বর্তমানে বিশ্বে তৈরি পোশাকের বাজার ১ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলারের। অন্যদিকে হালাল পণ্যের বাজার ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের, যা তৈরি পোশাকের দ্বিগুণের বেশি। সম্ভাবনাময় এ ট্রিলিয়ন ডলার হালাল পণ্যের মার্কেটে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বছরে মাত্র ৮৪৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। হালাল পণ্য পরীক্ষা ও সনদ দেওয়ার কোনো স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান না থাকায় এত দিন সম্ভাবনাময় এই হালাল পণ্যের বাজারের সুফল নিতে পারেনি দেশের শিল্পোদ্যোক্তারা। অবশেষে ট্রিলিয়ন ডলারের হালাল পণ্যের বাজারে ঢুকতে একটি বিধিমালা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন আইন, ২০১৮ অনুযায়ী এ বিধিমালাটি করা হচ্ছে। বিএসটিআই সংশ্লিষ্টরা জানান, ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়াজাত খাদ্যদ্রব্য, প্রসাধনসামগ্রী প্রভৃতিকে ‘হালাল’ পণ্য বা সেবা বলা হয়। মধ্যপ্রাচ্যসহ পশ্চিমা দেশগুলোতে এ ধরনের পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে হালাল সার্টিফিকেশন বা সনদ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে হালাল পণ্যের সার্টিফিকেশন বা সনদের অভাবে এতদিন রপ্তানিতে পিছিয়ে ছিল। এখন এ বিধিমালার মাধ্যমে হালাল সনদ চালু হলে রপ্তানি বাড়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে হালাল পণ্য উৎপাদনকারীদের।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশের দুটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন পণ্যের ক্ষেত্রে এ সনদ দেয়। ইসলামিক ফাউন্ডেশন ২০১৭ সালে একটি হালাল ল্যাব উদ্বোধন করলেও যন্ত্রপাতির অভাবে সেটি সচল হয়নি। যে কারণে এর আগে সনদ দেওয়া দুটি সংস্থাই বাইরের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রতিবেদন যাচাই করে হালাল সনদ দিত। তবে গত ১৪ জুলাই বিএসটিআই হালাল পণ্যের সনদ দিতে নিজস্ব ল্যাব উদ্বোধন করেছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের হালাল পণ্য রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন বিধিমালা, ২০২৫ এর খসড়ায় বলা হয়েছে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড নির্ধারণে ছয়টি ধাপ অনুসরণ করা হবে। ভোক্তার স্বার্থ সংরক্ষণ, স্টেক হোল্ডারদের মতামত গ্রহণের জন্য কমপক্ষে তিন মাস সময়ের মধ্যে এই স্ট্যান্ডার্ড নির্ধারণের সময়সীমা নির্ধারণ করার কথা বলা হয়েছে। তবে জরুরি ক্ষেত্রে তিন মাসের কম সময়েও পণ্যের স্ট্যান্ডার্ড বা মান নির্ধারণ করা যাবে।
‘হালাল সার্টিফিকেশন মার্কস স্কিম’ সম্পর্কে বিধিমালার খসড়ায় একটি পৃথক অনুচ্ছেদ যুক্ত করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোনো পণ্য অথবা প্রক্রিয়া অথবা কোনো প্যাটেন্টের শিরোনাম বা কোনো ট্রেডমার্ক ডিজাইনে কোনো ব্যক্তি হালাল সার্টিফিকেশন মার্ক যুক্ত করতে চাইলে ইনস্টিটিউশন প্রবিধান দ্বারা নির্ধারিত ফি গ্রহণ করে হালাল সার্টিফিকেট প্রদান ও নবায়ন করতে পারবে। ইনস্টিটিউিশন হালাল সার্টিফিকেশন স্কিমের আওতায় হালাল সার্টিফিকেট প্রদান ও নবায়ন করার পর সার্টিফিকেটধারী পণ্যের গায়ে স্ট্যান্ডার্ড মার্কের সঙ্গে এনার্জি এফিসিয়েন্ট স্টার লেবেলিং সার্টিফিকেশন মার্কস যুক্ত করতে হবে। এনার্জি এফিসিয়েন্ট স্টার লেবেলিং সার্টিফিকেশন মার্কস স্কিম ইনস্টিটিউশনের সার্টিফিকেশন মার্কস উইং কর্তৃক পরিচালিত হবে। হালাল পণ্যের ফি সম্পর্কে খসড়ায় বলা হয়েছে, হালাল সার্টিফিকেশন মার্কস ব্যবহার করার জন্য ইনস্টিটিউশন প্রবিধান দ্বারা নির্ধারিত হারে ফি গ্রহণ করবে। একই প্রতিষ্ঠানের একাধিক স্থানে স্থাপিত ইউনিট বা অঙ্গ প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ট্রেড লাইসেন্স অনুযায়ী পণ্য বা দ্রব্যের প্রক্রিয়া বা সার্ভিসে একই নিবন্ধিত ট্রেডমার্ক (ব্র্যান্ড নাম) উল্লেখ করা হলেও হালাল সার্টিফিকেশন মার্ক ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত ফি পরিশোধ করে পৃথক সনদ গ্রহণ ও নবায়ন করতে হবে। হালাল পণ্যের বাজার নিয়ে সম্প্রতি এক কর্মশালায় বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) প্রেসিডেন্ট আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, ‘বাংলাদেশ হালাল পণ্য রপ্তানি করছে বছরে মাত্র ৮৪৩ মিলিয়ন ডলার, যার বেশির ভাগই কৃষিভিত্তিক পণ্য। আমাদের একটা বড় সম্ভাবনা রয়েছে হালাল পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে। আমাদের সেটা কাজে লাগানোর জন্য সবাই মিলে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, এখন আর হালাল পণ্য খাদ্যপণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের নিত্য ব্যবহার্য সব পণ্যই হালাল হতে পারে। যেমন- পোশাক, কলম, চশমা ইত্যাদি। মুসলিম প্রধান দেশগুলো ছাড়াও বিশ্বের অন্যান্য দেশেও হালাল পণ্যের চাহিদা বাড়ছে বলে জানান তিনি।