Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৩ মার্চ, ২০১৭

প্রকাশ : শনিবার, ২৫ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২৪ জুন, ২০১৬ ২৩:৩১
ঢাকার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে
স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন
ঢাকার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে

বিশ্বের খুব কম রাজধানীই ঢাকার মতো প্রাকৃতিক সুযোগ-সুবিধায় সমৃদ্ধ। কয়েকটি স্টেডিয়াম, বিরাট সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, সংসদ ভবন এলাকা, পুরনো বিমানবন্দর, বিজিবি (বিডিআর) এলাকা, ধানমন্ডি ও গুলশান-বনানী লেক, হাতিরঝিল, শহরের প্রাণকেন্দ্রে দুটো গলফ কোর্স, ঢাকা শহরের বিরাট এ উন্মুক্ত এলাকাগুলো নিয়ে ঢাকাবাসীর জন্য কোনো সমন্বিত পরিকল্পনা করা হয়নি আজও। ঢাকার মতো বিশ্বের কোনো দেশের রাজধানী ঘিরে এত নদী নেই। মুসলিম ধর্মগ্রন্থ পবিত্র কোরআনে ‘জান্নাত’ বা বেহেশত চেনাতে প্রায় প্রতিবারই বলা হয়েছে, ‘জান্নাত, যার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে নহর। ’ যতবার ‘জান্নাত’ শব্দটি এসেছে প্রায় ততবারই ‘নহর’ কথাটিও এসেছে। এর অর্থ নহর বা নদী দেখেই জান্নাত চেনা যাবে। অন্যদিকে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে গঙ্গা হচ্ছে সবচেয়ে পবিত্র নদী, এটি তাদের কাছে দেবী। বাংলাদেশের প্রায় সব নদীতেই গঙ্গার পানি আসে। যে কারণে হিন্দু নারী-পুরুষ এ নদীতে স্নানপূর্বক পূজা করে থাকেন। তারা মনে করেন, গঙ্গার পানিতে স্নান করলে পুণ্য লাভ করা যায়। আমাদের সৌভাগ্য, বিশ্বের একমাত্র রাজধানী ঢাকা, যার চারপাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে কয়েকটি নদী। বিশ্বের বিভিন্ন শহরে নদী রয়েছে, যার বেশির ভাগের পানিই লবণাক্ত। আর বাংলাদেশের অধিকাংশ নদীই মিঠা পানিতে সমৃদ্ধ। বিশ্বের মাথাপিছু এক-তৃতীয়াংশ মিঠা পানি বাংলাদেশে। মিঠা পানির আধার হিসেবে বিশ্বে তিন নম্বরে রয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের চারজন সেক্রেটারি জেনারেল বলেছেন, বিশ্বে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ যদি কখনো হয়, তবে সেটি হবে কেবল মিঠা পানির জন্য। আর আমরা হলাম সেই সৌভাগ্যবান বাংলাদেশের নাগরিক, যে দেশটি মিঠা পানিতে পরিপূর্ণ! দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা সেই মিঠা পানির আধার নদীগুলোকে প্রতিনিয়ত ধ্বংস করছি। নদীবেষ্টিত রাজধানী হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের ক্ষতি নিজেরাই করে চলেছি দিনের পর দিন। আমাদের এই ছোট্ট ভূখণ্ডটি অফুরন্ত সম্পদে ভরপুর। এ দেশের সাধারণ মানুষ প্রকৃতি-পরিবেশ প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে। প্রতিবেশ রক্ষায় তারা সোচ্চার। বিশ্বের সবখানেই দুষ্ট লোকের সংখ্যা সীমিত এবং সবকিছু ধ্বংসের পেছনে রয়েছে ক্ষমতা কুক্ষিগত করা ওইসব মুষ্টিমেয় মানুষ। তথাকথিত শিক্ষিত জ্ঞানী দুষ্ট লোকেরাই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। এরা সমাজকে কলুষিত করে তাদের অর্থ ও পেশিশক্তি দিয়ে। কুবুদ্ধি, অসৎ পথে অর্জিত অর্থ ও পেশিশক্তি তিনটির অধিকারী একজন মানুষ কোন পর্যায়ে পৌঁছতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। এর প্রভাব আমরা প্রতিনিয়ত দেখতে পাচ্ছি। সব ধরনের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও ঢাকাকে বিশ্বের অন্যতম সেরা রাজধানীতে আমরা পরিণত করতে পারিনি আজও। এ দেশকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজন সৎ ও দক্ষ নেতৃত্বের। সঠিক নেতৃত্বদানকারীকে অবশ্য অবশ্যই অতিশিক্ষিত হওয়ার প্রয়োজন হয় না। মোগল সম্রাট আকবর দ্য গ্রেট শিক্ষিত নেতা ছিলেন না এবং অপ্রাপ্ত বয়স থেকেই ভারতবর্ষ শাসন করেছেন সাফল্যের সঙ্গে। প্রশ্ন হতে পারে, কিশোর বয়সে কীভাবে এ বিরাট ভূখণ্ড সার্থকভাবে শাসন করেছেন? উত্তর— তার চারপাশে ছিল অতিদক্ষ কিছু সৎ মানুষ, যারা তাকে সব সময় সঠিক তথ্য ও বুদ্ধি দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। এ ধরনের সঠিক তথ্য প্রদানে সাহসী, সৎ ও দক্ষ মানুষকে নির্বাচন করার ক্ষমতা থাকতে হবে নেতৃত্বের। তাদের সঠিকভাবে ব্যবহার এবং যথাযথ সম্মান দিতে হবে। যে কোনো পরিস্থিতি সামলানোর ক্ষমতা থাকতে হবে। কাজকর্মে পেশাদারিত্ব আনতে হবে। প্রকৌশলী, স্থপতি, পরিকল্পনাবিদ, চিকিৎসক, আইনজীবীসহ সব ধরনের পেশাজীবীর মধ্য থেকে দক্ষ মানুষ খুঁজে নিতে হবে। এসব দক্ষ মানুষই একজন নেতাকে সর্বোতভাবে সহযোগিতা করবে সঠিকভাবে দেশ পরিচালনার জন্য। এদের চেনা-বোঝার ক্ষমতা থাকতে হবে প্রকৃত নেতৃত্বদানকারীর মধ্যে। এমনটা ঘটাতে পারলে আগামী ছয় মাসের মধ্যেই ঢাকা শহর তথা দেশের চেহারা পরিবর্তন করা সম্ভব।

একটার পর একটা ফুটওভার কিংবা ফ্লাইওভার ব্রিজ নির্মাণ করা হচ্ছে। সবক্ষেত্রে আইনের শাসন তথা এর প্রয়োগ না থাকায় ফুটওভার ব্রিজের ব্যবহার নেই বললেই চলে। আর তথাকথিত ফ্লাইওভারগুলো ব্যবহার করছে মুষ্টিমেয় কিছু লোক! Strategic Transport Plan (STP) বাস্তবায়নের মাধ্যমে ধাপে ধাপে গণপরিবহন সুশৃঙ্খল করার প্রেসক্রিপশন ছিল। উল্লেখ্য, একটি শহরে কমপক্ষে ২৫ শতাংশ জায়গায় রাস্তা থাকা প্রয়োজন। ঢাকায় আছে মাত্র ৮ শতাংশ। আর ৮ শতাংশের প্রায় ৪০ শতাংশ রাস্তাই বেআইনি দখলে। প্রতিদিন ৫০ লাখের ওপর মানুষ ঢাকার রাস্তা ব্যবহার করে। যানজটের কারণে প্রতিদিন ২০ লাখের ওপর বাণিজ্যিক ঘণ্টার অপচয় হয়। তেলের অপচয় হয় বছরে ১২ হাজার কোটি টাকার ওপর। বার্ষিক সামগ্রিক অপচয় ২০ হাজার কোটি টাকার ওপর শুধু এক ঢাকা শহরেই। সমস্যা সমাধানে প্রথমেই বাস র‍্যাপিড ট্রান্সপোর্ট (বিআরটি), মাস র‍্যাপিড ট্রান্সপোর্ট (এমআরটি) চালু করে তারপর ফ্লাইওভার নির্মাণে যাওয়ার কথা। বর্তমান সরকারের কিছু উদ্যোগ দেখে মনে হয়েছে, শরীরের উপরের অংশে দামি শার্ট-টাই পরানো হচ্ছে, আর নিচের অংশ থাকছে নগ্ন। কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে যে ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হচ্ছে, তা মাত্র ৬-১০ শতাংশ মানুষ ব্যবহার করতে পারছে। অর্থাৎ ৯০ শতাংশ মানুষই এর সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকছে।

বর্তমান ব্যবস্থায় মানুষের ঢাকামুখী প্রবাহ কিছুতেই বন্ধ করা সম্ভব নয়। ঢাকা শহরের তথাকথিত উন্নতি যত বেশি হবে, সারা দেশ থেকে ঢাকামুখী জনস্রোত তত বেশি বাড়বে। তবে ঢাকা শহরে মানুষের আগমন বন্ধ করার পরীক্ষিত সহজ উপায় রয়েছে। এখন এক স্থান থেকে আরেক স্থানের দূরত্ব কিলোমিটারে পরিমাপ করা হয় না, পরিমাপ করা হয় যাতায়াতের সময় দিয়ে। অর্থাৎ কত সময়ে সেখানে পৌঁছানো গেল, সেটিই হলো দূরত্বের হিসাব। নরসিংদী থেকে ঢাকা শহরে আসতে যদি ৫০ মিনিট লাগে তবে কেন কোটি টাকা ব্যয়ে মানুষ গুলশানে থাকবে? কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে গুলশান-বারিধারায় ফ্ল্যাট কেনা ভালো নাকি নরসিংদীতে ওই একই টাকায় প্রচুর জায়গা-জমি নিয়ে বাড়ি করা ভালো? বিশ্বের উন্নত সব দেশেই অবসরের পর মানুষ শহরের বাইরে চলে যায়। কেননা জরুরি প্রয়োজনে হাসপাতাল, বিমানবন্দর বা যে কোনো গন্তব্যে নির্ধারিত সময়ে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা রয়েছে সর্বদা। দ্রুত আসা-যাওয়ার জন্য উন্নত গণপরিবহনের বিকল্প নেই। সুষ্ঠু গণপরিবহন যানজট নিরসনের প্রধান নিয়ামক। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রয়োজন নিরাপত্তার পূর্ণ নিশ্চয়তা ও সর্বত্র আইনের কঠোর প্রয়োগ। কঠোর প্রয়োগের নিশ্চয়তাই মানুষকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে বাধ্য করে।

ঢাকা শহরের বিরাট উন্নয়ন করা হচ্ছে। এতে অন্যান্য জেলার মানুষ আরও বেশি করে ঢাকামুখী হচ্ছে। ঢাকাকে বাঁচাতে ও উন্নত আধুনিক রাজধানীতে পরিণত করতে হলে দেশের সব শহরকে উন্নত করতে হবে সমানভাবে, যাতে ঢাকায় থাকার প্রয়োজন ও আগ্রহ কমে যায়। উন্নতির চাবিকাঠি উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, জ্বালানি ও সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা। এ মৌলিক বিষয়গুলো নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। সরকার যদি উপযুক্ত ও পরীক্ষিত পেশাজীবীদের নিয়ে যথাযথভাবে এটি করতে পারে, তাহলে বাকি সব কিছুর উন্নতি আপনা-আপনি হয়ে যাবে জনগণের নিজস্ব প্রচেষ্টায়। অবকাঠামো নির্মাণে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এমনভাবে অবকাঠামো নির্মাণ করা উচিত, যাতে সবাই সমানভাবে সেটি ব্যবহারের সুযোগ পায়। আজ গার্মেন্ট খাত যে পর্যায়ে এসেছে, তার উত্পত্তির ইতিহাস খুঁজলে দেখা যাবে, শুরুতে এ খাতে সরকারের কোনো অবদানই ছিল না। প্রথমে ‘দর্জিগিরি’ করতে হয়েছে। কাপড় আনা হয়েছে। আবাসস্থলে মেশিন বসানো হয়েছে। এভাবে বিকশিত হয়েছে পোশাকশিল্প। এরপর টেক্সটাইল এসেছে। পোশাক কারখানাগুলোকে পরিকল্পিতভাবে নির্মাণের জন্য সরকার তেমন কোনো ভূমিকা পালন করেনি। শিল্প জোন বা পার্ক তৈরি করা হলে রাস্তাঘাট, অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা বা ওয়াটার হাইড্র্যান্ট থাকত। কলকাতা শহরে ওয়াটার হাইড্র্যান্ট রয়েছে সেই ব্রিটিশ শাসন আমল থেকে। ঢাকা শহরের অলিগলিতে এ ব্যবস্থা করা সম্ভব। বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান এ জন্য অনায়াসে আর্থিক সহযোগিতা দেবে। আমাদের দুর্ভাগ্য, দেশে এত জলাশয়, নদ-নদী তবু আগুন লাগলে পানির অভাবে তা নাকি নেভানো যায় না।

বিদেশি স্থপতিদের তুলনায় আমাদের স্থপতিরা কোনো দিক থেকে পিছিয়ে নেই। প্রায় সমানতালে এগিয়ে চলেছি আমরা। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের স্থপতিরা স্থাপত্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যত আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন, তা এ দেশের আর কোনো প্রতিষ্ঠানই অর্জন করতে পারেনি। আমাদের দেশে বহু জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি রয়েছেন, যারা বিশ্বে সুখ্যাতি অর্জন করেছেন। বাংলাদেশের বহু স্থপতি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাফল্যের সঙ্গে কাজ করছেন। বিদেশে নানা বিষয়ে তারা কাজ করছেন। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছেন। উন্নত বিশ্বে রোবট তৈরিতে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। অথচ আমাদের দেশে এ রোবটের চেয়ে অনেক উন্নত ১৬ কোটি জনসম্পদ রয়েছে। বছরে মাথাপিছু কয়েক হাজার টাকা ব্যয় করলেই দেশ কোথায় পৌঁছবে, তা কেউ চিন্তাই করতে পারবে না! জনসম্পদ যদি সুষ্ঠু, সমন্বিতভাবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে দেশের উন্নয়ন কেউ থামিয়ে রাখতে পারবে না। বাংলাদেশের স্থপতিরা মঙ্গোলিয়া, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কায় ডিজাইন কম্পিটিশনের বিচারক হিসেবে কাজ করছেন। ইলেকশন করে কমনওয়েলথ দেশগুলোর প্রতিষ্ঠান কমনওয়েলথ অ্যাসোসিয়েশন অব আর্কিটেক্টসের (সিএএ) প্রেসিডেন্ট হয়েছেন বাংলাদেশের স্থপতি। প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এশিয়ার উন্নত দেশগুলোর প্রতিষ্ঠান এশিয়ান রিজিওনাল কাউন্সিল অব আর্কিটেক্টসের (আর্কএশিয়া) প্রেসিডেন্ট হয়েছেন বাংলাদেশের স্থপতি। এ দেশের স্থপতি সিঙ্গাপুর ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টসের ডিজাইন প্রতিযোগিতায় বিচারক মনোনীত হয়েছেন। বাংলাদেশে তাদের সঠিক মূল্যায়ন হচ্ছে কি? তাদের দেশ গঠনে সঠিকভাবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে উপযুক্ত নেতৃত্বের অভাব রয়েছে। বাংলাদেশের স্থপতিরা গ্রিন আর্কিটেকচার নিয়ে কাজ করছেন। কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করছেন। মালয়েশিয়ায় আমাদের এক স্থপতির উন্নত দৃষ্টিনন্দন নকশা সে দেশের আইনসম্মত না হওয়া সত্ত্বেও প্রচলিত আইন পরিবর্তন করে ডিজাইনটি সেখানে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। নেপালে এশিয়ান স্থপতিদের আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে আমাদের স্থাপত্যের শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। বিশ্বব্যাপী ছাত্রদের স্থাপত্য প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ ২৫ জন ছাত্রের মধ্যে পাঁচজনই বাংলাদেশের। কজনইবা এসব খবর জানি! এরা সবাই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা বিশ্বের কোথায় নেই! স্বাধীনতা আমাদের এ মেধাগুলোকে প্রস্ফুটিত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। কেবল সঠিক নেতৃত্বই পারে এ মেধার সুষ্ঠু ব্যবহার করতে। রাজধানীকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলার জন্য অনেক পরিকল্পনা নেওয়া হলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন হয়নি। ঢাকাকে নিয়ে ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) করা হয়েছে। সব শহর তথা সারা দেশ নিয়েই এমন পরিকল্পনা করতে হবে। বিশ্বের সব দেশে তা-ই হয়। বাড়ির একটা ঘর সুন্দর করে সাজিয়ে বাকি ঘরগুলো অসুন্দর রাখলে সেটাকে সুন্দর বাড়ি কেউ বলবে না। ঠিক তেমনি সবকিছু সামগ্রিকভাবে করতে হবে। ২৫ থেকে ৫০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি কিছু স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনাও থাকা চাই। ঢাকা, চট্টগ্রাম কিংবা খুলনার ওপর থেকে চাপ কমাতে হলে আশপাশের শহরগুলোর সঙ্গে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার পাশাপাশি করতে হবে আধুনিক গণপরিবহনের ব্যবস্থা। ফলে এখানে থাকবে না কোনো রকম যানজট। চট্টগ্রাম থেকে কেউ ঝড়ের গতিতে এলেও ঢাকার কাঁচপুর ব্রিজে তাকে আটকে যেতে হয়। অথচ এ সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। কারণ এ সমস্যা সমাধানের পথ আমাদের ক্ষমতার মধ্যে রয়েছে। এ জন্য প্রয়োজন দেশব্যাপী সবার জন্য সার্বক্ষণিক ‘সর্বদলীয়’ কঠোর আইনের শাসন ও প্রয়োগ। সবার প্রতি কঠোর আইন প্রয়োগই এনে দেয় এর প্রতি শ্রদ্ধা। এতে ঢাকায় স্বাভাবিকভাবেই মানুষের সংখ্যা কমবে। এর বড় প্রমাণ কলকাতা। প্রতিদিন শেষ রাত থেকে ইলেকট্রিক ট্রেনে করে আশপাশের মানুষ কলকাতা শহরে আসতে শুরু করে। আবার সন্ধ্যার মধ্যে সেখান থেকে তাদের ফিরতে দেখা যায়। কলকাতায় রাতে মানুষের সংখ্যা থাকে দিনের প্রায় অর্ধেক। দিনের বিভিন্ন সময়ে মানুষ আসে আবার ফিরে যায় শহরের বাইরে নিজ আবাসস্থলে। এটা সম্ভব হয়েছে তাদের ইউনিক যোগাযোগ ও গণপরিবহন ব্যবস্থার কারণেই।

একটি মারাত্মক ব্যাপার হলো ব্যক্তি পর্যায়ে প্লট বরাদ্দ। প্লট বরাদ্দের মাধ্যমে আবাসন সমস্যার সমাধান কোথাও করা যায়নি। পাঁচ কাঠার একটি প্লট বরাদ্দ মানেই প্রায় ১৪টি ফ্ল্যাট বা ১৪টি পরিবারের বাসস্থান তথা ১৪ জনের সম্পদ কুক্ষিগত করছেন একজন ব্যক্তি। প্লট বরাদ্দ মানেই ‘ইস্যু অব পারমিট টু সেল ইট ইন দ্য ব্ল্যাক মার্কেট’। ‘প্লট বরাদ্দের কাগজ’ বরাদ্দ মানেই অনৈতিক কাজ করতে উৎসাহিত করা। অধিকাংশ মানুষ সেটা ডেভেলপারের কাছে কয়েক হাজার গুণ বেশি দামে বিক্রি করছেন। অর্থাৎ এ কাগজটা হচ্ছে ব্ল্যাক মার্কেটিংয়ের একটি নিয়ামক। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তি থেকে প্রায় প্রতিটি মানুষ নিজের অজান্তে এ ব্ল্যাক মার্কেটিংয়ে জড়িয়ে পড়ছে। ব্ল্যাক মার্কেটিংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের তথাকথিত জ্ঞানী-গুণী সুধীজনসহ অনেকে কোনো না কোনোভাবে জড়িত। এ প্লট ব্যবসা বাংলাদেশের জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিদের নিজের অজান্তেই দুর্নীতিগ্রস্ত করে ফেলছে। সরকারের এ প্লট ব্যবসায় সরকারি, আধা সরকারি, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারী তথা সমাজের জ্ঞানী-গুণী, সুধীজনের এক বিরাট অংশ উল্লিখিত ‘কালোবাজারির’ সঙ্গে সরাসরি জড়িত। যদিও তাদের দৃষ্টিতে ট্রেন বা বাসের ১০০ টাকার টিকিট ১১০ টাকায় বিক্রি করা লোকটি হচ্ছে প্রকৃত কালোবাজারি। তাদের দৃষ্টিতে এই ‘প্রকৃত কালোবাজারি’দের কারণে দেশ হয়ে গেছে বসবাসের অনুপযুক্ত! বাংলাদেশ সরকার বলেছে, ২০২১ সালের মধ্যে আমরা সবার জন্য আবাসন গড়ব। যদি হয় জনে জনে প্লট বরাদ্দ করে আবাসন সমস্যার সমাধান, তবে ১৬ কোটি লোকের জন্য বঙ্গোপসাগর ভরাট করা ছাড়া কোনো উপায় নেই।

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে বিঘাপ্রতি অতি স্বল্পমূল্যে ব্যক্তিবিশেষকে সরকারি জমি দীর্ঘমেয়াদি লিজ দেওয়া হয়ে থাকে। অথচ এ জায়গাগুলোয় হাউজিং প্রকল্প বাস্তবায়ন করা গেলে মানুষ অনেক কম দামে ফ্ল্যাট কিনতে পারত। ঢাকায় বাড়ি বানানোর খরচ বাড়েনি, কিন্তু এর দাম বেড়েছে। অথচ মফস্বলের চেয়ে ঢাকায় বাড়ি বানানোর সামগ্রী অনেক সহজলভ্য। কিন্তু জমির মূল্য বেশি হওয়ায় ফ্ল্যাটের দাম ঢাকায় আকাশচুম্বী। প্রত্যেকটি জেলায় থাকা সরকারের খাসজমি নিয়ে মাস্টার প্ল্যান করতে হবে। এসব শহর থেকে যেসব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী দেশের বিভিন্ন এলাকায় কাজ করছেন, তাদের জন্য এখনই অ্যাপার্টমেন্ট বরাদ্দ করা সম্ভব। এতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনৈতিক কার্যকলাপ ভীষণভাবে হ্রাস পাবে। যেদিন তারা অবসর নেবেন, সেদিন তাদের হাতে অ্যাপার্টমেন্টের চাবি তুলে দেওয়া যেতে পারে। তাদের বেতন থেকে নিয়মিত অর্থ নিয়েই এ ফ্ল্যাটগুলো নির্মাণ করা সম্ভব। সিঙ্গাপুরে এভাবেই কাজগুলো হয়েছে। সত্তর দশক থেকেই দেশটিতে প্রত্যেকের জন্য ফ্ল্যাটের ব্যবস্থা করার কাজ শুরু হয়। এখন সেখানে উদ্বৃত্ত বাড়িঘর। দেশের বাইরে থেকে মানুষ গিয়ে এখন সেগুলো কিনছে। আমরা চাইলেই সারা দেশ নিয়ে সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে সেটা করতে পারি। আশ্চর্য লাগে যখন দেখি হাউজিং অ্যান্ড সেটেলমেন্ট অথরিটি প্লট ও ফ্ল্যাট বিক্রি করছে, আবার রাজউকও প্লট-ফ্ল্যাট বিক্রি করছে, রাস্তাঘাট, ফ্লাইওভার বানাচ্ছে। এখানে প্রশ্ন জাগে, তাহলে সিটি করপোরেশন কী করছে? সিটি করপোরেশন সরাসরি জনগণের প্রতিনিধি দ্বারা তৈরি ও পরিচালিত। মেয়র হচ্ছেন ‘নগরপিতা’, কিন্তু বাস্তবে ঢাকা শহরের পিতা রয়েছে ৫০ জনের বেশি তথা প্রায় ৫০টি প্রতিষ্ঠান, যারা বিভিন্ন স্বাধীন মন্ত্রণালয়ের অধীনে। সন্তান এক (বর্তমানে দুই) পিতা অগণিত। স্বাধীন ক্ষমতাসহ নির্বাচিত ‘নগরপিতার’ কোনো কর্তৃত্বই নেই তাদের ওপর। বিশ্বের সবখানে মেয়রের আওতায় নগর পুলিশ, ট্রাফিক, পরিবহন, রাস্তাঘাট, হাউজিং, বিদ্যুৎ, পয়ঃপ্রণালি, পানি সরবরাহ প্রভৃতি কার্যক্রম পরিচালিত হয়। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে মেয়র তথা নগরপিতা জবাবদিহিসহ দেখভাল করেন। কিন্তু বাংলাদেশে তার কাজটা করে সমন্বয়হীনভাবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীন স্বাধীন কর্তৃপক্ষ। বহু পিতার এক সন্তানের করুণ অবস্থা ঢাকাবাসীর। ঢাকা শহরের উন্নয়নের দায়-দায়িত্বের পাশাপাশি নকশা অনুমোদন ও নির্মাণ তদারকির দায়িত্ব রাজউককে দেওয়া হয়েছে। রাজউক একই সঙ্গে বিচারক এবং যে বিষয়ের বিচার করছে সে কাজটি তারা নিজেরাই করছে। তারা নিজেরাই বিল্ডিং বানাচ্ছে ও তা বিক্রি করছে, জমি অধিগ্রহণ করছে, জমি বিক্রি করছে আবার অন্যের ভবন নির্মাণ অনুমোদন এবং নির্মাণকাজ ঠিক আছে কিনা, সেটাও দেখছে। এখন কেবল টিসিবির মতো আমদানি-রপ্তানিকারকের দায়িত্ব পালন বাকি। বিশ্বের কোথাও বিচারক যে বিষয়ের বিচার করে, সে কাজ কিংবা ব্যবসার সঙ্গে নিজে জড়িত থাকে না। রাজউক ভবন, ব্রিজ, ফ্লাইওভার, রাস্তা নির্মাণ করছে; জলাশয় ভরাট করে প্লট বানাচ্ছে তাদের দায়িত্ব এ কাজটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হোক। ঢাকা শহরের জন্য জরুরি ভিত্তিতে নির্মাণ-সংক্রান্ত আলাদা একটি শক্তিশালী রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হবে। এ প্রতিষ্ঠানের প্রধান হবেন নির্বাচন কমিশনারের মতো কেউ, যিনি রাষ্ট্রপতির কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন অর্থাৎ এটা স্বয়ংসম্পূর্ণ ও স্বাধীন একটি প্রতিষ্ঠান হবে। ঢাকা শহরের বিনির্মাণ-সংক্রান্ত সবকিছু এর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনতে হবে।

ঢাকা তথা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে হ-য-ব-র-ল অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা ছাড়া বিকল্প নেই। স্বাধীনতা আমাদের স্বপ্নের দুয়ার খুলে দিয়েছে। শুধু সঠিক নেতৃত্বের মাধ্যমে আমাদের স্বপ্নগুলো বাস্তবে রূপ দিতে পারি। স্বাধীনতা এনেছি নয় মাসে, অবশ্য অবশ্যই ছয় মাসেই উপযুক্ত নেতৃত্বের মাধ্যমে স্বপ্নগুলোর বাস্তবায়নের ছোঁয়া লাগাতে পারি আমরা।

লেখক : নগরবিদ।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow