Bangladesh Pratidin

ঢাকা, সোমবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১০ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:৩৩
মুক্তিযোদ্ধা মোয়াজ্জেম হোসেন খানের জানাজা থেকে ফিরে
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম
মুক্তিযোদ্ধা মোয়াজ্জেম হোসেন খানের জানাজা থেকে ফিরে

আজ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার বিজয়া দশমী। আমি বিজয়ার শারদীয় শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি। তাদের জীবন মঙ্গলময়, নিরাপদ হোক।

লতিফ ভাই একবার কলম না তুলে ৩০ পৃষ্ঠা লেখেন। আমি ৩০ বার দেখে ১০ পৃষ্ঠাও পাঠকের সামনে দিতে পারি না। লেখাটায় শেষবারের মতো চোখ বুলাচ্ছিলাম। খবর পেলাম মোয়াজ্জেম হোসেন খান আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মুক্তিযোদ্ধা অনেকেই কিন্তু ঘাটাইলের মোয়াজ্জেম হোসেন খানের মতো মুক্তিযোদ্ধা তেমন বেশি ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ৮-১০ বার নদীপথে ভারতে গেছেন। ফিরেছেন অস্ত্র নিয়ে, যোদ্ধা নিয়ে। সর্বশেষ স্বাধীনতা নিয়ে। মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা ভারতে যেত তাদের বলা হতো ওপার গেছেন। ওপার থেকে মোয়াজ্জেম হোসেন বার বার এপার আসতেন। কিন্তু এবার যেখানে গেলেন সেখান থেকে আর কেউ আসে না। মোয়াজ্জেম হোসেন খানকে নিয়ে আগামী পর্বে লিখব। না লিখলে অকৃতজ্ঞতা হবে। আল্লাহ তার ভুলত্রুটি ক্ষমা করে বেহেশতবাসী করুন।

কয়েক বছর আগে এক হরতালে পুরান ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে বিশ্বজিৎ দাসকে কুপিয়ে হত্যার দিন থেকে আমার মনে হচ্ছিল শুধু হত্যাকারীরাই কি অপরাধী? একজন মানুুষকে প্রকাশ্য দিবালোকে যখন কুপিয়ে হত্যা করা হচ্ছিল তখন যারা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে, বর্বরতা ঠেকাতে এগিয়ে যায়নি; তারাও কি অপরাধী নয়? তাই বলেছিলাম, যারা খুন করেছে তারা তো অপরাধী, কিন্তু যে পুলিশ ডিউটিতে ছিল, যে ম্যাজিস্ট্রেট শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে ছিল তারা অপরাধী নয়? একটা বা দুইটা ফাঁকা গুলি করলে বিশ্বজিৎ প্রাণে বেঁচে যেত। মুক্তিযুদ্ধের সময় সখীপুর স্কুলমাঠে দাইমার সামছুকে যেমন ফাঁকা গুলি করে মুক্তিবাহিনীতে নিয়েছিলাম। বিশ্বজিৎকে কোপাতে থাকা দুষ্কৃতকারীদের আশপাশের কার্নিশে একটা-দুটা গুলি ছুড়লে কেউ মরত না। বিশ্বজিৎ বাঁচত। আল্লাহ পবিত্র কোরআনে সূরা মায়েদার ৩২ আয়াতে বলেছেন, ‘হত্যা এবং সমাজে কোনো ফেসাদ সৃষ্টি ছাড়া কেউ যদি কাউকে হত্যা করে সে যেন সারা মানব জাহানকে হত্যা করল। আবার একজনের জীবন যদি কেউ রক্ষা করে তাহলে সারা মানব জাহানকে সে রক্ষা করল।’ এ সুযোগটা সেদিন কর্তব্যরতরা নেয়নি। আশপাশে যারা ছিল তারা নেয়নি। ১০ জন মানুষ যদি ‘এই কী কর কী কর’ বলে চিৎকার করে এগিয়ে যেত তাহলে হত্যাকারীদের চাপাতি থেমে যেত। বিশ্বজিৎ দাস প্রাণে বাঁচত। ইদানীং কোনো হত্যাকারীর বিচার হয় না, প্রায় সব হত্যাকে রাজনৈতিক রং দেওয়ায় সমাজ লাগামহীন, বিশৃঙ্খল হয়ে পড়েছে। সিলেটের শিশু রাজনকে অত্যাচার করে হত্যা করা হয়েছে। কয়েকজন নির্দয় পশু মোবাইলে ভিডিও করেছে। কিন্তু তাকে রক্ষা করার চেষ্টা করেনি। খুলনায় গ্যারেজে কাজের ছেলের পায়ুপথে কমপ্রেসারের বায়ু দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এসব লাগামহীন হত্যার শেষ কোথায়?

কত দেব-দেবী, যোগী-ঋষি, অবতারের দেশ ভারত। কদিন আগে দিল্লির রাজপথে এক মেয়েকে কোপাচ্ছে, আশপাশ দিয়ে লোক যাচ্ছে। তার আর্তচিৎকারে কেউ সাড়া দিচ্ছে না। ঠিক একই রকম ঘটনা খাদিজাকে নিয়ে। পরীক্ষা দিয়ে সবে বেরিয়েছে। এক ছাত্রলীগ নেতা কীভাবে প্রকাশ্যে তাকে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করেছে। কেউ কেউ ভিডিও করেছে কিন্তু তাকে বাঁচাতে চেষ্টা করেনি। মনে হয় কাউকে প্রাণ বাঁচানোর চেয়ে ভিডিও করাই বেশি দরকার। এ কি মানবতা? শেষ পর্যন্ত আমার প্রিয় ভগ্নি জননেত্রী শেখ হাসিনা সংসদে বলেছেন, শুধু দুষ্কৃতকারী আক্রমণকারীর বিচার হবে না, যারা আকার বিকার না করে প্রতিবাদ না করে ছবি তুলেছে প্রতিরোধ করেনি; তাদেরও বিচার হবে। তিনি বলেছেন, ১০ জন ধাওয়া দিলে ওভাবে কোপাতে পারত? একটা ইট ছুড়লে আক্রমণকারী কোথায় ছুটে পালাত। আমি প্রধানমন্ত্রীকে ভালো করে জানি না কিন্তু জননেত্রী শেখ হাসিনা ছিলেন একজন সোনার মানুষ। তার মধ্যে মায়া-মমতা, আতিথেয়তা যখন জাগে তখন তিনি আর প্রধানমন্ত্রী থাকেন না, তখন তিনি হয়ে যান মানবতাবাদী। তার আশপাশের অনেক দানবের জ্বালায় কখনো কখনো মানব থাকেন না। সেদিন সংসদে তার মানবীয় ভাষণ বাস্তবায়ন হলে দেশের অর্ধেক হানাহানি আপনাআপনি বন্ধ হয়ে যাবে। তবে তার দলের যেসব নেতানেত্রী মুমূর্ষু খাদিজাকে দেখতে গিয়ে সেলফি তোলেন তাদের মতো অপদার্থ-অসভ্য থাকলে সর্বনাশ। আমি এখনো হাঁটাচলা করা একজন সুস্থ মানুষ কোনোখানে দাঁড়ালে সবার আগে ছুটে আসে সেলফি তুলতে। সেলফি আমি পছন্দ করি না, ঘৃণা করি। এই প্রযুক্তি যে আবিষ্কার করেছে সে সভ্য বিশ্বে একদিন না একদিন অসভ্যের খেতাব পাবে। নিশ্চয়ই প্রয়োজনে ছবি তোলা হবে, তবে সেলফি কেন? যার ছবি তোলার কেউ নেই সেই অসহায় নিজের ছবি নিজে তোলে। কিন্তু দায়িত্বশীল নেতানেত্রী হয়েও এমন মুমূর্ষু রোগীর পাশে সেলফি তোলা মানে তাদের কোনো বোধশক্তি, মনুষ্যত্ব নেই।

 

 

৬ তারিখ বারান্দায় বসে পেপার পড়ছিলাম। বারান্দায় বসলেই মায়ের সান্নিধ্য পাই। বারান্দা ঘেঁষে তার হাতে বোনা দুটি নারিকেল গাছের পাতা যখন ঝিরঝির মিরমির করে দোলে তখন মনে হয় মা যেন আমার গায় হাত বোলাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে ১৬ বছর নির্বাসনে কাটিয়ে দেশে ফিরে বারান্দায় বসলে প্রতিদিন আমার একই অনুভূতি হয় যা মা থাকতেও হতো এখনো হয়। সেদিনও তেমনটা হয়েছিল। আমার স্ত্রী নাসরীন প্রতিদিন আমার সঙ্গে পত্রিকা পড়ে। সেদিনও পত্রিকা খুলেই খাদিজার ওপর নির্মম আঘাতের ছবি দেখে তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে। আমার প্রিয় বোন জননেত্রী শেখ হাসিনা সংসদে যা বলেছেন, ঠিক একইভাবে প্রিয় পত্নী বলে উঠেছিল, ‘এগুলো মানুষ! একটা মানুষকে মারছে প্রতিবাদ না করে বাধা না দিয়ে কী আরামে ছবি তুলছে? আক্রমণকারীর আগে নির্বিকার দাঁড়িয়ে থাকা ছবি তোলাদের বিচার হওয়া উচিত।’ কোনো স্ত্রী যদি স্বামীর অনুভূতিকে সমর্থন করে তাহলে তার চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কিছু হয় না। শুধু স্ত্রী নয়, ক্ষমতাবান প্রিয় বোনও একই অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন। অনেক দিন এতটা মনের জোর পাইনি। আমার প্রিয় বোন এবং স্ত্রীর সেদিনের অনুভূতি আমাকে দারুণ উজ্জীবিত ও শক্তিশালী করেছে।

একসময় নাসরীন আমার যোগ্য ছিল না। তারও আগে আমি তার যোগ্য ছিলাম না। বিয়ের পর নাসরীনকে নিয়ে আমার অন্তর্জ্বালার শেষ ছিল না। ভীষণ হতাশ এবং ক্ষুব্ধ ছিলাম। ছোটবেলা থেকেই মদ, গাঁজা, ভাং, বিড়ি, সিগারেট খাওয়ার দোষ ছিল না। মেয়েদের আগে-পাছে ঘোরার আগ্রহ ছিল না। যৌবনে আমার ভালোবাসা ছিল বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ, মা-মাটি-মানুষ। দীপ যখন এলো নাসরীন ওকে ভালোভাবে কোলেপিঠে নিত না। খাওয়া-দাওয়া, গোসলে ছিল অবহেলা। কুঁড়ির ক্ষেত্রেও তাই। সন্তান কোনো মার কাপড়ের ভাঁজ ভাঙলে মায়ের সঙ্গে জড়াজড়ি করলে বিরক্ত হয় অমন মা আমি কখনো দেখিনি। কেন যেন নাসরীন তেমনটাই ছিল। অথচ আমার মা ছিলেন বিপরীত। আমাদের জন্য কত কষ্ট কত নির্যাতন সহ্য করেছেন। সন্তানের জন্য কাপড়-চোপড়-শাড়ি, কি হাত পা কেটে গেলে বা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও উহ্-আহ্ করতেন না। আমরা সেভাবেই বড় হয়েছি। তাই নিজের পেটের সন্তানদের তাচ্ছিল্যে আমার দম বেরিয়ে যেতে চাইত। আমার বুকের জ্বালা নাসরীন বুঝত না। এজন্য দু-চার বার শক্ত মন্দও যে বলিনি তা নয়। একবার মা ডেকে বলেছিলেন, ‘বজ, জানিস নাসরীন যমজ। সঙ্গের জন মারা গেছে। ওর তো কিছু দুর্বলতা থাকবেই। তুই বড় হয়েছিস তোর দায়িত্ব অনেক। নাসরীনের দুর্বলতা তুই কাটাতে না পারলে বড় কিসের?’ মায়ের কথা মনে রাখতাম তবুও কখনো কখনো পেরে উঠতাম না। কিন্তু মার মৃত্যুর দেড়-দুই বছর পর কুশিমণি যখন এলো আমি শুধু মার প্রতিবিম্বই পাইনি, আমার স্ত্রীও পরিপূর্ণ মা হয়েছে। জীবনে কখনো তেমন কামুক ছিলাম না। তাই স্ত্রীকে মানুষের মর্যাদা দিতে চেষ্টা করেছি। আমার কুশিমণি এলে সে যেমন সন্তানের মা হয়েছে তেমনই আমার অন্তরে মায়ের মর্যাদায় আসীন হয়েছে। আজ মা আর তার মধ্যে তেমন পার্থক্য খুঁজে পাই না।

হিন্দু সম্প্রদায়ের এক মহামানব রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব যখন অনেকটাই অবতারের রূপে উঠে এসেছিলেন তখন তার স্ত্রী সারদা দক্ষিণেশ্বরে আসেন। তাকে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব মা-রূপে পূজা করেছিলেন এবং এখনো তাকে মা সারদা হিসেবেই আখ্যায়িত করা হয়। মানুষরূপী অমন অবতার হিন্দুশাস্ত্রে দ্বিতীয় কেউ নেই। আমার স্ত্রীও ইদানীং আমার কাছে প্রায় তেমন একটি আসনে আসীন হয়েছেন।

৭ অক্টোবর শত নাগরিকের রামপালে তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের দাবির এক সভায় গিয়েছিলাম। সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরী প্রধান অতিথি এবং প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ এমাজউদ্দীন আহমদ সভাপতি ছিলেন। সভাটিতে যাওয়ার জন্য প্রথম আবদুল হাই শিকদার অনুরোধ করেছিলেন। আবদুল হাই শিকদারকে ছোট ভাইয়ের মতোই ভালোবাসি। দু-এক জায়গায় দেখেছি আওয়ামী লীগ এবং বঙ্গবন্ধুর প্রতি তার মারাত্মক বিদ্বেষ। হুজুর মওলানা ভাসানীর মৃত্যুবার্ষিকীতে আমার বাড়িতে কয়েকবার খেয়েছেন। কিছু সময় ওঠাবসা করে বুদ্ধিমান মানুষ বুঝেছেন আওয়ামী লীগ আর বঙ্গবন্ধু এক নন। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে অযৌক্তিক কথা বললে আমার ছায়া মাড়াতে পারবেন না। তাই তিনি অনেক সংযত হয়েছেন এবং বুঝতেও চেষ্টা করছেন কতটা কী করা উচিত। শুধু হাই শিকদারের আহ্বানে যেতাম কিনা বলতে পারব না। যাকে পিতার মতো সম্মান করি সেই অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদের ফোনের পর আর না গিয়ে উপায় ছিল না। আমিও একসময় নেতাজি সুভাষ বোসের ভক্ত-অনুরক্ত ছিলাম বলে মহাত্মাজিকে পছন্দ করতাম না, অনেকটা পণ্ডিতজিকেও না। বল্লভ ভাই প্যাটেলকে তো একদম না। কিন্তু তাদের সম্পর্কে দিনের পর দিন মাসের পর মাস বছরের পর বছর এমনকি কয়েক যুগ লেখাপড়া করে বুঝতে পেরেছি তারা তাদের দিক থেকে সবাই সঠিক এবং তাদের একজনকে অপমান করে আরেকজনকে সম্মান নয়, সবাইকে যথাযথ সম্মান করা উচিত।

সভা শুরুর আগে এমাজউদ্দীন স্যারের পাশে দর্শক সারিতে বসে ছিলাম। সরাসরি পেছনে একজন ফোন ধরেই বললেন, ‘আমি জাতীয়তাবাদী— শেখ হাসিনা মিথ্যাবাদী’। কথাটা কানে আসতেই বুকের ভিতর চিড়িক দিয়ে উঠেছিল। বছর ১০-১২ আগে রাজমণি ঈশা খাঁর সামনে দুটি মহিলা হকার জননেত্রী শেখ হাসিনা এবং বেগম খালেদা জিয়া সম্পর্কে অকারণ জঘন্য গালি দিয়েছিল। কী অদ্ভুত। দুই দলের প্রতিহিংসা কতদূর অসহনীয় হয়ে উঠেছে। প্রয়োজনহীন গা চুলকে ঘা করার মতো। একটা দেশের প্রধানমন্ত্রী জাতির জনকের কন্যা অকারণ তাকে মিথ্যাবাদী বলার কোনো মানে হয়? সম্পর্কের কত অবনতি ঘটলে কেউ অমনটা করে। তাই বক্তৃতার মধ্যেও কিছুটা রেষ ছিল। আমার বুক জ্বলছিল। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার অনেক সমালোচনা করতে পারি। বোন হিসেবে মায়ের মতো যত্ন করেছেন সেটা ভুলি কী করে? মানুষ হিসেবে আমি তাকে মা বলেই মনে করি। আজীবন মনে করব। রাজনৈতিকভাবে দেশের সব থেকে বড় দুটি দলে সম্পর্কের এতটা অবনতি কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাই দুটি কথা জোর দিয়ে বলার চেষ্টা করেছি। একটি আমরা বিদ্যুৎ চাই, পরিবেশের যতটা সম্ভব দূষণ কমিয়ে। আমরা অন্ধকারে থাকতে রাজি আছি কিন্তু সুন্দরবন ধ্বংস করে আলো চাই না। আরেকটি স্বাধীনতাযুদ্ধে সাহায্য করার জন্য ভারতীয় সৈন্যের রক্তদানের জন্য আমরা ঋণী। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, আমাদের সঙ্গে এখন বড় ভাইয়ের মতো মাতাব্বরি করতে হবে। তাদের হুকুমে চলতে হবে। আমাদের বাজার হিসেবে ব্যবহার করবে। জ্ঞানের অজ্ঞতার কারণে কোনো ভারতীয় মন্ত্রী বলবেন, রাম লঙ্কা জয় করে বিভীষণকে দান করেছিলেন। আর ভারত বাংলাদেশ জয় করে আওয়ামী লীগকে দান করেছে। এ যে কী ঔদ্ধত্য, কতটা জঘন্য বোঝানো যাবে না। এতে যে ভারতের মহানুভবতা, ভারতের মহত্ত্ব ম্লান হয়ে যায় তা বোধহয় ভদ্রলোক বা ভদ্রলোকেরা মুহূর্তের জন্যও চিন্তা করেননি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা কারও দয়ার দান নয়। এটা লাখ লাখ বাঙালির রক্তে অর্জিত। ’৪৮ থেকে ’৬৫ পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের বেশ কয়েকটি যুদ্ধ হয়েছে। কোনো যুদ্ধে ভারত জেতেনি। পাকিস্তান জিতেছে তাও বলা যাবে না। বরং পরাজয় হয়েছে উভয় দেশের। উভয় দেশের নাগরিকদের কষ্ট বেড়েছে। ’৬২-তে চীনের সঙ্গে ভারত পরাজিত হয়েছিল। যে কারণে ভালো মানুষ চীনের বন্ধু পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু দারুণ মানসিক আঘাতে মারা গেছেন। একমাত্র বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত নিরঙ্কুশ জয়ের অহংকার করতে পারে। সেটা তো মুক্তিযোদ্ধাদের বাদ দিয়ে নয়। আমাদের রক্ত বাদ দিয়ে নয়। মুক্তিযুদ্ধের আগে বহির্বিশ্বে ভারতের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা কী ছিল তা কারও অজানা নয়। বাংলাদেশে ভারতের প্রথম হাইকমিশনার সুবিমল দত্ত। টাঙ্গাইল বিন্দুবাসিনী স্কুলের ছাত্র। উপ-রাষ্ট্রদূত ছিলেন জে এন দীক্ষিত। তারপর হাইকমিশনার হয়ে আসেন প্রবীণ কূটনীতিক একসময় জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি সমর সেন। তিনি নিজে আমাকে বেশ কয়েকবার বলেছেন, ‘টাইগার! বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের আগে আমাদের ফোন কেউ ধরত না, সাক্ষাৎ দিত না তারা এখন মধ্যরাতে ডেকে কথা কয়।’ তাই বলেছি ভারতের রক্তদান, মুক্তিযুদ্ধে তাদের সহায়তা আমরা মাথায় রাখি। কিন্তু আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়ে আমাদের রক্তস্নাত ভূখণ্ডে যুদ্ধ করার সুযোগ পেয়ে তারা যে সারা বিশ্বে বিজয়ীর মর্যাদা পেয়েছে, সম্মান পেয়েছে তার জন্য আমাদের কি কোনো অবদান নেই? তাই শত নাগরিকের মঞ্চে বলেছি বা বলার চেষ্টা করেছি, স্বাধীন দেশে বাস করে যারা বঙ্গবন্ধুর ন্যক্কারজনক সমালোচনা করেন তাদের মতো আমাদের স্বাধীনতার জন্য যারা বহির্বিশ্বে এত দুর্লভ মর্যাদা পেয়েছে তারা শতবর্ষ বাঙালির পা ধুয়ে পানি খেলেও ঋণ শোধ হবে কিনা জানি না। আমার কাছে এমনিতেই ভারত প্রিয়। কারণ আমার যৌবন কেটেছে সেখানে। তার পরও বাস্তব সত্য বলছি, আমরাই শুধু ভারতের কাছে ঋণী, ভারত আমাদের কাছে ঋণী নয়? তা কি হয়?

প্রিয় ভগ্নির সেদিন সংসদে সমাপনী ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়েই কথাগুলো বললাম। আমি যা নিয়ে ১০ বছর ধরে চিৎকার করছি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সেদিন সংসদে সে কথাই বলায় গর্বে বুক ভরে গেছে। তাই বলছি পরপর দুটি শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর ডাক্তাররা তাদের মৃত ঘোষণা করলেন। অথচ তারা দুজনই একজন কবরের কাছে আরেকজন মায়ের পাশে কেঁদে ওঠে। এটা যে চিকিৎসকদের কত অপমান অযোগ্যতা-অদক্ষতার প্রমাণ, সারা দুনিয়া খুঁজলে দ্বিতীয়টা পাওয়া যাবে না। যারা শিশুদের মৃত ঘোষণা করেছিলেন তাদের তিন চৌদ্দ বিয়াল্লিশবার ফাঁসি দিলেও প্রকৃত শাস্তি হবে না। প্রিয় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে একসময় যুবলীগ করেছি। মনসুর ভাইয়ের ছেলে তিনি। পা থেকে মাথা পর্যন্ত রাজনীতিক। এ ব্যাপারে তার এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঠিক পদক্ষেপ বা ভূমিকা প্রত্যাশা করছি।

লেখক : রাজনীতিক।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow