শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৪ জানুয়ারি, ২০২০ ২১:৩০

সাফল্য

গৃহিণী থেকে দেশসেরা পিয়াজ বীজচাষি

ফরিদপুরের সাহেদা বেগম

কামরুজ্জামান সোহেল, ফরিদপুর

গৃহিণী থেকে দেশসেরা পিয়াজ বীজচাষি

সারা দেশের মধ্যে পিয়াজ বীজ উৎপাদনে শীর্ষস্থানে রয়েছে ফরিদপুর। পিয়াজ এবং পিয়াজ বীজ এ জেলায় বেশি পরিমাণে আবাদ হয়ে থাকে। ফলে পিয়াজ আবাদের রাজধানী হিসাবে ধরা হয় ফরিদপুরকে। দীর্ঘদিন ধরে এ জেলার চাষিরা পিয়াজ বীজের আবাদ করে আসছে। কিন্তু সবাইকে পেছনে ফেলে পিয়াজ বীজ আবাদে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন কিষানি সাহেদা বেগম।

ফরিদপুরের অম্বিকাপুরের এ নারী উদ্যোক্তা তার ব্যাংকার স্বামীর সহযোগিতায় গৃহিণী থেকে এখন সেরা কিষানি হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছে। পিয়াজ বীজ উৎপাদনকারী হিসাবে দেশের যে কজন চাষি রয়েছেন তার মধ্যে তিনি রয়েছেন সেরাদের তালিকায়।

সাহেদা বেগমের কঠোর পরিশ্রম আর একাগ্রতার কারণে দ্রুতই এগিয়ে যাচ্ছেন সামনের দিকে। সামান্য একজন গৃহিণী থেকে এখন তিনি গড়ে তুলেছেন ‘খান বীজ ভান্ডার’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে সারা দেশের পিয়াজ চাষিরা ‘খান বীজ ভান্ডার’ থেকে বীজ কিনতে ছুটে আসেন। শুধু সারা দেশের চাষিদেরই নয় তিনি পিয়াজ বীজ দিয়ে থাকেন বিএডিসিতে। বিগত ১৫ বছর আগে ব্যাংকার স্বামী বক্তার খানের সহায়তায় কৃষিতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন সাহেদা বেগম। তারপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। কৃষিতে নানা প্রশিক্ষণ নিলেও বর্তমানে পিয়াজ বীজ উৎপাদনের দিকেই বেশি আগ্রহ তার। বাড়ির সব কাজ সামলে চাষিদের সঙ্গে নানা কাজে তিনি সহায়তা করেন। নিজেই পিয়াজ বীজের বাছাই থেকে শুরু করে ধোয়া, শুকানো, ড্রামে ভর্তি, প্রসেজিং, প্যাকেটজাত করাসহ সব কাজই করে থাকেন। তার সঙ্গে কাজে সহযোগিতা করেন প্রায় অর্ধশতাধিক চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক। সাহেদা বেগমের বাড়িতে থেকে-খেয়ে সারা বছর কাজ করেন উত্তরবঙ্গের ৩০/৩৫ দিনমজুর। 

কৃষি কাজের জন্য কয়েক বছর আগে

বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ৪০ লাখ টাকার ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ করে ফের ঋণ নিয়ে পিয়াজের আবাদ করে যাচ্ছেন। এ বছর তিনি ৩০ একর জমিতে পিয়াজ বীজের আবাদ করেছেন। নিজেদের ৫ একর এবং অন্যদের কাছ থেকে ২৫ একর লিজ নিয়ে এ বছর পিয়াজ বীজের আবাদ করেছেন।

কিষানি সাহেদা বেগম জানান, বিগত ১৫ বছর ধরে তিনি পিয়াজ বীজের আবাদ করে আসছেন। প্রথম দিকে স্বামী বক্তার খানের অনুপ্রেরণায় তিনি কৃষিকাজে মনোযোগী হন। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময় হাঁস-মুরগি পালন, মাশরুম চাষ, মৌমাছি পালনসহ নানা রকম সবজি চাষের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। স্বামীর দেখাদেখি তিনি পিয়াজ বীজ আবাদের দিকেই ঝুঁকে পড়েন। প্রথম দিকে নিজে দিনমজুরদের সঙ্গে মাঠে থাকলেও এখন তেমন একটা মাঠে যান না। তবে পিয়াজ বীজ আবাদ থেকে শুরু করে পিয়াজ থেকে ফুলকাটা, মাড়াই করা, ধোয়া, শুকানোর কাজ নিজেই করে থাকেন। এসব কাজে তাকে সহযোগিতা করেন অর্ধশতাধিক নারী-পুরুষ শ্রমিক। ১৫ বছর আগে ৫ একর জমিতে পিয়াজ বীজের আবাদ করলেও দিনকে দিন তিনি বাড়িয়েছেন আবাদের পরিমাণ। এ বছর ৩০ একর জমিতে তিনি পিয়াজ বীজের আবাদ করেছেন। সাহেদা বেগম জানান, কালো সোনা হিসেবে পরিচিত পিয়াজ বীজ আবাদে অনেক পরিশ্রম এবং অনেক টাকার দরকার হয়। খেত তৈরি থেকে শুরু করে বীজ প্যাকেট করা পর্যন্ত নানা রকম প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে কাজগুলো করতে হয়। ফলে অনেক টাকার দরকার হয়। এ বছর ৩০ একর জমিতে পিয়াজ লাগাতে সব মিলিয়ে খরচ হবে প্রায় ৪০ লাখ টাকা। তিনি জানান, স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি পিয়াজ বীজ আবাদে বেশ লাভবান হয়েছেন। ৫ বছর আগে তিনি ‘খান বীজ ভান্ডার’ নামে লাইসেন্স নিয়ে প্যাকেটজাত বীজ বিক্রি করছেন। দেশের সেরা বীজ উৎপাদনকারী হিসাবে সাহেদা বেগমের সুনাম থাকায় সরকারের অনুমোদন পেয়েছে ‘খান বীজ ভান্ডার’। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বীজ কিনতে তার বাড়িতে ছুটে আসেন পিয়াজ চাষিরা। সাহেদা বেগম আরও জানান, ঘরের নানা কাজকর্ম সেরে কৃষিকাজে বেশির ভাগ সময় ব্যয় করেন তিনি। সন্ধ্যার পর এলাকার মহিলাদের নিয়ে বসেন বৈঠকে। সেই বৈঠকে নানা রকম কৃষি ফসলের আবাদে নানা রকম পরিকল্পনা করেন।

তিনি নিজের বাড়ির আঙ্গিনায় বিভিন্ন রকমের সবজির আবাদও করে থাকেন।

পিয়াজ বীজ সংরক্ষণে সরকারের কাছে এ অঞ্চলে একটি হিমাগার স্থাপনের দাবি জানানোর পাশাপাশি সহজশর্তে ঋণের দাবি জানান দেশসেরা এ কিষানি। তিনি বলেন, দেশের বেশির ভাগ পিয়াজ বীজ আবাদ হয়ে থাকে ফরিদপুরে। ফলে এ পিয়াজ বীজ সংরক্ষণের জন্য একটি হিমাগার জরুরি। হিমাগার হলে পিয়াজ বীজ নষ্ট হবে না।

সাহেদা বেগমের ‘খান বীজ ভান্ডার’ থেকে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে চাষিরা আসছেন পিয়াজ বীজ কিনতে। তারা পিয়াজ বীজ কেনার পাশাপাশি সাহেদা বেগমের কাছ থেকে নানা পরামর্শও নিচ্ছেন।


আপনার মন্তব্য