মঙ্গলবার, ২৭ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ টা

নিভৃত পল্লী থেকে উন্নয়নের মূলস্রোতে

রেজা মুজাম্মেল, চট্টগ্রাম

নিভৃত পল্লী থেকে উন্নয়নের মূলস্রোতে

চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার ফরহাদাবাদ ইউনিয়নের মনাই ত্রিপুরা পল্লী। হাটহাজারী সদর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে এটির অবস্থান। আধুনিক জীবন, স্বাস্থ্যসম্মত কিংবা শিক্ষাজীবনের সঙ্গে তারা ছিল পুরোই অচেনা। এ পল্লীতেই ২০১৮ সালের ২৬ আগস্ট অজ্ঞাত রোগে এক পরিবারের তিনজনসহ মারা যায় চার শিশু। তবে হাটহাজারীর সদ্য সাবেক উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মাদ রুহুল আমীনের উদ্যোগে নিভৃত অজপাড়াগাঁর সেই পল্লী এখন উন্নয়নের মূলস্রোতে। উন্নয়নের ছোঁয়ায় বদলে গেছে পুরো ত্রিপুরা পল্লী। পৌঁছেছে আধুনিক নানা সুবিধা।  

জানা যায়, মনাই ত্রিপুরা পল্লীতে বাস করে ক্ষুদ্র নৃতাত্তি¡ক জনগোষ্ঠীর ৫৫ পরিবারে প্রায় ৪০০ মানুষ। চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি মহাসড়কের পশ্চিমে হলেও যুগ যুগ ধরে পল্লীটি ছিল উন্নয়নের মহাসড়কের আড়ালে। কখনো পায়নি উন্নয়ন বা আধুনিকতার ছোঁয়া। বুঝত না স্যানিটেশন কি, ছিল না সুপেয় পানির কোনো ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ছিল স্বপ্নের মতো, রাতের আঁধারে ভরসা ছিল কেরোসিনের কুপি, হাতেগনা কয়েকজনের কাছে মোবাইল থাকলেও ঘণ্টায় ১০ টাকার বিনিময়ে দূরের বাজারে গিয়ে চার্জ দিতে হতো। ছিল না যাতায়াতের কোনো সড়ক। পাহাড় থেকে কাঠ সংগ্রহ করে করত জীবিকা নির্বাহ। বসবাস ছিল ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে। সঙ্গী ছিল পুষ্টিহীনতা। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কি জানতই না তারা। বঞ্চিত ছিল লেখাপড়ার সুযোগ থেকে। গাড়ি থেকে নেমে দুই কিলোমিটার মেঠোপথ মাড়িয়েই যেতে হতো পল্লীতে। অসুস্থ হলে দুই কিলোমিটার পথ কাঁধে করে এনে তুলত গাড়িতে। বসবাসের ঘরগুলো ছিল কবিতার আসমানীদের ঘরের মতো জরাজীর্ণ, ছিল না কোনো বিদ্যালয়। কিন্তু ২০১৮ সালের শেষদিকে শুরু হয় বদলে যাওয়ার ইতিহাস। পল্লীটি এখন উন্নয়নের মূলস্রোতে। ত্রিপুরা পল্লীর সরদার শচীন ত্রিপুরা বলেন, ‘আমরা এতদিন নাগরিক জীবনের সুবিধার বাইরে ছিলাম। এখন আমাদের সড়ক, স্কুল, টিউবওয়েল, ঘর, মন্দির, বিদ্যুৎসহ অনেক সুবিধা পেয়েছি। একজন সরকারি কর্মকর্তার মাধ্যমে আমরা এসব পেয়েছি। এ কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন।’  

মোহাম্মাদ রুহুল আমীন বলেন, ‘আমার গ্রাম, আমার শহর’ স্লোগানকে সামনে রেখে শুরু করি মনাই ত্রিপুরা পল্লীর উন্নয়ন। তৈরি করা হয় যোগাযোগের সড়ক। প্রায় দুই কিলোমিটার খেতের আইলকে প্রথমে মাটির সড়ক ও পরবর্তীতে হেরিং বোন বন্ড সড়কে রূপান্তর করা হয়। এখন যানবাহনে যাতায়াত করা যাচ্ছে। নির্মাণ করা হয় মন্দিরভিত্তিক গণশিক্ষা কেন্দ্র। এ কেন্দ্রের মাধ্যমে শিক্ষাপ্রাপ্তদের ভর্তি করা যাবে পার্শ্ববর্তী উদালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। লেখাপড়া নিয়মিত রাখতে চালু করা হয়েছে ‘শিক্ষাবৃত্তি’। শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে দেওয়া হয়েছে ইউনিফরম, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক উপকরণ। পল্লীর বাসিন্দাদের চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ প্রাপ্তিতে নির্মাণ করা হয় পল্লী ফার্মেসি। এখানে আছেন একজন পল্লী চিকিৎসক। পল্লীর বাসিন্দাদের যুক্ত করা হয়েছে মাতৃত্বকালীন ভাতা, বয়স্ক ভাতা, ভিজিডি, ভিজিএফসহ নানা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে।’    

জানা যায়, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের প্রায় ৩ লাখ ৭০ টাকা ব্যয়ে প্রধান সড়ক থেকে প্রায় দুই কিলোমিটারের আইলকে উন্নীত করা হয়েছে ১৫ ফুট প্রস্থের কাঁচা সড়কে। তৈরি হয়েছে ৮টি কালভার্ট ও ৮টি সেমিপাকা বাথরুম। তাছাড়া প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা অর্থায়নে স্থাপন করা হয়েছে ৩টি গভীর নলকূপ, মন্দিরভিত্তিক স্কুল শিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে তৈরি করা হয়েছে টিনশেড ঘর, ত্রিপুরা পল্লীর জন্য ৮টি সেমিপাকা টয়লেট।