Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ২৪ মে, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৩ মে, ২০১৯ ২৩:১৮

লর্ডসের আকাশে সাদা মেঘ

লর্ডসের আকাশে সাদা মেঘ

ফ্লাইট নম্বর ইকে-০০১, দুবাই টু লন্ডন। সকালে এয়ারক্রাফটে উঠেই বিস্ময়! একই রঙের স্যুট-প্যান্ট-টাই পরা বেশকিছু ভদ্রলোক। সবই চেনামুখ। কোহলি, ধাওয়ান, রোহিতদের দেখে কে না চিনতে পারবে? বিশ্বকাপ খেলতে আসা ভারতীয় দলের সঙ্গে যাত্রাপথে এভাবেই দেখা হয়ে যায় এমিরেটসের বিমানে।

ভারতীয় দলের সঙ্গে একই এয়ারক্রাফটে আসতে পারায় যাত্রীদের কেউ কেউ বেশ গর্ব করছিলেন। কিন্তু সেই আহ্লাদ যেন খানিকটা হিথ্রো বিমানবন্দরে পৌঁছার পর বিরক্তিতে রূপ নেয়। নিরাপত্তার কারণে ভারতীয় ক্রিকেট দলের সদস্যদের সবার আগে নামতে তো দিলেই হলো। শুধু তাই নয়, উল্টো মিনিট তিরিশেক এয়ারক্রাফটেই দাঁড়িয়ে থেকে অপেক্ষা করতে হলো, কোহলিদের প্রস্থান পর্যন্ত।

লন্ডনের আবহাওয়ায় কেমন যেন জাদু আছে! ঢাকা থেকে দুবার, তারপর সেখান থেকে হিথ্রো বিমানবন্দর, লম্বা জার্নির পর লন্ডনে নামার সঙ্গে সঙ্গে সব ক্লান্তি উধাও! তারপর সোজা লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ড।

লন্ডনে দ্রুত যেখানে সেখানে চলে যাওয়ার সবচেয়ে সহজ রাস্তা হচ্ছে পাতালরেল। এখানে যাকে বলা হয় ‘আন্ডারলাইন’ বা টিউব। যে কোনো স্টেশনে গিয়ে আগে টিউবের একটা ম্যাপ নিয়ে নিলেই পুরো লন্ডন আপনার হাতের মুঠোয় চলে আসবে। তারপর ওয়েস্টার কার্ড নেবেন, মানে শহরে ভ্রমণের জন্য কার্ড। বাসে-ট্রেনেও চলে এ কার্ড। শুধু মাঝে মাঝে পাউন্ড রিচার্জ করতে হয়।

যাই হোক, হিথ্রো বিমানবন্দরের ৩ নম্বর টার্মিনাল থেকে টিউবে পিকাডিলি লাইনে গ্রিন পার্ক। সেখান থেকে জুবিলি লাইনে সেন্ট জোন্স উড স্টেশন। তারপর ১৩ কিংবা ১১৩ নম্বর বাসে এক স্টপেজ গেলেই চোখের সামনে পড়বে লর্ডস। এক পাশে বিখ্যাত ওয়েলিংটন রোড, আরেক পাশে সেন্ট জোন্স উড রোড। সেন্ট জোন্স উডের গাছের সারি আপনার মন কাড়বে। এ রোডেই লর্ডসের প্রধান গেট। আর ওয়েলিংটন রোডে নর্দান গেট। স্টেডিয়ামের এক পাশে বিখ্যাত ওয়েলিংটন হাসপাতাল, আরেক পাশে সেন্ট জোন্স উড চার্চ গার্ডেন। এর উল্টো দিকে মিডলসেক্স কাউন্টি ক্লাব। এ কাউন্টি ক্লাবটিই লর্ডস তাদের হোম গ্রাউন্ড হিসেবে ব্যবহার করে।

মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামকে আমরা বাংলাদেশিরা যেমন ‘হোম অব ক্রিকেট’ বলি, তেমনি বিশ্বক্রিকেটে ‘হোম অব ক্রিকেট’ বলা হয় এই লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ডকে।

ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ১৭৮৭ সালে মাঠটির প্রতিষ্ঠা করেন থমাস লর্ড নামে এক ভদ্রলোক। তার নামেই মাঠটির নামকরণ। এখন মালিক ক্রিকেটের আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান মিরিবোন ক্রিকেট ক্লাব (এমসিসি)। এখানেই  ১৯৯৯ বিশ্বকাপের ফাইনাল হয়েছিল। এবারের ফাইনালও  এখানেই।

লর্ডসে আছে একটি সমৃদ্ধ ক্রিকেট জাদুঘর। এমসিসি জাদুঘরে ১৮৬৪ সাল থেকে ক্রিকেটের সবকিছু খুঁজে পাবেন। আছে একটি বৃহৎ লাইব্রেরি। ক্রিকেটের সব বই আপনি পাবেন এখানে।

হিথ্রো থেকে লর্ডসে যখন পৌঁছি তখন দুপুর গড়িয়ে বিকাল। মেইন গেটে দর্শনার্থীর ভিড়। কেউ স্টিল ছবি তুলছেন, কেউ বা ভিডিও করে মুহূর্তটিকে ফ্রেমে বন্দী করে রাখতে চাইছেন। প্রধান গেট থেকেই চোখে পড়ে বিশালাকারের ছবিগুলো। গ্রাহাম গুচ, ইয়ান বোথামের মতো কিংবদন্তিদের ছবি টানিয়ে রাখা হয়েছে।

এ ভেন্যুতে ব্যাট হাতে সর্বোচ্চ ইনিংস খেলেছিলেন গুচ। ১৯৯০ সালে ভারতের বিরুদ্ধে টেস্টে এই ইংলিশ তারকা প্রথম ইনিংসে ৩৩৩ রান করার পর দ্বিতীয় ইনিংসে ১২৩ রান করে রেকর্ড গড়েছেন। লর্ডসে সবচেয়ে বেশি রানের রেকর্ডটিও গুচের। ৩৯ ম্যাচে করেছিলেন ২ হাজার ১৫ রান। এখনো তার রেকর্ডটি কেউ ভাঙতে পারেননি।

সেরা বোলিং ফিগার ইয়ান বোথামের। ১৯৭৮ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ম্যাচে তিনি মাত্র ৩৪ রানে নিয়েছিলেন ৮ উইকেট। এখন পর্যন্ত তার রেকর্ডটি কেউ ভাঙতে পারেননি। তবে ১৯৯৭ সালে বোথামের রেকর্ডটি প্রায় ভাঙতেই বসেছিলেন অস্ট্রেলিয়ার পেসার গ্লেন ম্যাকগ্রা। তিনিও ৮ উইকেট নিয়েছেন। কিন্তু বোথামের চেয়ে ৪ রান বেশি দিয়েছেন।

লর্ডসের অনার্স বোর্ডে নাম আছে বাংলাদেশের দুই ক্রিকেটার তামিম ইকবাল ও শাহাদত হোসেনের। ২০১০ সালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে টেস্টে সেঞ্চুরি করেছিলেন ড্যাসিং ওপেনার, আর ৫ উইকেট নিয়েছিলেন পেসার শাহাদত।

এবারের বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচটি বাংলাদেশ খেলবে এ লর্ডসেই। যে ম্যাচে টাইগারদের প্রতিপক্ষ পাকিস্তান। তারপর স্বপ্নের ফাইনাল তো এখানেই।

লর্ডস ক্রিকেটারদের কাছে এক আভিজাত্যের নাম। এখানে খেলতে না পারলে যেন ক্রিকেট ক্যারিয়ারই অসমাপ্ত থেকে যায়! ক্রীড়া সাংবাদিকদের কাছেও লর্ডসের গুরুত্ব আলাদা। এর প্রেসবক্সে বসে কাজ করতে না পারলে ক্রিকেট বিটের সাংবাদিকদের মনে অস্বস্তি থাকবেই। লর্ডসের ইতিহাস ও সৌন্দর্য কেবল ভাষায় প্রকাশ করে পুরোটা তুলে ধরা কঠিন। তবে এতসবের পরও লর্ডসের একটা মায়াবী রূপ পাঠকের সঙ্গে শেয়ার না করলেই নয়! প্রধান গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকে আকাশের দিকে তাকালে মনে অন্যরকম তৃপ্তি লাগে। ঝকঝকে রৌদ্রোজ্জ্বল দিনেও রাশিরাশি সাদা মেঘ খেলা করছে। কখনো কখনো মনে হয় যেন মাঠকে প্রদক্ষিণ করতে খুবই কাছে চলে আসছে মেঘগুলো। আবার উড়ে চলেও যাচ্ছে। সাদা মেঘের সঙ্গে যেন লর্ডসের দারুণ মিতালি!


আপনার মন্তব্য