Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শুক্রবার, ১৮ আগস্ট, ২০১৭

ঢাকা, শুক্রবার, ১৮ আগস্ট, ২০১৭
প্রকাশ : রবিবার, ১২ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ১১ মার্চ, ২০১৭ ২২:২৮
দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স
প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি কমাতে কঠোর দুদক চেয়ারম্যান । বিভিন্ন খাত চিহ্নিত করে চলছে ফাঁদ অভিযান
সাঈদুর রহমান রিমন
দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স

প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন—দুদক। সরকারের ১৭টি খাত চিহ্নিত করে দুদক ফাঁদ পেতে অভিযান শুরু করেছে।

সূত্রগুলোর মতে, ব্যক্তি পর্যায়ের লুটপাট ও দখলবাজির মচ্ছবকে হার মানিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি চরম আকার ধারণ করেছে। অতিলোভী কর্মকর্তা-কর্মচারীর অব্যাহত লুটপাটে সরকারি একেকটি প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছে দুর্নীতির আখড়া। জনসেবা দেওয়ার কাজে দায়বদ্ধ সংস্থাগুলো এখন জনহয়রানির কেন্দ্রবিন্দু। নানা কায়দা-কৌশলে জনগণের টাকা হাতিয়ে নিয়েই তারা ক্ষান্ত হয় না, উপরন্তু হয়রানির বেড়াজালে আটকে রাখা হচ্ছে। মন্ত্রী-এমপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েও দুর্নীতির পাগলা ঘোড়া থামানো যাচ্ছে না। নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকেও। সরকারি সব সেক্টরেই নিয়োগ, বদলি, পোস্টিং— প্রতিটি ক্ষেত্রেই ঘুষ-দুর্নীতি, লুটপাট এখন খোলামেলা ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সারা দেশে পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগের ক্ষেত্রে মাথাপিছু ৩-৪ লাখ টাকা ঘুষ দেওয়ার ঘটনা ঘটে। সাব-ইন্সপেক্টর পর্যায়ে নিয়োগ পেতে খরচ করতে হয়েছে ৭-৮ লাখ টাকা পর্যন্ত। শুধু নিয়োগ নয়, লোভনীয় স্থানে পোস্টিং পাওয়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে আলাদা রেট। সাব-রেজিস্ট্রার বদলি-পোস্টিংয়ের ক্ষেত্রে কোটি টাকা লেনদেনের অবিশ্বাস্য ঘটনাও জানা গেছে। দেশের যে কোনো এলাকা থেকে রাজধানীর তেজগাঁও, চট্টগ্রাম, পটিয়া, কক্সবাজার, নোয়াখালী, সাভারসহ ২০টি স্থানে সাব-রেজিস্ট্রারের পোস্টিং রেট এখন কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। উপজেলা ভূমি কর্মকর্তা, কানুনগো, সার্ভেয়ার থেকে শুরু করে গ্রামীণ পর্যায়ের তহসিল অফিসও ঘুষ-দুর্নীতির আখড়া হয়ে উঠেছে। রাজধানীর সেবা খাত বিশেষ করে সিটি করপোরেশন, গ্যাস, বিদ্যুৎ, ওয়াসার প্রতিটি কর্মকাণ্ডের ধাপে ধাপে শুধু দুর্নীতির ছড়াছড়ি। সরকারি চাকরি থেকে অবসরে যাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ১৭ খাতে ঘুষ না দিয়ে পেনশন পাওয়ার কোনো উপায় নেই। সরকারি সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানসমূহে আরও ন্যক্কারজনকভাবে ঘুষ প্রচলিত রয়েছে। সেখানে সেবাগ্রহীতাকে পদে পদে যেমন ঘুষ দিতে হয় তেমনি সেবামূলক কোনো কর্মকাণ্ড চালাতে গেলেও ঠিকাদাররা ঘুষ-দুর্নীতির ধকলে চরম বিপাকে পড়েন। সূত্রমতে, বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি কোনো পর্যায়েই দুর্নীতি বন্ধ নেই। খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা সব ক্ষেত্রেই শুধু দুর্নীতি আর দুর্নীতি। দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ থেকে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও রেহাই পাচ্ছে না। সরকারি জনগুরুত্বপূর্ণ ১১টি খাতের দুর্নীতি অনুসন্ধানে দুর্নীতি দমন কমিশন—দুদকের গঠিত ১১টি প্রাতিষ্ঠানিক টিমের কার্যক্রমে স্থবিরতা কাটানোর জন্য কাজ চলছে। কমিশনের ‘বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত-২’ অনুবিভাগে গঠিত প্রাতিষ্ঠানিক ১১টি টিম রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতর, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, সড়ক ও জনপথ (সওজ), স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি), বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), আবাসন অধিদফতর, বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) কমিশনের পৃথক টিম কাজ করে। এ টিমগুলোর গতি বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। দুদকের লক্ষ্য প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স। দুদক চেয়ারম্যান এরই মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। অভিযান চলছে দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানে।

স্বাস্থ্য খাতের ১৭ প্রতিষ্ঠান : স্বাস্থ্য সেক্টরের তৃণমূল পর্যায় থেকে সর্বোচ্চ পর্যন্ত টাকা লেনদেন রীতিমতো বৈধতা পেতে বসেছে। সেখানে রাখঢাকের কোনো বালাই নেই। স্বাস্থ্য শিক্ষা তথা মেডিকেল কলেজ, ডেন্টাল কলেজ, নার্সিং ইনস্টিটিউটে শিক্ষার্থীদের ভর্তি করা থেকে শুরু করে হাসপাতালে রোগী ভর্তি, অ্যাম্বুলেন্স বরাদ্দ, সার্টিফিকেট প্রদান এমনকি রোগীর লাশ ছাড় প্রদানের ক্ষেত্রেও চাহিদামাফিক টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। স্বাস্থ্য সেক্টরে নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি, বিদেশে বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণের অনুমোদন পেতেও মোটা অঙ্কের টাকা লাগে। স্বাস্থ্য খাতের সব ইউনিটেই কেনাকাটাসহ টেন্ডারকাজে লুটপাট চালানোর এন্তার অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে বৃহদাকারে হরিলুটের ঘটনায় ৮টি হাসপাতালের দুর্নীতি অনুসন্ধানে নেমে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পসমূহের নথিপত্র চেয়ে পাঠিয়েছে দুদক। মুগদা ৫০০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে যন্ত্রপাতি সরবরাহে ৪০০ কোটি টাকার টেন্ডারের কাগজপত্র, নোয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি সরবরাহসংক্রান্ত বিল-ভাউচার, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ৫০০ কোটি টাকার নথি, গোপালগঞ্জ সদর হাসপাতালের জন্য বরাদ্দকৃত ৪০ কোটি টাকার কাগজপত্র, মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে ৩০ কোটি টাকার কেনাকাটাসংক্রান্ত তথ্য, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৬০ কোটি টাকার দুর্নীতির তথ্য, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১১০ কোটি টাকার দুর্নীতির তথ্য, যন্ত্রাংশ সরবরাহ না করেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল থেকে ২৭ কোটি টাকা তুলে নেওয়ার বিবরণ হস্তগত করেছে দুদক।

দেশের ৯টি বিশেষায়িত হাসপাতালে ৪০০ কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে তথ্য আছে। সারা দেশের জেলা, উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে এই সময়ের দুর্নীতির পরিমাণ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। ক্রয়প্রক্রিয়া সম্পন্নকারী সরকারি প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (সিএমএসডি) কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধেও যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। চাহিদাপত্র না থাকার পরও সংস্থাটি কেন কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কিনেছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ক্রয়প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগে বিশ্বব্যাংকও একটি প্যাকেজের অর্থ ফেরত নিয়েছে। টিআইবির এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ওষুধ প্রশাসনের ১৩টি ঘাটে ঘুষ আদায় করা হচ্ছে।

শিক্ষা ক্ষেত্রের দুর্নীতি সীমাহীন : অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা আর ঘুষ লেনদেনের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য সেক্টরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে শিক্ষা সেক্টর। সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ভর্তি থেকে শুরু করে শিক্ষক নিয়োগ, বদলি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুমোদনপ্রাপ্তি, এমপিওভুক্তিকরণ, শিক্ষকের পেনশন তোলা পর্যন্ত সব ক্ষেত্রে টাকার কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষা ভবনে যে কোনো কাজের জন্য হাজির হলেই যেন রেহাই নেই, টেবিলে টেবিলে টাকা গুনে দিয়ে তবেই শিক্ষকদের নিস্তার মেলে। এসব শিক্ষক নিজ প্রতিষ্ঠানে ফিরে নানা খাতে, ফন্দিফিকিরে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সেই টাকা তুলে নিতে বাধ্য হন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত ফ্যাসিলিটিজ বিভাগ; স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এলজিইডি, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর; সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ভুক্ত সড়ক ও জনপথ অধিদফতর, বিআরটিএ দফতরে সরকারি ফি পরিশোধের আগে ঘুষের টাকা পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক বিধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের টেন্ডার কর্মকাণ্ডে সংঘটিত লুটপাট অন্যসব দফতরকে ছাড়িয়ে গেছে। এ অধিদফতরের দুর্নীতি অনুসন্ধান ও প্রতিরোধে দুদকের প্রাতিষ্ঠানিক টিম শুরু থেকে কাজ করছে। অথচ অনিয়ম আর দুর্নীতির কারণে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ শিক্ষা ক্ষেত্রে লুটপাট-অরাজকতার কথা সবার মুখে মুখে।

এলজিইডির দুর্নীতি : স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরে (এলজিইডি) দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে উন্নয়ন সহযোগী, রাজনৈতিক ও বাস্তবায়নকারী সংস্থার অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব, স্বচ্ছতা, প্রয়োজনীয় কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন জনবল ও তদারকির অভাব, মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ, প্রকল্পে নিরীক্ষা ও মূল্যায়নে অনিয়ম, অস্থিতিশীল বাজার, দীর্ঘসূত্রতা এবং সুশাসনের দুর্বলতার কারণে আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমগ্ন সরকারের অতিগুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠান। টিআইবি (ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ) এলজিইডির অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তিন বছর ধরে চালানো ওই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের সারমর্মে বলা হয়, টেন্ডার কাজ পাওয়া থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত এলজিইডি প্রকৌশলীদের কমপক্ষে শতকরা ৩০ ভাগ ঘুষ দিতে হচ্ছে। এরপর রয়েছে স্থানীয় মস্তান ও প্রভাবশালীদের কমিশন, ঠিকাদারের লাভ— সব মিটিয়ে অতিনিম্নমানের কাজ বাস্তবায়ন হচ্ছে।

ওয়াসায় লুটপাট, দুদকে অভিযোগের পাহাড় : অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাট আর স্বেচ্ছাচারিতার যেন শেষ নেই ঢাকা ওয়াসায়। প্রতিটি প্রকল্পে সীমাহীন ব্যর্থতা, কাজের নামে টেন্ডারবাজি, আবার টেন্ডার ছাড়াই সিন্ডিকেট সদস্যদের কোটি কোটি টাকার ঠিকাদারি প্রদান, কাজ ছাড়াই বিল তুলে ভাগবণ্টন করে নেওয়াসহ হাজারো অভিযোগে জর্জরিত সরকারি এই সংস্থাটি। দুদক ওয়াসার বিভিন্ন খাতে তদন্ত করছে। বেশকিছু অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিচ্ছে।

ব্যাংক ঘিরে লুটপাট চলছেই : সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক-বীমা প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক দুর্নীতি, লুটপাট ও আত্মসাতের ঘটনা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। বিভিন্ন খাতে ঋণদানের নামে ব্যাংক কর্মকর্তা ও লুটেরা চক্র মিলেমিশে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ইদানীং ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতির মাধ্যমেও ব্যাংকগুলো থেকে কোটি কোটি টাকা লুটে নেওয়ার ঘটনা ঘটছে।

up-arrow