শনিবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ টা

অস্ত্রধারীদের মিস টার্গেট

মির্জা মেহেদী তমাল

অস্ত্রধারীদের মিস টার্গেট

সন্ধ্যা সোয়া ৭টা। রাজধানীর সড়কগুলোতে সব দিনের মতোই ঘরমুখো মানুষের ব্যস্ততা। কিন্তু বিজয়নগরে ওই সন্ধ্যায় ঘরমুখো মানুষের সেই ব্যস্ততা রূপ নেয় আতঙ্কে। মুহুর্মুহু গুলির শব্দে মানুষ প্রাণ বাঁচাতে দিগি¦দিক ছুটতে থাকে। রাস্তা ফাঁকা হয়ে যায়। কোথাও কেউ নেই। শুধু একটি রিকশা রাস্তার মধ্যে আড়াআড়ি দাঁড়িয়ে। রিকশার দুই যাত্রী সিটের ওপর বসা। কিন্তু দুজনই পেছন দিকে হেলে আছে। তাদের শরীর থেকে ফিনকির মতো রক্ত বেরোচ্ছে। রিকশা গড়িয়ে সেই রক্ত পড়ছে পিচঢালা রাজপথে। হতভাগ্য ওই দুই ব্যক্তি রিকশাতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। অস্ত্রধারীরা প্রকাশ্যে শত শত লোকের সামনে দুই ব্যক্তিকে গুলি করে দ্রুত পালিয়ে যায়। গুলিবিদ্ধ ওই দুজনকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার জন্য তৎক্ষণাৎ কাউকে পাওয়া যায়নি। সেখানেই পড়ে ছিল দীর্ঘক্ষণ। তবে সময় গড়িয়ে যেতেই নিহত ওই দুজনের পরিচয় মিলতে থাকে। আর পরিচয় জানার পরই দেশজুড়ে তোলপাড়। দেশের সীমানা পেরিয়ে এই জোড়া খুনের ঘটনাটি স্থান পায় বিদেশি গণমাধ্যমগুলোতে। ৪০ বছর আগে এক সন্ধ্যায় ফিল্মি কায়দায় সংঘটিত এই হামলায় নিহতদের একজন হলেন বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বিএসএস) অর্থনৈতিক বিষয়ক সিনিয়র রিপোর্টার ফেরদৌস আলম দুলাল। আর অন্যজন হলেন- তৎকালীন সময়ে জনপ্রিয় শ্রমিক নেতা ও শ্রমিক লীগ সভাপতি আবদুর রহমান। পরবর্তীতে পুলিশ ও গোয়েন্দারা জানতে পারে, অস্ত্রধারীদের নিশানায় ছিল শ্রমিক নেতা আবদুর রহমান। তাকে মারতে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করা হলে পাশে বসা উদীয়মান সাংবাদিক দুলাল গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান। মাত্র নয় বছরের সাংবাদিকতা জীবনে তরুণ এই সাংবাদিক বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। দুলালের বড় ভাই শামসুল আলম বেলাল সিনিয়র সাংবাদিক। দুলালের স্বজনরা জানান, ঘটনার বিচার কোনো সরকারই করল না। পরিবারের সদস্য ছাড়া এখন তাদের আর কেউ মনেও করে না।  এ ঘটনাটি ‘রহমান-দুলাল হত্যাকান্ড’ হিসেবেই পরবর্তীতে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। যারা খুন হয়েছেন এবং যারা খুন করেছেন এদের সবাই পরিচিত মুখ। যে কারণে এই হত্যাকান্ড নিয়ে সারা দেশের মানুষেরও আগ্রহ ছিল প্রচুর। এই হত্যাকান্ড নিয়ে দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমে প্রচুর লেখালেখি হয়। কিন্তু নির্মম হলেও সত্য, ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করা এ ঘটনার বিচার হয়নি। ১৯৮১ সালের ৭ মে যখন এই খুনের ঘটনাটি ঘটে, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তখন ছিলেন জার্মানে রাষ্ট্রীয় সফরে। তিনি ১০ মে ঢাকা বিমানবন্দরে নেমেই ঘোষণা দিলেন, এই হত্যাকান্ডে যারা জড়িত তাদের কঠিন বিচার দেওয়া হবে। কিন্তু একই মাসে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে নিহত হন। এরপর কোনো সরকারই বিচার করল না এ ঘটনার। বিচারপতি সাত্তার সরকার আমলে এই খুনের ঘটনায় ঘোড়াশালের কাজী এমরানসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। কিন্তু কাজী এমরান ১৯৮৯ সালের দিকে জেলখানা থেকে ছাড়া পেয়ে যান। এরপর এই মামলা নিয়ে বিচারের আর কোনো কিছু হয়নি। এমরান বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত হন। পরে অসুস্থ হয়ে মারা যান। এ জোড়া খুনের তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের কেউ এখন আর চাকরিতে নেই। কেউ অবসরে, আবার কেউ মারা গেছেন। জীবিতদের একজন এবং নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে সেই ৪০ বছর আগেকার এই আলোচিত জোড়া খুনের বিষয়ে চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য মিলেছে। ১৯৮১ সালের ৭ মে। দুলাল পিআইবিতে একটি কর্মশালায় ছিলেন। সেখান থেকে তিনি বাসস অফিসে ফেরেন। একটি রিপোর্ট জমা দিয়ে তিনি অফিসের নিচে যান। বাসসের নিচে ছিল শ্রমিক লীগের অফিস। দেখা হয় শ্রমিক লীগ নেতা আবদুর রহমানের সঙ্গে। আবদুর রহমান তাকে বলেন, দুলাল চলো, মিজান কাকার (পরে এরশাদ সরকারের প্রধানমন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরী) বাসায় যাই। দুলাল তার কথায় রাজি হন। পল্টনের মোড় থেকে একটি রিকশায় চড়ে তারা রওনা হন। পথেই দেখা হয় একটি ব্যাংকের পিআরও মোহাম্মদ আলীর (বর্তমানে মৃত) সঙ্গে। রিকশা থামিয়ে তারা কথা বলেন। আবারও তাদের রিকশা চলতে থাকে। তাদের রিকশা বিজয়নগর মোড়ের মুক্তি ঔষধালয়ের সামনে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে পেছন থেকে একটি ভেসপা এসে তাদের রিকশার সামনে এসে ব্যারিকেড দেয়। ভেসপায় ছিল তিনজন। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই চালকের পেছনের দুজনের হাতের অস্ত্রগুলো গর্জে ওঠে। একাধারে ফায়ার করতে থাকে তারা। এতে রহমানের শরীর ঝাঁজরা হয়ে যায়। দুলালের মাথা ভেদ করে একটি বুলেট। আরেকটি বুলেট তার পেট ঘেঁষে চলে যায়। দুজনই রিকশায় বসা অবস্থায় পেছন দিকে হেলে পড়েন। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু ঘটে তাদের। এই জোড়া খুনের ঘটনায় কাজী এমরানসহ কয়েকজনকে গ্রেফতারের পর বলা হয়, এরাই রহমান-দুলালের খুনি। তবে টার্গেট ছিল রহমান। দুলাল তাদের টার্গেট ছিল না। ঘটনার শিকার হয়েছিলেন সম্ভাবনাময়ী এই তরুণ সাংবাদিক। মিশুক, সদালাপী বিশেষ ভঙ্গিমায় তার আচার-আচরণে সব বয়সের মানুষকে আকৃষ্ট করতে পারতেন তিনি। সবার কাছেই তিনি ছিলেন জনপ্রিয়। বাবা-মায়ের নয় সন্তানের মধ্যে দুলাল ছিলেন দ্বিতীয়। শিশুর মতো সরল মন, নিষ্পাপ চাহনি ও সাদামাঠা জীবন ছিল তার। ৩১ বছরে পা রাখা এই তরুণের বিয়ের কথা চলছিল। পরের মাসেই তার বিয়ের তারিখ পড়েছিল। কিন্তু তার আগেই অস্ত্রধারীদের বুলেট সব শেষ করে দিয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের প্রতিবেদন তৈরিতে বাংলাদেশ সাংবাদিকতায় অপরিহার্য হয়ে পড়েছিলেন। ঘটনার পর বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ঘোড়াশালের শ্রমিক রাজনীতির উচ্চাশা নিয়ে কাজী এমরান বহু আগে থেকেই আবদুর রহমানকে খুনের চেষ্টা করছিলেন। ৭৭ সালে এমরান সস্ত্রীক ইরান হয়ে জার্মানিতে চলে যান। ৭৯ সালে দেশে ফিরে আসেন তার স্ত্রীর অনিচ্ছাতেই। এমরান তার স্ত্রীকে তখন বলেছিলেন, তার কিছু অসমাপ্ত কাজ রয়েছে। এই অসমাপ্ত কাজ শেষ করতেই তার দেশে ফেরা। রহমান খুনের পর সে রাতেই এমরান তার স্ত্রীকে ফোন করে জানিয়েছিলেন, তার সেই অসমাপ্ত কাজ শেষ হয়েছে। এই এমরান নয়াপল্টনের ভাসানী মসিউর স্মৃতি সংসদ অফিসে প্রতি সন্ধ্যায় আড্ডা দিতেন। সেখান থেকেই লোক মারফত খোঁজ নিতেন রহমানের। ঘটনার পর কেটে গেছে ৪০টি বছর। যাদের মৃত্যুর সংবাদে তোলপাড় হয়েছিল দেশ-বিদেশে, তারাই আজ হারিয়ে গেছেন বিস্মৃতির অতলে। বিচারও হলো না। মনেও রাখেন না কেউ।