শিরোনাম
প্রকাশ : ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ১১:১০
আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ১১:১১

সম্পর্ক... কখনো কখনো একটা গোলকধাঁধা!

বাণী ইয়াসমিন হাসি

সম্পর্ক... কখনো কখনো একটা গোলকধাঁধা!
বাণী ইয়াসমিন হাসি

একটা ভীষণ চঞ্চল পাখি খাঁচায় বন্দি হওয়ার অনেকদিন পর পালানোর আশা ছেড়ে দিয়ে শেষ পর্যন্ত খাঁচাটাকেই ভালোবেসে ফেলে। পাখির জীবনের সাথে মানুষের জীবনের বেশ মিল। মেনে নেওয়া অথবা মানিয়ে নেওয়া। পরস্পরের ভালোবাসাকে ছোট করে দেখার উপায় নেই। ভালোবাসার টানেই মানুষ কাছে যায়। আবার সেই ভালোবাসাকে টিকিয়ে রাখতেই দূরে থাকতে হয়। বন্ডিং জিনিসটা এমন যেটা কখনো জোর করে ধরে রাখা যায় না। যেটা থাকার সেটা এমনিতেই থাকে। শুধু আক্রোশ, ঘৃণা, ভুল বোঝাবুঝি বা প্রেমহীনতাই দুইটা মানুষের একসাথে না থাকার একমাত্র কারণ নয়। একে অন্যকে প্রাণাধিক ভালোবেসে বা সম্পূর্ণরূপে ধারণ করেও কেউ কেউ সারাজীবন এক পৃথিবী সমান দূরত্ব মাঝখানে রেখে জীবন পার করে দেয়।

প্রতিটা মানুষের জীবনে একটা শক্ত কাঁধ দরকার। শুধু ভর করার জন্য নয়, কাঁদার জন্যও। মনে রাখার মত সমস্ত স্মৃতি, প্রত্যাখ্যান, কলঙ্ক, আঘাত ক্ষতগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়ে যায় কিন্তু অপেক্ষা করার মত এই জন্মে আর কিছু থাকে না। মানুষ বড্ড আজব প্রাণী। একজনের ভালোবাসার জন্য কেঁদে মরে অথচ অন্য আরো হাজারটা মানুষের ভালোবাসা, মায়া, প্রকৃতির কত উপহার এগুলো চোখেই দেখে না! মন খারাপের সময়টাতে যে পাশে থাকে, যে আমার গল্প শোনে, যে আমার মন ভালো করার চেষ্টা করে, তাকে আমি ভয় পাই। তার প্রতি জন্মানো মায়াকে আমি প্রচণ্ড ভয় পাই।

দুইটা মানুষের মধ্যে প্রেম ছাড়াও আরেও অনেক কিছু থাকতে পারে। মায়া থাকে, নির্ভরতা থাকে, ভালোলাগা থাকে, মন কেমন করা থাকে। আরো কত কি থাকে। সব সম্পর্কই প্রেম না; কিছু সম্পর্ক হলো সম্পদ। সম্পর্ককে আটপৌরে বা সরলীকরণ করাটাই মস্ত বড় ভুল। দীর্ঘ নীরবতা ভালো। সেই নীরবতা ভেঙে শব্দেরা যখন ভিড় করে তারচেয়ে শ্রুতিমধুর আর কিছু হয় না। যেন, ‘কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিলো গো। ‘আহা প্রেম! কত রূপে; কত আবেদনেই না বিরাজমান!

দেয়াল তুললেই ঘর, ভেঙ্গে ফেললেই কিন্তু পৃথিবী। প্রতিটা মানুষেরই কোন না কোন ‘না পাওয়া’ থাকে। এই না পাওয়াটা খুউব আপন আর নিজের। অনেকটা তুলে রাখা শাড়ি বা জামা কাপড়ের মতন। মাঝে মাঝে বের করে ভাঁজ ভেঙে নেড়েচেড়ে দেখতে ভালো লাগে। পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন, হৃদয়হীন বা বাস্তববাদী মানুষটাও কখনো কখনো নিজের সেই একান্ত শূণ্যতার হাহাকারে ক্ষণিকের জন্য হলেও থমকে দাঁড়ায়।সীমানার কাছে যেতে যেতে মনে হলো, আর যাবো না। যদি কোথাও ভুল হয়ে থাকে, ফিরে যাই দূরে। আবারও আসি; সব ভুলে, সীমানা অতিক্রম করার দুর্গম সাহস নিয়ে। সবসময় মন ভালো করার জন্য বিরাট কিছু করতে হয়না, চুপচাপ পাশে বসে থেকে শুধু মানুষটাকে বুঝিয়ে দিতে হয়, তুমি একা নও, আমি আছি তোমার পাশে।

‘ধরো যদি হঠাৎ সন্ধ্যে,
তোমার দেখা আমার সঙ্গে।
মুখোমুখি আমরা দুজন,
মাঝখানে অনেক বারণ।’

ভালোবাসতে পারাটা একটা অপার্থিব যোগ্যতা। এ যোগ্যতা সবার থাকে না। উদ্দাম ভালোবাসার প্রবল ঝাপটায় চারপাশটা উথাল পাথাল করে দিয়ে পাওয়া না পাওয়ার হিসেবের খাতাটা শূন্যে ছুড়ে ফেলে হাসতে হাসতে গাঢ় অন্ধকারে মিলিয়ে যাওয়ার নাম ভালোবাসা। অনুচ্চারিত কথাগুলো বলে দিতে হলে
সম্পর্ক সৌন্দর্য হারায়, কিছু কথা বুঝে নিতে হয়। হৃদয়ের কাজ বাক্যানুবাদ নয়, ভাবানুবাদ।

মায়া জিনিসটা বড্ড ভয়ঙ্কর। একটা সময়ে এসে মায়া ত্যাগ করতে হয়, মায়া থেকে মুক্ত হতে হয়। কিন্তু মন তো, মানুষের মন তো। কখনো কখনো হয়তো একটু বেশিই সময় নিয়ে ফেলে। আত্মাটা কি চাইছে সেটা বুঝতেও তো সময় লাগে। একটা শেকড়কে কি এত তাড়াতাড়ি উপড়ে ফেলা যায়? শুধু মনে থাকলে হয় না, কপালেও থাকতে হয়। কেউ যদি তোমার সাথে কথা না বলে থাকতে পারে, তবে তার সাথে কথা বলার জন্য পাগলামি গুলো ছেড়ে দাও। কেউ যদি তোমাকে কষ্ট দিয়ে স্থির থাকতে পারে, তবে তার জন্য অস্থির হওয়াটাকে ভুলে শক্ত হও। কেউ যদি তোমার মূল্য না বোঝে, তবে তার কাছে বারবার নিজের গুরুত্ব চাওয়া থেকে বিরত থাকো। কেউ যদি তোমাকে ছেড়ে ভালো থাকতে পারে তবে তাকে ভালো থাকতে দাও।

কখনো কখনো এমন সময় আসে যখন সব জেনে বুঝেও মুখ বন্ধ করে সহ্য করে যেতে হয়। সমাজ সংসারের ভালোর কথা ভেবে নিজের ইচ্ছে অনিচ্ছেকে পায়ে দলতে হয়। কারো প্রত্যাশা, শত আবদার, অভিমান, অনুযোগ একপাশে সরিয়ে রেখে নিজের কাজটুকু করে যেতে হয়। পাঁজরভাঙ্গা ব্যথা, একবুক হাহাকার কখনো সংগী হয় হয়তো। 

কাউকে রেসপেক্ট করা মানে তাকে ভালোবাসা না। একটা ফ্যাসিনেশন, ক্ষণিকের দূর্বলতা সেটার রেশ কিন্তু খুব বেশিক্ষণ থাকে না। কোনটা ভালোলাগা, কোনটা ভালোবাসা আর কোনটা বা ক্ষণিকের মোহ সেটাও আমরা অনেকেই গুলিয়ে ফেলি। ভালোবাসা অনেক বড় আর পবিত্র ব্যাপার। যখন তখন যার তার জন্য এটা আসে না। আমরা প্রত্যেকেই মনে করি, আমার কাহিনীটি বুঝি সবার চেয়ে আলাদা। কিন্তু দিন শেষে আসলে কেউই আমরা আলাদা নই। পৃথিবীর অন্য সব কিছুর মত সম্পর্ক গুলোও বড্ড বেশি আপেক্ষিক। আজকের ভালো সম্পর্ক কাল বিষিয়ে যেতেই পারে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

সম্পর্ক ... কখনো কখনো একটা গোলকধাঁধা। পৃথিবীতে আকাশ-মাটির মতো সম্পর্কই বেশি। দূর থেকে মনে হয় আকাশ কোথাও না কোথাও ঠিক মাটিতে মিলে গেছে কিন্তু তারা আসলে কোথাও মেলে না। যত কাছাকাছি যাওয়া যায়, দূরত্বটা তত বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জীবনে কিছু কিছু না পাওয়া থাকতে হয়; এটা থাকা ভালো। এক জীবনে সব পাওয়া হয়ে গেলে সবকিছুই বড্ড সহজ আর একঘেয়ে হয়ে যায়। না পাওয়া গুলো থাকে বলেই ছোট ছোট পাওয়া গুলো এত সুন্দর হয়ে ধরা দেয়। পৃথিবীতে বেশির ভাগ মানুষ ভালো না বেসেই একসাথে থাকতে চায়। আবার কেউ কেউ ভালোবাসে অথচ একসাথে থাকতে চায় না। বড় জটিল এই সমীকরণ। কিছু ভাংচুরের কোন শব্দ হয় না। অনেকটা নীরবে নিভৃতেই ঘটে পুরো ব্যাপারটা। যার ভাঙ্গে শুধু সেই ই টের পায়। পৃথিবীর সব সুস্থ স্বাভাবিক সম্পর্ক ভালো থাকুক।

লেখক: সম্পাদক, বিবার্তা২৪ডটনেট।

বিডি-প্রতিদিন/সালাহ উদ্দীন


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর