শিরোনাম
প্রকাশ : ২৯ মে, ২০১৯ ১৪:২৯

‘আমি ভীরুর মতন বাঁচতে চাই না’ বলেছিল ফাগুন

কাকন রেজা

‘আমি ভীরুর মতন বাঁচতে চাই না’ বলেছিল ফাগুন
ফাগুন রেজা ও কাকন রেজা

সীমান্ত গান্ধীর নাম অনেকে শুনেছেন। যার পুরো নাম খান আবদুল গাফ্ফার খান। পাকিস্তানের লোক তাকে ভালোবেসে ডাকতো ‘বাচ্চা খান’ বলে। বর্তমান পাকিস্তানের সীমান্ত প্রদেশ ছিল তার আবাসস্থল। ‘পশতুন’ এই মানুষটির জীবন দর্শন ছিল অহিংসাবাদ। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে আমৃত্যু এই মানুষটি কাজ করে গেছেন শুধু মানুষের জন্য। আজকে তার বিস্তারিত বর্ণনা দেবো না, আজকে তাকে টেনে আনা শুধু তার আদর্শকে জানান দেয়ার জন্য। তাকে কিছুটা জানানোর জন্য। তার চিন্তার সাথে আরেকজনের মিল খোঁজার জন্য। 

বুড়ো বয়সে তখন সীমান্ত গান্ধী পাকিস্তানের জেলে। জেলেই তিনি অনশন করছেন। করছেন মানুষের জন্য, মানুষের মঙ্গল কামনায়। জেলে বসেই তিনি একজন সাংবাদিকের সাথে সাক্ষাতকার দিয়েছিলেন। সে সময় সেই সাংবাদিক বলেছিলেন, ‘আপনি এত কষ্ট পাচ্ছেন, আপনার ভয় করে না, আপনিতো এভাবে একদিন মরে যাবেন।’ 

উত্তরে বাচ্চা খান তথা সীমান্ত গান্ধী বলেছিলেন, ‘জবতক জিন্দা হুঁ, মেরা খোদা মেরে সাথ হ্যায়, অউর এন্তেকাল হো গ্যায়া তো ম্যায় খোদা কে সাথ হুঁ।’ কী কথা, এমন কথা এ জামানায় কজন বলতে পারেন। 

সীমান্ত গান্ধীর কথা কেন বললাম এখন বলি। সবাই জানেন, আমার ছেলে সাংবাদিক ইহসান ইবনে রেজা ফাগুন কদিন আগে খুন হয়েছেন। তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমি তাকে না করেছিলাম সাংবাদিকতায় যেতে। সে বলেছিল, ‘তুমি ভয় পাও কেন আব্বুজি, কাওয়ার্ডের মতন বেঁচে থাকার চেয়ে মানুষের মতন মরে যাওয়াও ভালো।’ তার ফেসবুক স্ট্যাটাসেও তাই উৎকীর্ণ ছিল। তাকে হুমকি দেয়া হয়েছিল খবর প্রকাশের জন্য। তার মৃত্যুর পর বিশ্বখ্যাত গণমাধ্যম ‘ডয়চেভেলে’ তাদের এক রিপোর্টে এমনটাই জানিয়েছিল। 

সে সময় আমি বলেছিলাম, বাবা একটু মানিয়ে-গুছিয়ে চল। ফাগুনের উত্তর ছিল, ‘প্রয়োজনে চাকরি ছেড়ে দিব, তাও অন্যায়ের সাথে আপোষ করবো না।’ বলেছিল, ‘যতদিন সাংবাদিকতায় থাকবো, ততদিন চেষ্টা করবো অন্যায়ের বিরুদ্ধে কাজ করে যেতে।’ অবিকল সীমান্ত গান্ধীর ভাষায় বলেছিল, ‘আল্লাহ ভালো কাজ করতে বলেছেন করছি, ভালো কাজে সে সাথে থাকেন। মারলে তো মেরেই ফেলবে, তখন আল্লাহর সাথে থাকবো।’ এ যেন সীমান্ত গান্ধীরই প্রতিরূপ। 

একটা একুশ বছরের বাচ্চা, তার চিন্তা এত সমৃদ্ধ হতে পারে, এমন চিন্তা করাটাই আসলে এক ধরণের ‘ফ্যান্টাসি’ মনে হয়। তার একাউন্টটি মেমোরেবল করেছে ফেসবুক। কেউ যদি তার একাউন্টে একটু চোখ বোলান তাহলে আমার এই কথা খুব একটা ‘ফ্যান্টাসি’ মনে হবে না। এক জায়গায় দেখবেন ফাগুন লিখেছিল, ‘I’d rather die like a man, than live like a coward....।’ না সে সত্যিকার অর্থেই কাওয়ার্ডের মতন বাঁচতে চায়নি। বাঁচেওনি, মরেছে বীরের মতন, কাপুরুষেরা তাকে মেরে ফেলেছে। 

হয়তো অনেকে চিন্তা করবেন, পিতা হিসাবে ছেলেকে বড় দেখাতে চাইছি আমি। না, আমি নিজেই অনেক ছোট হয়ে গেছি তার কাছে। আমি ওর বলা মানুষের মতন বেঁচে নেই। আমিও আপোষ করছি, চোখ-কান বুজে থাকছি। অনেকটা উটের মতন বালিতে মুখ গুজে। ওর মতন বলতে পারছি না, ‘I’d rather die like a man’। কারণ আমাদের মতন মানুষদের সীমান্ত গান্ধী হয়ে উঠা হয় না, যেমন হয়ে উঠতে চেয়েছিল একুশ বছরের টগবগে তরুণ ইহসান ইবনে রেজা ফাগুন। আমার গর্ব হয়, ওর নামের শেষে রেজা অংশটির জন্য। অনেকে বাপের নামের শেষাংশ লাগিয়ে গর্ব করে। আমি গর্ব করি আমার নামের অংশটি আমার ছেলের নামের অংশ হয়ে থাকায়। 

গত একুশ মে সাংবাদিক ইহসান ইবনে রেজা ফাগুনকে ঢাকা থেকে বাড়ির ফেরার পথে জামালপুরের নান্দিনায় নৃশংসভাবে হত্যা করে রেললাইনের পাশে ফেলে রাখা হয়। একুশ তারিখে মারা যায় আমার একুশ বছরের সন্তান। আজ যখন লিখছি, তার মৃত্যুর সময় আটদিন পেড়িয়ে নয় দিনে পড়েছে। কিন্তু খুনিদের কেউ ধরা পড়েনি, জানা যায়নি কারা, কোন কারণে, কাদের জন্য তাকে খুন করলো। এটাই বড় ভাবনার বিষয়। 

ভাবনা শুধু আমার জন্য নয়। দেশটার জন্য। ফাগুন সীমান্ত গান্ধী হতে চেয়েছিল। থাকতে চেয়েছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিরাপোষ। একটি গণমাধ্যমের প্রধান ফাগুনের সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘ওর নাম ফাগুন। ওর মধ্যে সাংবাদিকতার নিরাপোষ আগুন ছিল।’ কারণ উনি জানতেন ফাগুনের সম্পর্কে। জানতেন কতটা সৎ, কতটা নিরাপোষ, আর কতটা নিবেদিত ছিল সে। 

ফাগুনের মৃত্যুতে শুধু আমিই ক্ষতিগ্রস্ত, এমনটা যারা ভাবেন তারা ভুল করছেন, ফাগুনের মৃত্যুতে আমার চেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এই দেশটি। ফাগুনের মৃত্যু দেখে নতুন প্রজন্মের কেউ আর সাংবাদিকতায় আসতে চাইবে না। খবরে দেখলাম, মেধাবীরা দেশ ছেড়ে চলে যেতে চাইছেন। কেন চাইবেন না! কেন তারা এদেশে থেকে আরেক ফাগুন হবেন! এদেশে কেউ আর সীমান্ত গান্ধী হতে চাইবেন না। বলবেন না, ‘কোনো খারাপ কর্ম থেকে নিজেকে দূরে রাখবো। নিজের চরিত্র গঠন করবো। নিজের ভালো অভ্যাস গড়ে তুলবো। অলস জীবন যাপন করবো না। আমার এই কাজের জন্য আমি কোনো পুরস্কার আশা করবো না। ভয়হীনভাবে জীবন যাপন করবো এবং যে কোন আত্মত্যাগের জন্য প্রস্তুত থাকবো---।’ এমনটাই বলেছিলেন খান আবদুল গাফ্ফার খান ওরফে সীমান্ত গান্ধী। বলেছিল, সাংবাদিক ইহসান ইবনে রেজা ফাগুন। 

পুনশ্চ : এ লেখা কোনো বাবার দুঃখগাথা নয়। যাচাই করা সত্যের দ্বিধাহীন বাক্যবিন্যাস এটি। এতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই, থাকতেও নেই।  

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক। 

বিডি প্রতিদিন/এনায়েত করিম


আপনার মন্তব্য