Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৩ নভেম্বর, ২০১৭

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৩ নভেম্বর, ২০১৭
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ২১:৫০
মাহতাবুর রহমান নাসির
সুগন্ধি ব্যবসায় বাংলাদেশির বিশ্বজয়
রণক ইকরাম
সুগন্ধি ব্যবসায় বাংলাদেশির বিশ্বজয়

বাংলাদেশে তিনি যতটা পরিচিত, সমাদৃত, বিশ্বব্যাপী তার বিচরণ আরও বেশি। মাহতাবুর রহমান নাসির সুগন্ধি বা পারফিউম ব্যবসায় বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী।

ব্যবসায়ের মূল কেন্দ্র সংযুক্ত আরব আমিরাত হলেও বর্তমানে সেটি ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। আরব আমিরাতে বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাহতাবুর রহমান নাসির পরপর চারবার বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক বাণিজ্যিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব বা সিআইপি নির্বাচিত হয়েছেন। এ ছাড়া তিনি বাংলাদেশে সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা প্রেরণকারী হিসেবে ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ব্যাংক রেমিটেন্স অ্যাওয়ার্ড’ও পেয়েছেন। অতি সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত এই মানুষটির সঙ্গে বাংলাদেশ প্রতিদিনের এক মনোরম আড্ডায় উঠে এসেছে তার জীবনের নানা দিক। সে সব নিয়েই আজকের রকমারি।

 

সুপ্রাচীনকাল থেকেই সুগন্ধি ব্যবহার করে আসছে মানুষ। পারফিউম বা সুগন্ধি অভিজাত মানুষের প্রথম পছন্দ। দেশে দেশে পারফিউমপ্রেমীদের কাছে সুপরিচিত ব্র্যান্ড আল্ হারামাইন। অভিজাত নারী-পুরুষের রুচি আর চাহিদার কথা মাথায় রেখে আল্ হারামাইন প্রস্তুত করে ভিন্ন ভিন্ন ঘ্রাণের সুগন্ধি।

  ইতিমধ্যে তাদের সুগন্ধি বিশ্বজুড়ে প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেছে। আর এই সুগন্ধি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ‘আল্ হারামাইন পারফিউমস গ্রুপ অব কোম্পানিজের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মাহতাবুর রহমান নাসির এখন বিশ্বব্যাপী  সুপরিচিত এক নাম। প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে অন্যতম ধনী ব্যক্তি হিসেবেও তার সুনাম রয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতি মাহতাবুর রহমান নাসির ‘আল্ হারামাইন পারফিউমস’-এর মাধ্যমে ব্যবসায়িক ক্যারিয়ার শুরু করেন। মৌলভীবাজারের রাজনগরে অবস্থিত হামিদিয়া টি কোম্পানি লিমিটেড ও আল্ হারামাইন (প্রা.) হাসপাতাল লিমিটেডের চেয়ারম্যানও তিনি। এ ছাড়াও তিনি ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক ও বিয়ানীবাজার ক্যান্সার হাসপাতালের অন্যতম ট্রাস্টি এবং আবুধাবির শেখ খলিফা বিন জায়িদ বাংলাদেশ ইসলামিয়া (প্রাইভেট) স্কুলের অন্যতম স্পন্সর।

 

আল্ হারামাইন প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে বড় বাজার ছড়িয়ে আছে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের সুগন্ধির বিশাল বাজারে অভিজাত ব্র্যান্ডের সুগন্ধি ও প্রসাধনসামগ্রী বাজারজাত প্রতিষ্ঠান হিসেবে আল্ হারামাইন এক নামে পরিচিত। তাদের সুগন্ধি ও প্রসাধনসামগ্রীর ক্রেতাদের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ধর্মপ্রাণ মুসলমান ও অভিজাত শ্রেণির মানুষ। সৌখিন জীবনযাপনের অত্যাবশ্যকীয় প্রসাধনী হিসেবে আল্ হারামাইন জনপ্রিয়। বিশ্বব্যাপী তো বটেই, বাংলাদেশের সুগন্ধি বাজারেও আল্ হারামাইন পারফিউমস উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করেছে। বর্তমানে যমুনা ফিউচার পার্কে নিজস্ব শো-রুম রয়েছে।

 

উন্নত ফর্মুলা ও সুদৃশ্য মোড়ক বা প্যাকেজিং এবং আধুনিক বিপণন ব্যবস্থা ও অভিনব সুগন্ধি প্রস্তুতের পাশাপাশি বর্তমানে গ্রুপটি দেশের স্বাস্থ্য খাত, চা বাগান, শিক্ষা, ব্যাংকিং এবং পুঁজিব্যবস্থাপনা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। প্রবাসী উদ্যোক্তাদের প্রতিষ্ঠিত এনআরবি ব্যাংকের চেয়ারম্যানও এখন মাহতাবুর রহমান নাসির।

 

খুব সাধারণভাবেই তার জীবনের পথচলা শুরু। বাবার হাত ধরেই সুগন্ধি ব্যবসায় নামেন মাহতাবুর রহমান।   তার বাবার নাম মরহুম মওলানা কাজী আবদুল হক। সিলেটের বিয়ানীবাজারের নাটেশ্বর গ্রামে তার গ্রামের বাড়ি। সিলেটের সুজানগরে আগর কাঠ হতো। ওই আগর কাঠ দিয়ে অনেক মূল্যবান আতর হতো। কিন্তু বাংলাদেশে ওই আগর কাঠের বাজার ছিল না। ভারতসহ আশপাশের দেশগুলোতে আগর কাঠের বাজার ছিল। ১৯৫৬ সালে মাহতাবুর রহমানের বাবা যখন প্রথমবারের মতো সৌদি আরবে হজ করতে যান তখন তিনি সঙ্গে করে বেশ কিছু আগর কাঠ নিয়ে গিয়েছিলেন। বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের কাছে বাংলাদেশিদের আগরের জনপ্রিয়তা তৈরি হয়। এ জনপ্রিয়তা দেখে তার বাবা সেখানে সুগন্ধির ব্যবসা শুরুর পরিকল্পনা করেন। ১৯৭০ সালে তিনি পবিত্র মক্কা নগরী থেকে সুগন্ধির ব্যবসা শুরু করেন। মাহতাবুর রহমান ১৯৭৫ সালে প্রথমবার বাবার সঙ্গে সৌদি আরবে যান। সে সময় তিনি একেবারেই তরুণ। সবেমাত্র  উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে বিএ পরীক্ষা দিয়েছেন। সুগন্ধি ব্যবসায় সাফল্য ধরা দিতে খুব বেশি সময় লাগেনি তার। ক্রমান্বয়ে ব্যবসা সম্প্রসারণ করেন মাহতাবুর রহমান। অর্থনৈতিক সাফল্য তার ব্যবসাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে সুগন্ধির ব্যবসায় প্রতিষ্ঠা লাভ করেন তিনি। সংযুক্ত আরব আমিরাতে তিনি প্রথম শো-রুম খোলেন ১৯৮১ সালে। ক্রেতাদের চাহিদা বাড়ায় পরবর্তীতে দুবাইয়ে ১১ হাজার বর্গফুট জায়গার ওপর সুসজ্জিত প্রধান কার্যালয় স্থাপন করেন। ১ লাখ ৭০ হাজার বর্গফুট জায়গার ওপর কারখানা স্থাপন করেন। কারখানাটিতে সর্বাধুনিক মানের সুগন্ধি প্রস্তুুত করতে পূর্ণাঙ্গ ও সেমি অটোমেটিক অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করছেন। উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিত্যনতুন সুগন্ধি তৈরির জন্য গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগ খুলেছেন। পর্যায়ক্রমে মধ্যপ্রাচ্যের সবগুলো দেশে এই ব্যবসা সম্প্রসারণ করেন মাহতাবুর রহমান। অতি সম্প্রতি লন্ডনের গ্রিন স্ট্রিটে একটি বিশাল, মনোরম শো-রুমের উদ্বোধন করেছেন মোহাম্মদ মাহতাবু র রহমান নাসির।

এ ছাড়া ফ্রান্সে রিচ্ অ্যান্ড রুইচ্ নামে আরও একটি নতুন ফ্যাক্টরি চালু করা হয়েছে। যার উৎপাদিত পণ্য ইউরোপ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও রাশিয়াসহ অনেক দেশেই বিপণন করে চলেছে।

 

আইএসও সনদপ্রাপ্ত এই সুগন্ধি বর্তমানে বিশ্বের ৮৫টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। বছরে প্রায় ৩ হাজার ৬০০ কনটেইনার পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। মাহতাবুর রহমান জানান, এত বড় ব্যবসা পরিচালনার জন্য তাদের কখনো দেশ-বিদেশের কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিতে হয়নি এবং ভবিষ্যতে ঋণ নেওয়ার ইচ্ছাও নেই তার।

 

আল্ হারামাইন পারফিউমস বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করছে। আর মাহতাবুর রহমান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের আরব কমিউনিটির কাছে একজন স্বনামধন্য ব্যবসায়ী হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত। মধ্যপ্রাচ্যে তিনি বাংলাদেশকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন। তিনি প্রবাসী বাংলাদেশিদের নানাভাবে সহযোগিতা করে থাকেন। তিনি প্রবাসে হাজার হাজার প্রবাসীর কর্মসংস্থানে মুখ্য ভূমিকা পালন করে আসছেন। আমরা তার উন্নতি কামনা করি।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow