শনিবার, ২৬ জুন, ২০২১ ০০:০০ টা

ঢাকা ছাড়ার হিড়িক ঘাটে ঘাটে ভিড়

বিভিন্ন পয়েন্টে ব্যাপক যানজট

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকা ছাড়ার হিড়িক ঘাটে ঘাটে ভিড়

দেশজুড়ে লকডাউনের শঙ্কায় রাজধানী ছাড়ছেন হাজার হাজার মানুষ। এর মধ্যেই গতকাল রাতে কঠোর লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। ছুটির দিনে মানুষের ঢল নামে ঢাকা থেকে বের হওয়ার পথগুলোতে। ঘাটে ঘাটে ভিড় লক্ষ্য করা যায়। বাস বন্ধ থাকায় কয়েক ধাপে কয়েক গুণ ভাড়া বেশি দিয়ে গন্তব্যে ছুটছেন সাধারণ মানুষ।

পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া, শিমুলিয়া-বাংলাবাজার ঘাটে জনস্রোত দেখা যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এদিকে ঢাকার চার পাশে সাত জেলায় লকডাউন থাকলেও যানজট ছিল আগের মতোই। শুক্রবারও ঢাকার ভিতরে-বাইরে ব্যাপক যানজট লক্ষ্য করা যায়। গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও বিকল্প সব পরিবহনই চালু ছিল। বেড়েছে দুর্ভোগ আর বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে যাত্রী সাধারণকে।

রাজধানীতে প্রবেশমুখের চেকপোস্টগুলোতে দেখা যায়, প্রতিটি গাড়িকেই পুলিশের তল্লাশি চৌকি পার হতে হচ্ছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কোনো গাড়িকেই ঢাকায় ঢুকতে বা বের হতে দেওয়া হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতেও ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না মানুষের ঢলকে। সকালে ঢাকায় প্রবেশ ও বাহিরের অন্যতম গাবতলী এলাকা, ঢাকা-মাওয়া রোড, ঢাকা-চট্টগ্রাম রোড- সবকিছু উপেক্ষা করেই ছুটছেন নারী-পুরুষ। লকডাউনের কথা শুনেই আগে আগে রাজধানী ছাড়ছেন তারা। এমন পরিস্থিতিতে যানবাহন না পেয়ে অনেকেই আবার কাভার্ডভ্যান, ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন বিকল্প বাহনে অনেক গুণ বেশি ভাড়া গুনে যাচ্ছে গন্তব্যে। মানুষের দুর্ভোগও বেড়েছে। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বৃদ্ধ যাত্রীদের কষ্টের সীমা ছিল না। করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যু আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে থাকায় সারা দেশে সাত দিনের লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। প্রয়োজনে লকডাউনের সময় আরও বাড়ানো হতে পারে বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

মুন্সীগঞ্জ : লকডাউনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে গতকাল শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটের ফেরিতে যাত্রী পারাপার হচ্ছে। শাটডাউন ঘোষণার আশঙ্কায় যাত্রীদের ভিড় বেড়ে গেছে ঘাটে। সড়কে চেকপোস্ট বসিয়েও আটকানো যাচ্ছে না তাদের। সকাল থেকে নৌরুটের ফেরিগুলোতে ঢাকা ও দক্ষিণবঙ্গগামী উভয়মুখী প্রচুর যাত্রীকে পার হতে এবং আসতে দেখা যায়। একসঙ্গে পারাপার হচ্ছে পণ্যবাহী ও জরুরি যানবাহন। বিআইডব্লিউটিসি শিমুলিয়া ঘাটের সহকারী ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) ফয়সাল আহমেদ জানান, শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটে বর্তমানে ১৪টি ফেরি সচল রয়েছে। লকডাউনের নিয়ম অনুযায়ী, শুধু পণ্যবাহী ও জরুরি যান পারাপারের কথা থাকলেও যাত্রীরা ঘাটে আসছেন। মাওয়া ট্রাফিক পুলিশের ইনচার্জ জাকির হোসেন বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে যাত্রীদের ঘাটে আসা রোধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। লকডাউনের নির্দেশনা মানার জন্য সবাইকে আহ্বান জানানো হচ্ছে। কিন্তু যাত্রীরা বিভিন্নভাবে ঘাটে এসে উপস্থিত হচ্ছেন। মূলত শাটডাউন ঘোষণার আশঙ্কায় মানুষের ভিড় বেড়েছে ঘাট এলাকায়। এ ছাড়া বাংলাবাজার ঘাট থেকেও ফেরিতে করে শিমুলিয়া ঘাটে আসছেন অনেক যাত্রী।

এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় এ জেলায় নতুন করে আরও ছয়জনের দেহে করোনা শনাক্ত হয়েছে। জেলা সিভিল সার্জন অফিসের তথ্যমতে, জেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় ৯৫ জনের নমুনার মধ্যে ৫৫ জনের রিপোর্ট পাওয়া গেছে, তার মধ্যে নতুন করে ছয়জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে।

রাজবাড়ী : কঠোর বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুট পাড়ি দিয়ে ঢাকায় যাচ্ছে। আবার ঢাকা থেকেও আসছে হাজার হাজার মানুষ। মহাসড়কে পুলিশি বাধার শঙ্কায় বিকল্প সড়ক ব্যবহার করে ঢাকা যাওয়া-আসা করছে সাধারণ মানুষ। ঘাট এলাকায় প্রশাসনের সার্বক্ষণিক নজরদারি না থাকার কারণে নিরাপদে ঢাকায় যাওয়া-আসা করছে যাত্রীরা। ফেরিতে যাত্রীর সংখ্যা কম থাকলেও সেখানে মানা হচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধি। অনেকের মুখে মাস্ক দেখা যায়নি। গতকাল সকালে দেখা যায় দৌলতদিয়ার ফেরিঘাটগুলো দিয়ে স্বাভাবিকভাবে ফেরিতে করে নৌপথ পাড়ি দিচ্ছেন যাত্রীরা।

মাগুরা থেকে আসা যাত্রী প্রাণেশ বিশ্বাস বলেন, দেশে মহাসড়ক ছাড়াও অনেক রাস্তা রয়েছে। সেই সড়কগুলো ব্যবহার করে দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে এসেছি। মাগুরা থেকে মোটরবাইকে ভিতরের রাস্তা ব্যবহার করে ফেরিঘাটে এসেছি। দৌলতদিয়া ফেরি পার হলে সেখান থেকে গাড়ির ব্যবস্থা করে দিতে চেয়েছে একজন। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসির) উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. ফিরোজ শেখ বলেন, দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে বর্তমানে ১৩টি ফেরি চলাচল করছে। বেশির ভাগ যাত্রী গুরুত্বপূর্ণ কাজে ঢাকায় যাচ্ছে।

গাজীপুর : সরকার ঘোষিত গাজীপুরের লকডাউনের সাত দিনের চতুর্থ দিনে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রা এলাকা দিয়ে কিছু কিছু যাত্রীবাহী গাড়ি চলাচল করতে দেখা গেছে। এসব গাড়িতে গাদাগাদি করে লোকজন যাচ্ছেন নিজ নিজ গন্তব্যে। মানা হচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধি। মহাসড়কে লেগুনা ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল করতে দেখা গেছে। গাজীপুরে যানবাহন ও মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণে মাঠে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুর চৌরাস্তা, চন্দ্রা মোড়সহ বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসিয়ে টহল দিচ্ছে ট্রাফিক পুলিশ। যৌক্তিক কারণ ছাড়া ঢাকা শহরে কোনো গাড়ি ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। যাদের অনুমতি আছে তাদের যেতে দেওয়া হচ্ছে।

দুপুরে গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুর চৌরাস্তা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যাত্রীরা পায়ে হেঁটে পুলিশের চেকপোস্টের স্থল অতিক্রম করে সিএনজি, অটোরিকশা, লেগুনা, মিনি ট্রাক, রিকশা, প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল যে যেভাবে পারছেন গন্তব্যে যাচ্ছেন। এ সময় যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া নিচ্ছেন এসব যানবাহনের চালকরা। মোটরসাইকেলের চালকরা যাত্রীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে কয়েক গুণ বেশি ভাড়া। তবুও যাত্রীরা ঝুঁকি নিয়ে এসব মোটরসাইকেলে বাড়ি ফিরছেন।

মাদারীপুর : লকডাউনের চতুর্থ দিনেও শিমুলিয়া-বাংলাবাজার রুট হয়ে যাত্রীদের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। এদিন সকাল থেকে এ রুটের ফেরিতে শিমুলিয়া থেকে দক্ষিণাঞ্চলমুখী যাত্রীদের চাপ শুরু হয়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীদের ভিড় আরও বৃদ্ধি পায়। তবে বাংলাবাজার হয়ে ঢাকামুখী যাত্রীদের ভিড় রয়েছে সহনীয় পর্যায়ে। এদিনও ঘাট এলাকা বা ফেরিতে স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনো লক্ষণই দেখা যায়নি। অনেককেই দেখা গেছে মাস্কবিহীন। লঞ্চ যথারীতি বন্ধ রয়েছে। দূরপাল্লা বা অভ্যন্তরীণ যাত্রীবাহী যানবাহন বন্ধ থাকলেও ৩ চাক্কা, ২ চাক্কার হালকা যানবাহনে যাত্রীরা গন্তব্যে যাচ্ছেন। বরিশাল, খুলনাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে দূরপাল্লার বাস বন্ধ থাকলেও থ্রি হুইলার, ইজিবাইক, মোটরসাইকেলে কয়েক গুণ ভাড়া গুনে ঘাটে পৌঁছায় যাত্রীরা। পণ্যবাহী ট্রাকের সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য ব্যক্তিগত যানবাহন চলাচলও স্বাভাবিক রয়েছে। ফলে ফেরিতে গাদাগাদি করে পার হচ্ছেন যাত্রীরা। সব ফেরি চলাচল স্বাভাবিক থাকায় যাত্রীরা ফেরিতে ভিড় করছে বেশি।