শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ৬ জুন, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ৫ জুন, ২০২১ ২৩:১০

ছদ্মবেশী ভ্রাম্যমাণ খুনি

মির্জা মেহেদী তমাল

ছদ্মবেশী ভ্রাম্যমাণ খুনি
Google News

রাজধানীর উত্তর যাত্রাবাড়ীর বিবির বাগিচার একটি বাসা ভাড়া নিতে যান দুই যুবক। রনি ও সিজার নামে ওই দুই তরুণ দুটি বেসরকারি ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী। একজন আইনে স্নাতকোত্তর এবং অপরজন টেক্সটাইলের ছাত্র। তাদের কথাবার্তা শুনে বাড়িওয়ালা তাদের বাসা ভাড়া দিতে রাজি হন। রনি ও সিজার বাসা ঘুরে দেখে ভাড়ার অগ্রিম বাবদ দেড় হাজার টাকা দিয়ে যান। এরপর সন্ধ্যায় তারা মালপত্র ভিতরে ঢোকাতে আসে। একপর্যায়ে রাত সাড়ে ৯টার দিকে তারা বাড়িওয়ালার কাছে এসে অভিযোগ করেন, তাদের নিচতলার বাসায় ফ্যান চলছে না। এ সময় বাড়িওয়ালার মেয়ে কলেজছাত্রী নিগার তাদের সঙ্গে নিচে গিয়ে বাসা দেখতে যেতে চায়। যুবকরা সঙ্গে সঙ্গে তাকে ধাক্কা দিয়ে পেছনে ফেলে অস্ত্রের মুখে বাড়ির সবাইকে জিম্মি করে ফেলে। এ সময় আরও কয়েকজন যুবক ঘরে ঢুকে তাদের সবার হাত-পা বেঁধে, মুখে স্কচটেপ লাগিয়ে একদিকে ফেলে রাখে। এরপর নিগারের বাবা-মায়ের কাছ থেকে প্রথমে ৫ কোটি এবং পরে ১ কোটি টাকা দাবি করে। মা সহুরা খাতুন টাকা দিতে অপারগতা জানিয়ে তাদের হাতে চাবি দিয়ে ঘরে যা আছে তা নিয়ে চলে যেতে বলে। দুর্বৃত্তরা সে চাবি নিয়ে সারা বাড়ি তল্লাশি করে নগদ টাকা, দুটি ল্যাপটপ, গয়না, চারটি মোবাইল সেট লুট করে নিয়ে দরজার বাইরে থেকে বন্ধ করে চলে  যায়। দুর্বৃত্তরা চলে গেলে সহুরা একটা ব্লেড জোগাড় করে নিজের হাতের বাঁধন কেটে অন্যদের বন্ধনমুক্ত করেন। তারপর চিৎকার চেঁচামেচি করলে আশপাশের ভাড়াটিয়ারা তাদের উদ্ধার করেন। এ সময় তাদের সঙ্গে মেয়ে নিগারকে দেখতে না পেয়ে লোকজন খোঁজ করে ঘরের মাস্টার বেড রুমে খাটের ওপর তোষক চাপা অবস্থায় তার নিথর দেহ খুঁজে পায়।

সাবেকুন নাহার নিগার হত্যার ঘটনায় পরে পটুয়াখালীর বাউফল থেকে চারজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তারা হলেন- সাজিদুল ইসলাম সজল, সোহাগ শরীফ, শাহ ইমাম হোসেন রনি ও সাকিব হাসান সিজার। মেধাবী ছাত্রের আড়ালে তারা আসলে ছদ্মবেশী ভ্রাম্যমাণ ডাকাত। হত্যাকান্ডের পর স্বর্ণালঙ্কার লুট করার কথা স্বীকার করে সজল ও সোহাগ আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে হত্যার রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন। নিগারকে হত্যা করে স্বর্ণালঙ্কার ও টাকা লুটের ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী রনি ও সিজার। কিলিং মিশনে আটজন উপস্থিত ছিলেন। পুলিশের জেরায় তারা বলেন, রনি ও সজলের নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ অপহরণকারী চক্র গড়ে ওঠে। ধনাঢ্য ব্যক্তিদের অপহরণের পর টাকা আদায়ের ঘটনায় তারা একাধিক সময় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে ছিল। জামিনে বেরিয়ে আবার তারা যাত্রাবাড়ীতে ভাড়াটিয়া সেজে গৃহকর্তার মেয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রীকে হত্যার পর স্বর্ণালঙ্কার ও টাকা লুট করে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা আরও কয়েকটি অপহরণ ও লুটপাটের ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। রনি ও সিজার মেধাবী, এমনকি তাদের পরিবারের সদস্যদের কথা জানলে অনেকের বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে- এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে তারা জড়াতে পারে। রনি ও সিজারের নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ চক্র রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভাড়াটিয়া সেজে ডাকাতি করে আসছে। মাস তিনেক আগে বরিশালের গৌরনদীতে এক কলেজছাত্রকে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করে একই চক্র। এ ছাড়া বছরখানেক আগে হাজারীবাগে অপহরণের পর রনি ও সিজার পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে কিছুদিন কারাভোগ করে। কারাগার থেকে বেরিয়ে একজন চিকিৎসককে অপহরণ করে একই চক্রের সদস্যরা ২ লাখ টাকা মুক্তিপণ নেয়। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ভাড়াটিয়াদের সম্পর্কে জেনেশুনে ভাড়া দিতে হবে। ব্যাচেলরদের ক্ষেত্রে আরও বেশি খবর নেওয়া জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করছে- এটাই তাদের বড় পরিচয় হতে পারে না।

এই বিভাগের আরও খবর