শুক্রবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ টা

নাটকপাড়া এখন বাণিজ্যিক এলাকা

মোস্তফা মতিহার

নাটকপাড়া এখন বাণিজ্যিক এলাকা

রাজধানীর বেইলি রোডে শুধুই বড় বড় অট্টালিকা ও বিপণি কেন্দ্র -জয়ীতা রায়

নাটক দিয়েই বেইলি রোডের পরিচিতি। নাট্যকর্মীদের প্রাণের সঙ্গে মিশে আছে বেইলি রোডের অস্তিত্ব। শিল্পী-কলাকুশলী আর দর্শকদের পদচারণা ও মুখরতায় স্বাধীনতা-পরবর্তীতে জমজমাট হয়ে ওঠা বেইলি রোড তথা নাটক সরণি তার ঐতিহ্য ও জৌলুশ হারিয়েছে বহু আগেই। দিনে দিনে বাণিজ্যের জাঁতাকলে মার খেয়েছে সংস্কৃতি তথা নাটকের এ আঙিনা। একের পর এক বহুতল আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন গড়ে ওঠায় বেইলি রোড তথা নাটক সরণির শুধু জৌলুশই কমেনি, ঐতিহ্যে ও অস্তিত্বে আঘাত খেয়েছে দারুণভাবে। বিষয়টি নাট্যাঙ্গনের মানুষের জন্য ভীষণ পীড়াদায়ক।

নাট্যকর্মী, লাইটম্যান, সেট ডিজাইনার ও দর্শকদের প্রাণবন্ত উপস্থিতিতে শিল্পের আলো ছুঁয়ে পড়া বেইলি রোডে এখন উড়ছে টাকা, বাড়ছে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়। ফাস্টফুড ও নামিদামি ব্র্যান্ডের শোরুমগুলোয় ক্রেতা-বিক্রেতার ব্যস্ততা। বেইলি রোডের পুব দিকের অংশ শান্তিনগর থেকে শুরু করে গাইড হাউস পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে বহুতল বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন এ এলাকার ইতিহাসে আঘাত হেনেছে কঠিনভাবে। রাস্তার দুই পাশে অভিজাত ব্র্যান্ডের দামি পোশাক আর খাবারের দোকানের পাশে বহুতল ভবন শপিং মল ও আবাসন বেইলি রোডের অস্তিত্বের জন্য বিরাট হুমকি। দামি ব্র্যান্ডের পোশাকের  দোকানগুলো শিল্পের অঙ্গনকে কলুষিত করে চলেছে দিনের পর দিন। আর মুখরোচক খাবারের দোকানগুলো ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে জানান দিচ্ছে একদা এখানে কোনো নাটকপাড়াই ছিল না। শাড়ির দোকান, পোশাকের দোকান, খাবারের দোকানসহ ২ শতাধিক দোকানের ভিড়ে বেইলি রোড এখন পুরোদস্তুর বাণিজ্যিক এলাকা। বেইলি রোড এখন রাজধানীর ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিলকেও হার মানিয়েছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দর্শনীর বিনিময়ে নাটক মঞ্চায়ন দিয়েই শুরু হয় বেইলি রোডের পথচলা। নাটকের ইতিহাসে গর্বিত অংশীদার হিসেবে বেইলি রোড ও নাটক একে অন্যের পরিপূরক। ১৯৭২ সালে নাগরিক নাট্যাঙ্গনের ‘বাকি ইতিহাস’ দিয়ে বেইলি রোডের মহিলা সমিতিতে নাটক মঞ্চায়ন শুরু হয়। সেই থেকে নাটকের ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে বেইলি রোড। মহিলা সমিতিকে কেন্দ্র করে নাটক মঞ্চায়ন ও নাট্যকর্মীদের ব্যস্ততার নিরিখে পরবর্তীতে বাংলাদেশ গার্ল গাইডস অ্যাসোসিয়েশনের গাইড হাউস মিলনায়তনেও শুরু হয় নাটকের মঞ্চায়ন। মহিলা সমিতি ও গাইড হাউসকে কেন্দ্র করে নাট্যকর্মী ও নাট্য দলগুলোর ব্যস্ততাও বাড়তে থাকে। সন্ধ্যার পর নাটকের আড্ডায় জমে উঠত বেইলি রোড। যার কারণে নাট্যকর্মীদের দাবির মুখে পরবর্তীতে বেইলি রোডের নাম পরিবর্তন করে নাটক সরণি রাখা হয়। ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক এলাকায় পরিণত হতে থাকলে নাটকের ইতিহাসের গর্বিত অংশীদার বেইলি রোড দিনে দিনে তার জৌলুশ হারাতে থাকে। বন্ধ হয়ে যায় গাইড হাউস মিলনায়তন। তার পরও চলছিল মহিলা সমিতিতে নাটকের মঞ্চায়ন। সংস্কারের জন্য ২০১১ সালে মহিলা সমিতি ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়। তখন ‘ভাঙা-গড়ার নাট্য উৎসব ২০১১’ নামে একটি উৎসবের আয়োজন করে স্মৃতিবিজড়িত মহিলা সমিতির প্রাণের মঞ্চটিকে বিদায় জানায় গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশান। তখন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান নূর ও অভিনেত্রী-নির্দেশক লাকী ইনাম জানিয়েছিলেন, নাটক ঘিরে বেইলি রোডের ইতিহাস আবর্তিত হয়েছে এবং এখানে নাটকের প্রচার-প্রসার ঘটেছে বলে এ এলাকার প্রতি গভীর ভালোবাসার কারণে বেইলি রোডে তারা নিজেদের বাসস্থান গড়ার জন্য ফ্ল্যাটও কিনেছিলেন। ২০১৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মহিলা সমিতির নবনির্মিত ভবন উদ্বোধনের পরদিন ‘ভাঙা-গড়ার নাট্য উৎসব’ নামে আরেকটি উৎসবের মধ্য দিয়ে নাটক মঞ্চায়নও শুরু হয়। কিন্তু এরই মধ্যে নাটকের মঞ্চায়নে জমে ওঠে শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার মূল মিলনায়তন, পরীক্ষণ থিয়েটার হল ও স্টুডিও থিয়েটার হল। তত দিনে নাটক সরণি তার জৌলুশ হারিয়ে ফেলে। বাণিজ্যের জাঁতাকলে নিষ্পেষিত হয় শিল্পের এ আঙিনা। নাট্যকার ও নির্দেশক মামুনুর রশীদ বলেন, ‘বেইলি রোড আর নাটক একে অন্যের পরিপূরক হলেও বাণিজ্যের জাঁতাকলে আমাদের এ ইতিহাসের অংশ এখন তার ঐতিহ্য, জৌলুশ দুটোই হারিয়েছে। বিষয়টি আমাদের জন্য বেদনার।’ নাট্যকার ও নির্দেশক অনন্ত হীরা বলেন, ‘বেইলি রোডের ইতিহাস নিয়ে সিনেমাও নির্মিত হয়েছে। নাটকের এ গর্বিত ইতিহাসের অংশীদার আমাদের সব বিজ্ঞ নাট্যজন। যত দিন বাংলা নাটক থাকবে তত দিন ইতিহাসের পাতায় বেইলি রোডের নাম সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে।’ বাংলাদেশ থিয়েটারের অধিকর্তা খন্দকার শাহ আলম বলেন, ‘বাণিজ্যের জাঁতাকলে শিল্প মার খাচ্ছে। সব ক্ষেত্রেই শিল্পের দৈন্যদশা। বাণিজ্যের কাছে নাট্যকর্মীরা খুবই অসহায়।’ এদিকে ২০১১ সালে মহিলা সমিতির মঞ্চ ভেঙে ২০১৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি নতুন করে খুলে দেওয়ার পর কালেভদ্রে এখানে নাটক মঞ্চায়ন হয়। আগের মতো মঞ্চায়ন না হওয়ার বিষয়ে বেশ কয়েকজন নাট্যকর্মী মহিলা সমিতির মাত্রাতিরিক্ত হল ভাড়াকে দায়ী করেছেন। নাটক আয়োজনে শিল্পকলা একাডেমির তুলনায় দ্বিগুণের বেশি টাকা গুনতে হয় তাই মহিলা সমিতিতে নাটকের মঞ্চায়ন কমেছে বলে জানান নাট্যাঙ্গনের বেশির ভাগ মানুষ। হল ভাড়া কমানো হলে ও গাইড হাউসের মিলনায়তনটি খুলে দিলে নাট্যকর্মী ও দর্শকদের পদচারণে বেইলি রোড ফের জমে উঠবে এমন আশাবাদ অনেক নাট্যকর্মীর। বাণিজ্যিকতার নিষ্পেষণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নাটকের মঞ্চায়নে বেইলি রোড ও নাটক স্বর্ণযুগে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন নাট্যকর্মীরা।

সর্বশেষ খবর