সুবিধা। এ কারণে গারো পাহাড়ের পর্যটন কেন্দ্রটি দিন দিন মন কেড়ে নিচ্ছে দর্শনার্থীদের। প্রতিনিয়ত বাড়ছে পর্যটকদের আনা গোনা। করোনা মহামারীর কারণে বিধিনিষেধ সত্ত্বেও ঈদ ও ঈদের পর গত দুই দিনে এই পর্যটন কেন্দ্রে প্রায় ১১ হাজার দর্শনার্থী ঘুরে গেছেন বলে জানান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।  উপজেলা প্রশাসন জানায়, পূর্বে হাজং ও বানাই জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল এ গাবরাখালী গ্রামে। এর উত্তর প্রান্ত সংলগ্ন এলাকায় ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমানা। এর ১২৫ একর এলাকাজুড়ে ছোট-বড় ১৬৭টি টিলা নিয়ে গঠিত পর্যটন কেন্দ্রটির টিলাগুলো প্রায় ৭০ ফুট থেকে ২০০ ফুট উঁচু। এগুলো আবার চিতাখলা টিলা, যশুর টিলা, মিতালি টিলা, বাতাসি টিলা এমন বাহারি নামে পরিচিত। এই টিলার ওপর দাঁড়িয়ে সীমান্তের ওপারে মেঘালয় রাজ্যের মানুষের জীবন ও জীবিকার দৃশ্য দেখা যায়। সন্ধ্যায় ভারতের সীমানার দিকে নীলাভ আলোর বিচ্ছুরণ দেখতে খুবই সুন্দর।

কী আছে এখানে : এই পর্যটন কেন্দ্রকে আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য প্রবেশ মুখেই রয়েছে সুউচ্চ পাহাড় থেকে নেমে আসা স্বচ্ছ জলের মনোরম ঝরনাধারা। পাহাড়ের মাঝে অপেক্ষাকৃত নিচু লেকে রয়েছে প্যাডেল বোট, ঝুলন্ত ব্রিজ। পর্যটকদের বিশ্রামের জন্য রয়েছে রেস্ট হাউস। এই রেস্ট হাউস দুটোর নাম গারো ভাষায় জারামবং (পূর্ণিমা) ও ফ্রিংতাল (শুকতারা)। আরও আছে সুইমিং পুল, ওয়াচ টাওয়ারসহ নানা ধরনের বিনোদন উপকরণ। পর্যটন কেন্দ্রের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে রোপণ করা হয়েছে কাজুবাদাম, আগর (সুগন্ধি), চা, কফি। লেকজুড়েই দেখা মিলবে  দেশীয় হাঁসের কোলাহল। এই লেকেই স্থানীয় এলাকাবাসীর আয় বাড়ানোর জন্য মৎস্য চাষের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাহাড়ের কিনার বেয়ে ভারত থেকে বয়ে আসা ছোট ঝরনা ধারায় রাবার ড্যাম দিয়ে পানি সংরক্ষণ করে  বোরো মৌসুমে সেচ দেওয়া হয়। টিলায় বসবাসরত স্যাটেলারদের জন্য উপজেলা প্রশাসন আশ্রয়ণের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সমবায়ের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করার জন্যও গৃহীত হচ্ছে আয়বর্ধক কর্মকান্ড, পাশাপাশি স্থানীয় বেকার যুবকদের উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কাজের আওতায় আনা হচ্ছে।

এই বিভাগের আরও খবর