শিরোনাম
প্রকাশ : ৩ ডিসেম্বর, ২০২০ ১৯:৫৭
আপডেট : ৩ ডিসেম্বর, ২০২০ ২১:৩৯
প্রিন্ট করুন printer

জামানত প্রথা বাতিল চায় দক্ষিণ কোরিয়ায় কর্মরত ইপিএস কর্মীরা

ওমর ফারুক হিমেল, দক্ষিণ কোরিয়া

জামানত প্রথা বাতিল চায় দক্ষিণ কোরিয়ায় কর্মরত ইপিএস কর্মীরা

বেশ কয়েক বছর ধরে দক্ষিণ কোরিয়ার শ্রমবাজারে দেশভিত্তিক কোটা পূরণ করতে পারছে না বাংলাদেশ। ২০১০ সালে নেপাল এবং ইন্দোনেশিয়ার কর্মী বাংলাদেশি ইপিএস কর্মীর তুলনায় কম ছিল। অথচ বর্তমানে নেপালের ৬০ হাজার, ইন্দোনেশিয়ার প্রায় ৪০ হাজার ইপিএস কর্মী রয়েছে। 

অপরদিকে, কোরিয়াতে বাংলাদেশি ইপিএস কর্মীর সংখ্যা ১৩ হাজার থেকে ৯ হাজারে নেমে এসেছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় ইপিএস কর্মী হিসেবে যারা কাজ করছেন তারা এমনিতেই নানা সমস্যায় রয়েছেন। তার উপর এখন ‘জামানত’ ইস্যুটি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রবাসীদের জন্য বড় মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় বাংলাদেশের শ্রম বাজার ধরে রাখতে হলে অবিলম্বে জামানত ইস্যু বিলুপ্ত করতে হবে বলে প্রবাসীরা উল্লেখ করেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশসহ মোট ১৬টি দেশ থেকে কর্মী নেয় দক্ষিণ কোরিয়া। কর্মী নিয়োগ হয় রিক্রুটমেন্ট পয়েন্ট সিস্টেমের ভিত্তিতে। প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয় অনলাইনে। আবেদনকারী কোরিয়ান ভাষা, কর্মদক্ষতা, শারীরিক যোগ্যতা বৃত্তিমূলক কাজের যোগ্যতা, প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ ও চাকরির অভিজ্ঞতা- ইত্যাদি বিষয় মূল্যায়নের ভিত্তিতে পয়েন্ট পান। সেসব পয়েন্টের ভিত্তিতে প্রথম দফা প্রার্থী বাছাই করা হয়। এরপর কোরিয়ার কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে ইন্টারনেট ভিত্তিক দক্ষতা পরীক্ষার মাধ্যমে দ্বিতীয় দফার কর্মী বাছাই হয়। দুই রাউন্ড মিলিয়ে সর্বাধিক নম্বর পাওয়া ব্যক্তিদের চূড়ান্ত করা হয়। কোরিয়ার নিয়োগ দাতাদের এসব তথ্য সরবরাহ করে উপযুক্ত কর্মী খুঁজে পেতে সহায়তা করা হয়। পরীক্ষা, যাচাই বাছাইয়ের পরে কর্মীদের এই তালিকা দেয়া হয় দক্ষিণ কোরিয়ার নিয়োগ দাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে। সেখান থেকে তাদের চাহিদা মতো কর্মী বেছে নেন। বাছাইকৃত কর্মীদের মেয়াদ থাকে দুই বছর। এর মধ্যে কোরিয়ান কোম্পানি তাদের বেছে না নিলে পুনরায় পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে হয়। দক্ষিণ কোরিয়ায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প কারখানার মালিকদের বিভিন্ন এসোসিয়েশন রয়েছে। ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ডাটাবেজ থেকে বিভিন্ন মালিকরা তাদের প্রয়োজন বা চাহিদা মত কর্মী নেন। অনলাইন ডাটাবেজ এমপ্লয়মেন্ট পারমিট সিস্টেম (ইপিএস) স্কিমের আওতায় কোরিয়ান মালিকপক্ষ বাংলাদেশ থেকে বা অন্য যেকোন দেশ থেকে কর্মী নিতে পারে। আর এর পুরো নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে।

বাংলাদেশিদের মধ্যে ১৩ হাজার ইপিএস কর্মী স্কিমের মাধ্যমে আসা। করোনার এই সময় রি -এন্ট্রি কমিটেড বন্ধ রেখেছে দেশটি। তাছাড়া ছুটিতে এবং রিলিজে থাকা অনেকেই দেশে আটকা পড়েছেন। সাম্প্রতিক কালে আটকে পড়াদের ফেরাতে দক্ষিণ কোরিয়া সরকারকে অনুরোধ করেছে বাংলাদেশ। এই বিষয়ে গত ৬ অক্টোবর দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে কথা হয়েছে। আটকে পড়া কর্মীদের ফেরাতে অনুরোধ জানিয়ে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ইমরান আহমেদও কোরিয়ার সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছেন। কিন্তু এখন সবকিছুকে ছাপিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হচ্ছে জামানত ইস্যুর বিষয়টি। জামানত বিষয়ে কোরিয়ায় বসবাসরত ইপিএস কর্মীদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে। অধিকাংশ ইপিএস কর্মীরা জামানতের বিলুপ্তি চান। করোনার কারণে বাংলাদেশি ইপিএস কর্মীর সংখ্যা দিন দিন কমছে। যেখানে আগে ছিল ১৩ হাজার, বর্তমানে তা নেমে এসেছে ৯ হাজারে। দক্ষিণ কোরিয়ার বাংলাদেশী শ্রম বাজারে যেখানে ইপিএস কর্মী বাড়ানো দরকার, সেখানে জামানতের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে বাংলাদেশের বাজার হারানো আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ওভারসিস এমপ্লয়মেন্ট এন্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল) দক্ষিণ কোরিয়াগামী বাংলাদেশী ইপিএস কর্মী থেকে প্রাপ্ত জামানত বিষয়ক নির্দেশিকা ২০২০ জারী করে। তাতে দেখা যায়, দক্ষিণ কোরিয়াগামী বাংলাদেশি ইপিএস সাধারণ কর্মীদের কাছ থেকে ১ লাখ টাকা এবং দক্ষিণ কোরিয়াগামী বাংলাদেশি রি-এন্ট্রি কর্মীদের কাছ থেকে ৩ লাখ টাকা জামানত হিসেবে পে-অর্ডার বোয়েসেল বরাবরে দিতে হবে। প্রশ্ন উঠেছে এ জামানত কেন এবং কি কারণে নেয়া হচ্ছে। যেখানে প্রবাসী কর্মীরা তাদের রক্ত আর ঘাম ঝরিয়ে দেশে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে সেখানে এ ধরনের একটি আত্মঘাতি সিদ্ধান্তে ইপিএস কর্মীদের মাঝে ক্ষোভ ও হতাশার জম্ম দিচ্ছে।

এ বিষয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশে রাষ্ট্রদূত আবিদা ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, দূতাবাস বিভিন্ন সময় সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দের নিয়ে বৈঠক করে, সে অনুযায়ী সবদিক বিবেচনা করে আমরা ইপিএস কর্মীদের কথা মাথায় রেখে বোয়েসেলে প্রস্তাবনা প্রেরণ করি। যৌক্তিক দাবি গুলো ইপিএস কর্মীদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে সুরাহা করা হবে।
এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএসকে সেক্রেটারি সালাউদ্দীন তারেক বলেন, কোম্পানি পরিবর্তনে কোরিয়ান সরকার, এইচআরডি অথবা শ্রম মন্ত্রণালয়ের কোনো বিধিনিষেধ নেই, কিন্তু বোয়েসেলের সিদ্ধান্ত ইপিএস কর্মীদের ভাবিয়ে তুলেছে।

জানতে চাইলে ইপিএস কর্মী আবদুস সামাদ জানান, কোরিয়াতে যারা ইপিএস কর্মী হিসেবে কাজ করছেন তারা কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে টাকা উপার্জন করে দেশে অর্থ পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রেখেছেন। কোরিয়াতে যারা বসবাস করছেন তারা নানান সমস্যার কারণে কোম্পানী পরিবর্তন করেন। কোরিয়ার ইপিএস কর্মীরা আশা করছেন, জামানতের বিষয়টি কোরিয়া বাংলাদেশ দূতাবাস সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সাথে আলাপ করে যত তাড়াতাড়ি সুরাহা করবেন। 
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দক্ষিণ কোরিয়ায় বাংলাদেশের শ্রম বাজার আরো জনপ্রিয় করতে নানামুখী উদ্যোগ নিতে হবে, কাজ করতে হবে সমন্বিতভাবে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদিশিক মন্ত্রণালয়, বোয়েসেল, বাংলাদেশ দূতাবাস সিউল, (বিশেষ করে লেবার উইং) কোরিয়ায় বাংলাদেশি কমিউনিটি, ইপিএস ভিত্তিক সংগঠন সবাই মিলে ইতিবাচকভাবে না এগুলো দক্ষিণ কোরিয়ায় বাংলাদেশ রেমিট্যান্সের বাজার হারাবে। ইন্দোনেশিয়ান, ভিয়েতনামী বা নেপালিরা যেভাবে স্বজাতির ইতিবাচক দিকগুলো ব্রান্ডিং করে সে অবস্থানে বাংলাদেশ নেই। নিজেদের মধ্যে কাদাঁ ছুড়াছুঁড়ি বাদ দিয়ে বাংলাদেশের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরতে হবে। একই সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একে অপরের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ আচরণও বন্ধ করতে হবে সংশ্লিষ্টরা মত ব্যক্ত করেন।

বিডি-প্রতিদিন/সালাহ উদ্দীন


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর