শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৬ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৫ মার্চ, ২০২১ ২১:৩২

বাংলাদেশে মিডিয়ায় বিনিয়োগ ও বাস্তবতা

এ কে আজাদ

বাংলাদেশে মিডিয়ায় বিনিয়োগ ও বাস্তবতা

বিনিয়োগের পরিপ্রেক্ষিত দেখলে আমাদের দেশে কেবল নয়, বিশ্বজুড়েই সংবাদমাধ্যম বা ‘মিডিয়া’ এক জটিল ‘শিল্প’ ক্ষেত্র। সংবাদশিল্প নিঃসন্দেহে পুঁজিঘন; কিন্তু মূলধারার আর ১০টা শিল্পের মতো নয়। এতে বিনিয়োগ করা সহজ; কিন্তু বিনিয়োগ তুলে আনা কঠিন। গণযোগাযোগ শাস্ত্রে বলা হয়, সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব হচ্ছে- ‘টু টেল অ্যান্ড টু সেল’। অর্থাৎ কেবল বার্তা দেওয়াই শেষ কথা নয়, সেই বার্তা বিক্রয়যোগ্যও করে তুলতে হবে। আমরা যে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সক্ষমতার কথা বিভিন্ন সময় বলে থাকি, তার নেপথ্য শক্তিও কিন্তু বিনিয়োগ সাফল্য।

মূলধারার মিডিয়ার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দায়িত্বশীলতা নিশ্চয়ই মুখ্য। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম আমাদের জাতীয় জীবনের বিভিন্ন সন্ধিক্ষণে অসামান্য ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু পাশাপাশি অন্তত পরিচালনা ব্যয় নির্বাহের অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন করার বিকল্প নেই। আমাদের মিডিয়ার মূল চ্যালেঞ্জটা এখানেই। অন্যান্য ব্যবসায়িক ও বাণিজ্যিক উদ্যোগের মতো মিডিয়ায় স্বল্প মেয়াদে, এমনকি মধ্য মেয়াদেও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক করে তোলা সম্ভব হয় না। টেকসই মুনাফা দূরে থাক; দীর্ঘমেয়াদে গিয়ে যদি ‘ব্রেক-ইভেন’ সম্ভবও হয়, তার পথপরিক্রমা যেমন জটিল, তেমনই কঠিন। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় যে কারণে ‘ব্যবসাসফল’ সংবাদমাধ্যমের সংখ্যা হাতেগোনা।

দৈনিক সমকাল ও চ্যানেল টোয়েন্টিফোর প্রকাশ ও সম্প্রচার করতে গিয়ে মিডিয়ায় বিনিয়োগ-বাস্তবতা আমরা বহুলাংশে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছি। অতীতে তো বটেই, সমকাল বা চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের পর আরও কিছু সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেল বাজারে এসেছিল, যারা দুর্ভাগ্যবশত শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেনি। টিকে থাকতে না পারার নেপথ্যে আরও কারণ হয়তো রয়েছে; কিন্তু এটাও সমান সত্য যে মিডিয়ার ‘শ্বেতহস্তী’ লালন ও পালন করা সবার জন্য সহজ নয়।

বাংলাদেশের সংবাদপত্র জগতে বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর বিনিয়োগ আসতে থাকে আসলে নব্বই দশকের গোড়ায়। আমরা দেখি, নব্বই দশকে একে একে বাজারে আসে আজকের কাগজ, ডেইলি স্টার, ভোরের কাগজ, জনকণ্ঠ, ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, যুগান্তর ও প্রথম আলো। দেশীয় খসখসে নিউজপ্রিন্টের বদলে বিদেশি মসৃণ কাগজ, সাদা-কালো দুই রঙের বদলে চার রঙের মুদ্রণযন্ত্র, ডিজিটাল আলোকচিত্র ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি প্রযুক্তিগত রূপান্তর বাংলাদেশের সংবাদপত্রের অবয়ব পাল্টে দেয়। বস্তুত নব্বই দশককে সংবাদপত্রে বিনিয়োগের স্বর্ণযুগ বললে অত্যুক্তি হয় না। ওই পথ ধরেই সম্প্রচারে আসতে থাকে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো।

সমকাল প্রকাশ করতে গিয়ে আমরা দেখেছি- একুশ শতকে এসে বাংলাদেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যমের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ বিনিয়োগের অনুপাতে রাজস্ব আহরণ বা আয় করতে না পারা। এটা ঠিক, বেসরকারি খাত ও মুক্তবাজার অর্থনীতি সম্প্রসারিত হওয়ার কারণে বিজ্ঞাপনজগৎও সম্প্রসারিত হয়েছে। কিন্তু একটি স্বল্প বিনিয়োগের সংবাদমাধ্যমের জন্য যে বিজ্ঞাপন-আয় যথেষ্ট, বৃহৎ বিনিয়োগের সংবাদমাধ্যমগুলোর জন্য তা যথেষ্ট নয়। আবার সংবাদমাধ্যমের সংখ্যা যে হারে বেড়েছে, বিজ্ঞাপনের বাজার সে হারে সম্প্রারিত হয়নি।

ফলে সফল হতে হলে এখন সংবাদমাধ্যমকে একদিকে যেমন বিনিয়োগে দূরদর্শী ও সাশ্রয়ী হতে হবে; তেমনি আয় বৃদ্ধির জন্য উদ্ভাবন করতে হবে নতুন নতুন কৌশল।

একুশ শতকের সংবাদমাধ্যমের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো ইন্টারনেট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক বিস্তৃতি। এখন প্রত্যন্ত গ্রামেও মোবাইলে মোবাইলে ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে। ফলে তরুণ সমাজ প্রথাগত সংবাদমাধ্যমের বদলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই বেশি মনোযোগ দেয় এবং সেখান থেকেই সংবাদ, বিনোদন ও জীবনযাপন-সং?ান্ত তথ্যগুলো আহরণ করে। বিজ্ঞাপনের বাজারও মূলধারার সংবাদমাধ্যমের কাছ থেকে ক্রমবর্ধমান হারে কেড়ে নিচ্ছে ফেসবুক, টুইটার, গুগল, ইউটিউবের মতো টেক-জায়ান্ট। এই বাস্তবতা মেনে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কাছ থেকে আসা সংকট কীভাবে সম্ভাবনায় পরিণত করা যায়, সে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। বিনিয়োগ করতে হবে অনলাইন ও তথ্যপ্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জনে। নতুন বাস্তবতা মোকাবিলায় ব্রিটিশ সংবাদপত্র ‘দ্য গার্ডিয়ান’ কয়েক বছর আগেই মূলধারার পরিচালনা ব্যয়ের বাইরে কেবল অনলাইনে সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ৪২ মিলিয়ন পাউন্ডের নতুন ‘ক্যাপিটাল ইনভেস্টমেন্ট’ করেছে (দ্য গার্ডিয়ান, ১৮ অক্টোবর, ২০১৭)। নতুন এই বিনিয়োগের লক্ষ্য ছিল- আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স টুল যোগ করা, বিজ্ঞাপন প্রযুক্তির নতুন ফরম্যাট চালু করা, পাঠক ও গ্রাহককে প্রযুক্তি-সক্ষম করে তোলা, অনলাইন পেমেন্ট সহজতর করা প্রভৃতি কাজে। বিলম্বে হলেও বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমকে এদিকে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে।

বিশেষত সংবাদপত্রের জন্য নতুন বাস্তবতার চ্যালেঞ্জ তিন গুণ। পুঁজি ও মুনাফার ধ্র“পদি মিথস্ক্রিয়া ছাড়াও সংবাদপত্রকে আরও তিন প্রতিযোগীর সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে হয়- টেলিভিশন, অনলাইন মাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। মুদ্রণ, অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ত্রিমাত্রিক প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে যারা, সেই সংবাদপত্রই আগামীতে বিনিয়োগ-সফল হবে।

বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের জন্য গুরুতর আরেকটি চ্যালেঞ্জ দক্ষ, দায়িত্বশীল ও প্রযুক্তিসক্ষম জনবল। আমাদের চারপাশেই এমন উদাহরণ পাওয়া যাবে, যেখানে মিডিয়ায় বিপুল বিনিয়োগ ব্যর্থ হয়েছে কেবল উপযুক্ত জনবল না পাওয়ার কারণে। ফলে বিনিয়োগের সঙ্গে সঙ্গে দক্ষ, মেধাবী জনবল নিয়োগ এবং সম্ভাবনাময়দের প্রশিক্ষিত করে তোলার দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। মনে রাখা জরুরি, দক্ষ জনবল যে কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য শ্রেষ্ঠ পুঁজি ও বিনিয়োগ। সংবাদমাধ্যমের জন্য তা সবচেয়ে জরুরি। কেননা দক্ষতা ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতাই পাঠক বা গ্রাহকের আস্থা সৃষ্টি করে এবং সে আস্থা বিনিয়োগ-সাফল্যে রূপান্তরিত হয়।

বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমে বিনিয়োগের আরেকটি চ্যালেঞ্জ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা; যেমন সংবাদমাধ্যমের বাইরের, তেমনি এর অভ্যন্তরীণ। এর ফলে স্বাধীন সাংবাদিকতা অনেক সময়ই ব্যাহত হয় এবং পাঠক ও দর্শক সমাজের কাছে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এর প্রভাব পড়ে প্রচারসংখ্যায়। আবার পরোক্ষ চাপ হিসেবে বিজ্ঞাপনও নিয়ন্ত্রিত হতে দেখা যায়। বাস্তবে রাজনৈতিক সুশাসন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য দায়িত্বশীল ও স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের বিকল্প নেই।

সমকাল প্রকাশের কাছাকাছি সময়ে প্রকাশিত হয়েছিল ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’। প্রকাশিত হওয়ার স্বল্প সময়ে সংবাদপত্রটি বেশ পাঠকপ্রিয় হয়েছে এবং এটি প্রচারসংখ্যায় সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিকগুলোর একটি। আমি আনন্দিত যে- একুশ শতকের বিবিধ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই পত্রিকাটি দ্বাদশ বর্ষে পদার্পণ করতে যাচ্ছে। আমি এর উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করি। আমি প্রত্যাশা করি, বিনিয়োগ-সফল সংবাদপত্রের তালিকায় বাংলাদেশ প্রতিদিনও থাকবে এবং টেকসই হবে। আর তাদের উদাহরণ সামনে রেখে অন্যান্য সংবাদপত্রও অনুপ্রাণিত হবে। এটাও প্রত্যাশা করি, বিনিয়োগ সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতায়ও উদাহরণ সৃষ্টি করবে ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’।

সভাপতি, নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব); প্রকাশক দৈনিক সমকাল।


আপনার মন্তব্য