Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শনিবার, ১১ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১০ নভেম্বর, ২০১৭ ২১:৫৭
আবদুর রহমান চৌধুরী
ড্রোনের সম্ভাবনা নিয়ে বাংলার তরুণ
মাসুদ আনসারী
ড্রোনের সম্ভাবনা নিয়ে বাংলার তরুণ

আবদুর রহমান চৌধুরী। বাবা স্কুলশিক্ষক, মা গৃহিণী। তিন ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় মাসুদ। সিলেটের স্বনামধন্য স্কুল এবং কলেজে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে এখন সিলেটের মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক বিভাগের তৃতীয় বর্ষে পড়ালেখা করছে। খেলাধুলায় খুব একটা পারদর্শী ছিল না বলে ছোটবেলা থেকেই ইলেকট্রিক খেলনা নিয়ে ছিল বেশ আগ্রহ। তাই খুব সহজেই ভিতরের নাট বল্টু সব খুলে ঘাঁটাঘাঁটি করত। যন্ত্রপাতির প্রতি ভালোবাসাটা তখন থেকেই শুরু। পছন্দের বিষয় নিয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে সিলেট মেট্রোপলিটন-এ ভর্তি হন। তবে এখানে ভর্তি হওয়ার পিছনে আরেকটা কারণ হলো, বাংলাদেশের প্রথম ড্রোন নির্মাতা সৈয়দ রেজওয়ানুল হক নাবিল এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং এই ভার্সিটির ছাত্ররাই দেশের প্রথম আনম্যান্ড সাবমেরিন তৈরি করেছিল। তার ইচ্ছা ছিল প্রথম থেকেই পড়ালেখার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রজেক্ট করবে, সে জন্য বন্ধু জীবনকে নিয়ে ভার্সিটির রাজু নামের এক বড় ভাইয়ের সঙ্গে প্রজেক্টে কাজ করা শুরু করে। প্রথম প্রজেক্ট শেষ হওয়ার পর পরিচয় হলো সহপাঠী রুমনের সঙ্গে। তখন ঢাকা থেকে অ্যারোনটিক্যাল এর ওপর কোর্স করে এসেছে রুমন। আবদুর রহমান এবং রুমন প্রথম ড্রোন নির্মাতা নাবিল স্যারের দেওয়া কিছু পুরনো মোটর এবং যন্ত্রপাতি দিয়ে একটা কোয়াডক্টার বানিয়ে স্যারকে দেখালে তিনি বেশ খুশি হন। পরবর্তীতে তাদের সঙ্গে যুক্ত হয় মিথুন। তখন তারা তিনজন মিলে নাবিল স্যারের মেন্টরশিপে কাজ করা শুরু করে। নাবিল স্যারের সুপারভাইজিং তাদের প্রথম প্রজেক্ট ছিল একটা ওয়েদার ইনফরমার ড্রোন। যেটা বিভিন্ন জায়গা থেকে গ্রাউন্ড স্টেশনে লাইভ ডাটা পাঠাতে পারবে। সিএসই বিভাগের আশিক স্যার সেই প্রজেক্টে জড়িত থেকে অনেক কাজ করেছিলেন। এর পরবর্তী প্রজেক্ট ছিল ‘লাইফ সেভিং ড্রোন’, যেটি কোথাও নৌ-দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত সেখানে গিয়ে লাইফ জ্যাকেটসহ বিভন্ন জীবনরক্ষাকারী জিনিস ফেলতে সক্ষম। ২০১৬ সালে (ESAB) কর্তৃক আয়োজিত একটি প্রতিযোগিতায় তাদের ড্রোনগুলো প্রদর্শন করলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তার চোখে পড়ে এবং সেখান থেকে প্রায় ২০০ প্রজেক্টের মধ্যে তাদের দুটি প্রজেক্টসহ কয়েকটি প্রজেক্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রদর্শনের জন্য মনোনীত হয়। যদিও সেখানে যাওয়ার পর তেমন কোনো লাভ হয়নি তাদের! এই ঘটনায় হতাশ না হয়ে পরবর্তীতে তিন সদস্যের ছোট্ট দলটি দেশে এবং বিদেশে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে চ্যাম্পিয়ন হয়। প্রথমবারের মতো দেশের বাইরে ভারতে টেক্ক্রিটি’১৬ এ অংশ নিয়ে তারা প্রথম রাউন্ডে চ্যাম্পিয়ন হয় কিন্তু পরবর্তীতে হঠাৎ কিছু নিয়ম পরিবর্তন হওয়ায় ষষ্ঠ অবস্থান নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয় তাদের। ভারতে আবদুর রহমানের দলটির সাথে পরিচয় হয় নেপালের রোবটিক অ্যাসোসিয়েশনের। পরিচয় হওয়ার পর থেকেই তারা তাদের দেশের জাতীয় সব রোবটিক্স প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানায়। তাদের আমন্ত্রণের রেশ ধরে নেপালে ইয়ান্ত্রা প্রতিযোগিতায় কৃষক কটার বিভাগে অংশগ্রহণ করে চ্যাম্পিয়ন হয়ে গর্বের সাথে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে আসে। এ ছাড়াও ভারতের মুম্বাইতে এবং কানপুরে অনুষ্ঠিত এশিয়ার অন্যতম সেরা দুটি টেক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য নির্বাচিত হয়েও প্রয়োজনীয় ফান্ডের অভাবে অংশগ্রহণ করা হয়ে উঠেনি তাদের। স্মার্ট হোম, ফিক্সড উয়িং প্রকল্পসহ বিভিন্ন প্রজেক্টে কাজ করার পাশাপাশি তাদের টিমের সৌভাগ্য হয়েছে নাবিল স্যারের সঙ্গে বাংলাদেশ আর্মির জন্যও কাজ করার। বেশ কিছুদিন আগে আবদুর রহমান মাল্টিপারপাস ড্রোনের আইডিয়া নাবিল স্যারের সঙ্গে শেয়ার করলে তিনি তা বাস্তবায়নে উৎসাহ দেন। দলের অন্যান্য সদস্যরা ব্যস্ততার কারণে সময় দিতে না পারায় আবদুর রহমান চৌধুরী একাই বাসায় কাজ করা শুরু করে। দীর্ঘদিন কাজ করার পর একটি ড্রোন তৈরি করেন যেটি একই সঙ্গে কৃষক, ফায়ার ব্রিগেড, আবহাওয়া অধিদফতর, সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের কাজে ব্যবহার করা যাবে। ডুয়েটে অনুষ্ঠিত ‘উটঊঞ ঞঊঈঐ ঋঊঝঞ ২০১৭’ এই প্রজেক্ট নিয়ে প্রজেক্ট শোকেস বিভাগে অংশগ্রহণ করে চ্যাম্পিয়ন হয়। এ ছাড়া তাদের প্রজেক্ট রানার আপ হয় বেশ কয়েকবার। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য : রোবলোশন’১৬, টেক্ক্রিটি বাংলাদেশ রাউন্ড’১৭, রোবলোশন’১৭।

এই দলটির সদস্যদের সিলেটের মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নানাভাবে প্রজেক্টে সাহায্য করে। তবে, দেশের বাইরের প্রতিযোগিতার ফান্ড নিয়ে অসুবিধায় পড়তে হয়। তারপরও তাদের স্বপ্ন ‘নাসার রোভার চ্যালেঞ্জ’ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে দেশের সুনাম বৃদ্ধি করার। নিজেদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আবদুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘মাল্টিপারপাস ড্রোন এর মতো দেশের জনসাধারণের কাজে লাগে এমন প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং সেগুলো নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা আমাদের আছে। এবং এই ইচ্ছা বাস্তবায়নে আমাদের কাজ শুরু হয়েছে ইতিমধ্যে।’

এই পাতার আরো খবর
সর্বাধিক পঠিত
up-arrow