Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শনিবার, ১৪ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১৩ এপ্রিল, ২০১৮ ২২:৫১
বিচার হয়নি রমনা বটমূল হামলার
আরাফাত মুন্না ও তুহিন হাওলাদার

রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলার ১৭ বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার শেষ হয়নি এখনো এই ঘটনায় দায়ের করা দুই মামলার মধ্যে চার বছর আগে হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতে রায় দেওয়ার পর বর্তমানে হাই কোর্টে ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিতকরণ) শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে আর নিম্ন আদালতে বিস্ফোরক মামলায় ৮৪ সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ২৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্ভব হয়েছে। অজামিনযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা দিয়েও বাকি সাক্ষীদের হাজির করা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে বিচার শেষ হওয়া নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে সংশ্লিষ্টদের। সুপ্রিম কোর্ট সূত্র বলছে ২০১৪ সালের ২৩ জুন বিচারিক আদালত হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করে। এরপর ডেথ রেফারেন্স এবং আসামিদের জেল আপিল ও ফৌজদারি আপিলের শুনানির জন্য মামলাটি হাই কোর্টে আসে। এর বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি শহিদুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাই কোর্ট বেঞ্চে ডেথ রেফারেন্স শুনানি সমাপনী পর্যায়ে আসার পর এই আদালতের এখতিয়ার পরিবর্তন হয়ে যায়। এরপর মামলাটি পাঠানো হয় হাই কোর্টের বিচারপতি রুহুল কুদ্দুস ও বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তীর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে। এই বেঞ্চে কার্যতালিকায় বর্তমানে মামলাটি শুনানির জন্য রয়েছে।

এ বিষয়ে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. মনিরুজ্জামান রুবেল বলেন, মামলাটির শুনানি নতুনভাবে হবে। শুনানির জন্য কার্যতালিকায় রয়েছে। তাই যে কোনোদিনই চাঞ্চল্যকর এই মামলার শুনানি শুরু হতে পারে।

এদিকে, এই ঘটনায় দায়ের করা বিস্ফোরক আইনের মামলায় আদালত থেকে বার বার সাক্ষীদের হাজিরের নির্দেশ দিলেও তারা আসছেন না। মোট ৮৪ সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ২৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্ভব হয়েছে। এখনো ৫৯ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ বাকি রয়েছে। গত বৃহস্পতিবারও এই মামলার ধার্য তারিখে কোনো সাক্ষী না আসায় নতুন করে সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য দিন ধার্য করেছেন ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন। এর আগে অনেক সাক্ষীকে আদালতে হাজির করাতে অজামিনযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির নির্দেশও দিয়েছিলেন বিচারক। তাতেও কাজ হয়নি।

এ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আবু আবদুল্লাহ ভূইয়া বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, একই ঘটনার হত্যা মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার পর সাক্ষীরা আর আদালতে আসতে চাচ্ছেন না। ব্যক্তিগতভাবে তাদের টেলিফোন করে আদালতে আসতে বললেও তারা ‘দারুণ রকম অনীহা’ প্রকাশ করছেন। তিনি বলেন, এত বছর আগের এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে ৮৪ সাক্ষীর মধ্যে সব মিলে ২৫ জনের সাক্ষ্য নেওয়া সম্ভব হয়েছে। এ বিষয়টি রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আদালতের নজরে আনা হলে বিচারক বাকি সাক্ষীদের হাজির করাতে গ্রেফতারি পরোয়ানা ইস্যুর আদেশ দিয়েছেন। এ সব সাক্ষীর মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশও রয়েছেন। নতুন সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য আগামী ২৬ এপ্রিল দিন ধার্য করেছেন বিচারক।

মামলার নথি সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালের ২৩ জুন ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ রুহুল আমিন বোমা হামলার ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে আটজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্তরা হলো— মুফতি আবদুল হান্নান, মাওলানা আকবর হোসেন, আরিফ হাসান সুমন, মাওলানা তাজউদ্দিন, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, মাওলানা আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার, মাওলানা আবদুল হাই ও মাওলানা শফিকুর রহমান। এ ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রাপ্ত ছয় আসামি হলেন— শাহাদাত উল্লাহ জুয়েল, মাওলানা সাব্বির, শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, মাওলানা আবদুর রউফ, মাওলানা ইয়াহিয়া ও মাওলানা আবু তাহের।

মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রাপ্ত আটজনের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানাও করা হয়েছে রায়ে। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ প্রাপ্তদেরও একই অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

এ মামলায় ১৪ আসামির মধ্যে চারজন শুরু থেকেই পলাতক। বাকি আসামিরা বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছে। এসব আসামির মধ্যে সিলেটে ২০০৪ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলা ও তিনজন নিহত হওয়ার মামলায় গত বছর ১২ এপ্রিল মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে মুফতি হান্নানের। অন্য নয় আসামি কারাগারে রয়েছে। পলাতক আসামিরা হলো— মাওলানা মো. তাজউদ্দিন আহমেদ, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, মুফতি শফিকুর রহমান শফিক ও মুফতি আবদুল হাই।

মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠান ‘ইসলামবিরোধী’ বিবেচনা করে ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল রমনা বটমূলে বর্ষবরণে বোমা হামলা চালানো হয়। হামলায় ঘটনাস্থলেই নয়জনের মৃত্যু হয়। পরে হাসপাতালে মারা যায় একজন। এ ঘটনায় নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ির সার্জেন্ট অমল চন্দ্র ওই দিনই রমনা থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা করেন। ঘটনার প্রায় আট বছর পর ১৪ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। আলোচিত এ মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা বারবার পরিবর্তন, সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল, বারবার তাগিদ দেওয়া সত্ত্বেও তদন্ত কর্মকর্তাদের আদালতে সাক্ষ্য দিতে না আসার কারণে বিচার শুরু হতে দেরি হয়। পর্যায়ক্রমে থানা, ডিবি ও সিআইডি পুলিশে মামলার তদন্তে যায়। মামলার অষ্টম তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক আবু হেনা মো. ইউসুফ ২০০৮ সালের ৩০ নভেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। দুটি মামলারই অভিযোগপত্র একসঙ্গে দাখিল করা হয়। পরে বিচারের জন্য মামলা দুটি ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে যায়। ওই আদালতে একই বছরের ১৬ এপ্রিল পৃথক মামলা দুটিতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেলের সিদ্ধান্তে হত্যা মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৩ এবং বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এ পাঠানো হয়।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow