২৯ জানুয়ারি, ২০২২ ১৪:২১
বেশি আত্মহত্যা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে

যে কারণে ছাত্রীদের চেয়ে দ্বিগুণ ছাত্র আত্মহত্যা করছেন!

অনলাইন ডেস্ক

যে কারণে ছাত্রীদের চেয়ে দ্বিগুণ ছাত্র আত্মহত্যা করছেন!

প্রতীকী ছবি

আত্মহত্যার কারণ অনুসন্ধানে গবেষণা চালিয়েছিল সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশন। বাংলাদেশের প্রায় ৫০টি জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকার আত্মহত্যার সংবাদ বিশ্লেষণ করে ফাউন্ডেশনটি জানিয়েছে, ২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের আত্মহত্যার হার বেড়েছে। তাদের মধ্যে সম্পর্কগত কারণে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন ২৪.৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থী। পারিবারিক সমস্যার কারণে ১৯.৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন। আর মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে ১৫.৮৪ শতাংশ শিক্ষার্থী আত্মহননের পথে যান। পড়াশোনা সংক্রান্ত কারণে আত্মহত্যা করেছেন ১০.৮৯ শতাংশ শিক্ষার্থী। আর্থিক সমস্যায় পড়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন ৪.৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থী। 

আজ শনিবার বেলা ১১টায় ভার্চুয়াল এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেছে সংগঠনটি।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়সহ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ২০২১ সালে ১০১ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন। তাদের মধ্যে ৬৫ জন ছাত্র, অর্থাৎ আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৬৪ দশমিক ৩৬ শতাংশই ছাত্র। ছাত্রীদের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ ছাত্র গত বছর আত্মহত্যা করেছেন।

আত্মহত্যার কারণের মধ্যে আরও উঠে এসেছে যা, তা হলো, মাদকাসক্ত হয়ে নির্বিকারে নিজের জীবন হননের পথ বেছে নিয়েছেন ১.৯৮ শতাংশ শিক্ষার্থী। এ ছাড়া আরও নানাবিধ কারণে আত্মহত্যা করেছেন মোট ২১.৭৮ শতাংশ শিক্ষার্থী।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশি আত্মহত্যা 

গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে, যা ৬১.৩৯ শতাংশ বা ৬২ জন। এ ছাড়া মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এই সংখ্যাটি দাঁড়ায় ১২ তে, যা মোট আত্মহননকারীর ১১.৮৮ শতাংশ। ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ে এ সংখ্যা ৪, যা মোট আত্মহত্যাকারীর ৩.৯৬ শতাংশ। অন্যদিকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার হার ২২.৭৭ শতাংশ, যা সংখ্যায় ২৩ জন।

ফলে সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যা করেছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সবচেয়ে কম আত্মহত্যা করেছেন ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

ঢাবিতে আত্মহত্যা বেশি, দ্বিতীয় জবি

গত বছর সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা, যার সংখ্যা ৯ জন। এ ছাড়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে এ সংখ্যা ৬ জন, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫ এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪ জন। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যা করেছেন ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা, যাদের সংখ্যা ৩ জন। দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে এমন আত্মহননের হার নিঃসন্দেহে ভীতিকর। 

আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি যে বয়সে

২২-২৫ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। সমন্বয়কৃত তথ্যগুলোর মধ্যে ৬০টি আত্মহত্যার ঘটনা এই বয়সসীমার শিক্ষার্থীদের মধ্যে হয়েছে, যা মোট ঘটনার ৫৯.৪১ শতাংশ। অন্যদিকে, ১৮-২১ বছর বয়সী তরুণদের আত্মহত্যার ঘটনা মোট সমন্বয়কৃত ঘটনার ২৬.৭৩ শতাংশ বা ২৭ জন। এ ছাড়া ২৬-২৯ বছর এবং ২৯ বছরের ঊর্ধ্বে এই হার যথাক্রমে ৯.৯০ শতাংশ এবং ৩.৯৬ শতাংশ, যা সংখ্যায় যথাক্রমে ১০টি ও ৪টি। 

ছাত্রদের হার বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ

সাধারণত ছাত্রীদের মাঝে আত্মহত্যার হার বেশি দেখা গেলেও এবারের সমন্বয়কৃত তথ্য থেকে দেখা যায়, গতবছর আত্মহত্যাকারীদের একটা বড় অংশই ছিল ছাত্র। মোট ৬৫ জন ছাত্র আত্মহত্যা করেন, যা মোট শিক্ষার্থীর ৬৪.৩৬ শতাংশ। অন্যদিকে ছাত্রীদের ক্ষেত্রে এ সংখ্যা ছিল ৩৬ জন বা ৩৫.৬৪ শতাংশ। করোনার মধ্যে সামাজিক, আর্থিক ও পারিবারিক চাপ বেড়ে যাওয়া ছাত্রদের আত্মহত্যার পেছনে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে।

মাসভিত্তিক আত্মহত্যা প্রবণতা পর্যালোচনায় দেখা যায়, ডিসেম্বর মাসে এই হার সবচেয়ে বেশি ছিল, যা সমন্বয়কৃত ঘটনার ১৪.৮৫ শতাংশ বা ১৫ জন এবং সবচেয়ে কম ছিল এপ্রিল মাসে, যা ১.৯৮ শতাংশ বা ২ জন। আমাদের দেশে গ্রীষ্মকালের চেয়ে শীতকালে আত্মহত্যার হার বেশি দেখা যায়। 

তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অনার্স পড়ুয়া তৃতীয় এবং চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার তুলনামূলক বেশি, যা ৩৬.৬৩ শতাংশ। ধারণা করা যায়, এ শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার কেন্দ্রিক সামাজিক চাপ বেশি থাকে এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কারণে তাদের মাঝে হতাশার ছাপ বেশি দেখা যায়।

শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আঁচল ফাউন্ডেশনের ১০ প্রস্তাব 

১) প্রতিটি জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে মেন্টাল হেলথ প্রফেশনাল নিয়োগ দেওয়া এবং ইয়ুথ অর্গানাইজেশনকে যথাযথ ট্রেনিংয়ের আওতায় নিয়ে আসার মাধ্যমে যথাযথ মানসিক স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা যেতে পারে।

২) পলিসি ডায়ালগে তরুণদের সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা পুরোপুরি দেশের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে আত্মহত্যার হার কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করছি।

৩) মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা ও সেবাকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় অন্তর্ভুক্ত করা।

৪) মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত কুসংস্কার ও হীনমন্যতা দূরীকরণে প্রাথমিক স্কুল পর্যায় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা।

৫) মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সরবরাহে জরুরি ভিত্তিতে একটি জাতীয় হটলাইন সেবা চালু করা।

৬)  মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করার লক্ষ্যে সরকার একটি বিশেষ অ্যাপস চালু করতে পারে যেন যে কেউ দ্রুত মনোবিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে পারে।

৭) প্রান্তিক পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রাথমিক মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং তরুণদের মেন্টাল হেলথ ফার্স্ট এইড ট্রেনিং সরবরাহ করা।

৮) শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় ব্যক্তি, পরিবার ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে যুগপৎভাবে বিভিন্ন ক্যাম্পেইন আয়োজন করা

৯) সচেতনতা বৃদ্ধিতে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ভূমিকা জোরদার করা।

১০) মানসিক চিকিৎসা সংক্রান্ত পরামর্শ ফি ও ওষুধের দাম কমানো।

বিডি প্রতিদিন/জুনাইদ আহমেদ

 

 

এই বিভাগের আরও খবর

সর্বশেষ খবর