Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শনিবার, ১৩ মে, ২০১৭ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১২ মে, ২০১৭ ২৩:৪৬
সংবাদপত্রের একাল সেকাল

দেশ-বিদেশের নানা ঘটনা তাত্ক্ষণিকভাবে জানার নির্ভরযোগ্য মাধ্যম সংবাদপত্র। ১৭৮০ সাল থেকে যাত্রা শুরু করে আজ পর্যন্ত পাড়ি দিতে হয়েছে নানা চড়াই-উতরাই। সে ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত লিখেছেন— তানিয়া তুষ্টি

 

সংবাদপত্র এই সময়ে

১৮৩৫ সালের আগস্ট মাসে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা স্বীকার করে আইন প্রণয়ন হয়। সে সময়কার গভর্নর জেনারেল মেটকাফ লাইসেন্সের প্রথা পুরোপুরি তুলে দেন এবং ডিক্লারেশনের পদ্ধতি অনেক সহজ করেন। পরবর্তীতে আইন পরিবর্তিত হলেও মেটকাফের আইন যুক্তিপূর্ণ হওয়ায় তা ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এরপর ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিপ্লবের সময়ে লর্ড ক্যানিং-এর করা বিধিনিষেধ সব সংবাদপত্রের জন্যই প্রযোজ্য ছিল। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক আন্দোলন শুরু হয় তার পরিপ্রেক্ষিতে দেশীয় পত্রিকাগুলো সরকারের সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠে। এই সমালোচনা বন্ধ করতে সরকার ১৯০৮, ১৯১০ ও ১৯১১ সালে অন্তত তিনটি আইন পাস করে। এ ছাড়াও ১৯৩১ সালের ভারতীয় প্রেস আইন দমন-পীড়নের অঙ্গ হিসেবে কাজ করে। রাজনৈতিক উত্তাল, আন্দোলন আর আপামর জনতার মনের কথা পত্রিকার মাধ্যমে উঠে এসেছে। সেসব খবর ছড়িয়েছে বিশ্বের নানা প্রান্তে। আর তাই শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষুর মুখে নানা চড়াই-উতরায় পার করে সংবাদপত্র আজকের এই অবস্থানে। আমাদের দেশে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়েও সংবাদপত্রের ছিল অনন্য ভূমিকা। নানাবিধ খবর আদান-প্রদান, বিশ্বের কাছে দমন-পীড়নের চিত্র তুলে ধরা সবই সম্ভব হয়েছে পত্রিকার মাধ্যমে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকে এ পর্যন্ত সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় এসেছে নানা বাধা-বিপত্তি। এরপরও তার ব্যাপ্তির স্বাক্ষর রেখে ২০১৭ সাল পর্যন্ত টিকে আছে পত্রিকাগুলো। বর্তমানে দেশে দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক, অনলাইন, রেডিও মিলিয়ে জাতীয় ও মফস্বলের পত্রিকার সংখ্যা ১ হাজার ১৮৭টি। তবে সংবাদমাধ্যমকে যৌক্তিক গতিতে চলা, সরকার, জনগণ ও দেশের স্বার্থে বাস্তবিক রাখতে দেশে বহাল আছে সরকারি আইন। সে আইনের মারফতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও নিয়ন্ত্রণ কার্যকর হচ্ছে। আজকের দিনে সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশনের যে ট্রেন্ড আমাদের সংস্কৃতিতে চালু হয়েছে তাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এই পেশাকে এখন নির্ভরতা, আধুনিকতা ও পেশাদারিত্বের কাতারে দাঁড় করানো সম্ভব হয়েছে। আমরা একদিন আগের খবর কাগজে এবং পাশাপাশি তাত্ক্ষণিক সংবাদ পাচ্ছি অনলাইন ভার্সনে। যে কোনো সময় মোবাইলের মাধ্যমেও জেনে নেওয়া যাচ্ছে সর্বশেষ সংবাদটি।

 

সরকার কাঁপানো

হিকির পত্রিকা বন্ধ হলেও এর ভূমিকা সম্পর্কে সরকার সচেতন হয়েছিল। সে জন্য বেসরকারি পত্রিকাকে সরকার সন্দেহের চোখে দেখত। তাই সরকার আর্থিক সহায়তা দিয়ে ১৭৮৪ সালে সরকারি ছাপাখানা থেকে ‘ক্যালকাটা গেজেট’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করে। প্রতিকূলতার মাঝেও ১৭৯০-এর দশকের শেষ দিকে কলকাতা থেকে বেশ কয়েকটি সাপ্তাহিক এবং মাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। তাদের মধ্যে সরকারের সমালোচনা করে বেশকিছু সম্পাদককে বিলেতে ফেরত যেতে হয়। ১৭৯৪ সালে ‘ইন্ডিয়ান ওয়ার্ল্ড’ পত্রিকার সম্পাদক উইলিয়াম ডুয়েনকে সৈন্যরা গ্রেফতার করে জাহাজে তুলে বিলেত পাঠায়। এরপর ‘বেঙ্গল হুর্কার্স’ পত্রিকার মালিক ডক্টর চার্লস ম্যাকনিলেরও একই অবস্থা হয়।

রেগুলেশন জারি

পত্রিকা প্রকাশের দুই দশকের মধ্যে সরকার এবং সংবাদপত্রের সম্পর্ক এতই তিক্ত হয় যে, ১৭৯৯ সালের মে মাসে নতুন গভর্নর জেনারেল মার্কুইস অব ওয়েলসলি পত্রিকা নিয়ন্ত্রণের জন্য ‘প্রেস রেগুলেশন্স’ চালু করেন। তবে পত্র-পত্রিকার ওপর কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ থাকে। গভর্নর জেনারেল হওয়ার পর লর্ড হেস্টিংস ১৮১৩ সালে প্রেস রেগুলেশন্সকে আরও জোরদার করেন। এরপর ১৮১৮ সালে আইন খানিকটা সংশোধন হয়। বছরের শেষ দিকে জেমস সিল্ক বাকিংহ্যাম ‘ক্যালকাটা জার্নাল’ নামে একটি অর্ধ-সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। বাকিংহ্যামই ভারতবর্ষের প্রথম সম্পাদক যিনি ন্যায় এবং নীতির কারণে সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করেন। শেষে তাকেও ভারত ছাড়তে বাধ্য করা হয়।

বাতিল হয় সে রেগুলেশন

রামমোহন রায়সহ কলকাতার কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি ‘প্রেস রেগুলেশন্স’ আইন বাতিল করার জন্য আবেদন জানান। কিন্তু আদালত নাকচ করে সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ আইনকে আরও সম্প্রসারণের আদেশ দেয়। সে আইনে কোম্পানির কোনো কর্মচারী পত্র-পত্রিকার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারবে না। প্রতিবাদ হিসেবে রামমোহন নিজের ফারসি পত্রিকা ‘মিরাতুল আখবার’-এর প্রকাশ বন্ধ করে দেন। তারপর ১৮৩৫ সালে চার্লস মেটকাফ গভর্নর জেনারেল হলে উইলিয়াম অ্যাডাম, ডেভিড হেয়ার, দ্বারকানাথ ঠাকুর, রসিককৃষ্ণ মল্লিক, রসময় দত্ত প্রমুখ মিলে জন অ্যাডামের কাছে আবার আবেদন জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে স্বীকার করে একটি আইনের খসড়া তৈরি করা হয়।

 

পত্রিকার আগেই প্রেস

অন্যান্য ইংরেজ যুবকের মতোই জেমস অগাস্টাস হিকি ১৭৭২ সালে ভারতে এসেছিলেন ভাগ্য ফেরাতে। প্রথমে একজন শৈল্য চিকিৎসকের সহকারী হিসেবে কাজ করা, পরবর্তীতে জীবিকার জন্য জাহাজ থেকে মাল খালাসের কাজ। কিন্তু ১৭৭৫-৭৬ সালে তার মালপত্র পানিতে ডুবে যাওয়ায় ব্যবসায় ব্যাপক লোকসান হয়। দেনার দায়ে ১৭৭৬ সালে জেলে গেলেও তার উকিল উইলিয়াম হিকির সহায়তায় তিনি কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন। তখনও তার হাতে কিছু টাকা-পয়সা অবশিষ্ট ছিল। এরপর খুব সম্ভবত ১৭৭৭ সালে কলকাতায় প্রথম প্রেস স্থাপন করেন। দ্রুত ধনী হওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হিসেবে এই ছাপাখানাকে বেছে নেন। সে সময় কিছু টাইপ সংগ্রহ করেন এবং লোকদের সাহায্যে একটি কাঠের প্রেস তৈরি করিয়ে নেন। এই প্রেসই ছিল বঙ্গদেশের প্রথম ছাপাখানা। একমাত্র প্রেসের মালিক হিসেবে বেশ লাভও করেন।

 

প্রথম পত্রিকা

কলকাতায় কোনো পত্রিকা নেই। এই ব্যবসায় লাভবান হওয়া যাবে বলে হিকির পর্যবেক্ষণ ছিল। প্রায় আড়াই বছর একচেটিয়া ছাপাখানা চালানোর পর হিকি একটি পত্রিকা বের করলেন। পত্রিকার নাম দিলেন নিজের নামের সঙ্গে মিলিয়ে। ১৭৮০ সালের ২৯ জানুয়ারি বের হওয়া এ পত্রিকার নাম দেন ‘হিকি’জ বেঙ্গল গেজেট’।

পত্রিকার মালিক এবং সম্পাদক ছিলেন জেমস অগাস্টাস হিকি নিজেই। পত্রিকা প্রকাশিত হওয়ার কিছুদিন পরই সরকারি রোষে পড়েন। অবশ্য এখানে হিকির স্বেচ্ছাচারিতা ছিল অনেক বেশি। পত্রিকায় প্রকাশিত খবর বা ফিচারের মান যেমনই হোক না কেন, হিকি অল্পকালের মধ্যেই আবিষ্কার করেন তার হাতে একটি শক্তিশালী অস্ত্র রয়েছে। এই অস্ত্রের মাধ্যমে জনগণ পর্যন্ত যে কোনো বার্তা তার পক্ষেই বেশি পৌঁছানো সম্ভব। আর তাই খুব দ্রুত সে অস্ত্রের ব্যবহার শুরু করলেন।

 

প্রথম পত্রিকার অপমৃত্যু

হিকির প্রচারিত খবরে গভর্নর জেনারেল হেস্টিংস থেকে শুরু করে কোম্পানির যে কোনো কর্মচারীর সমালোচনা করতে শুরু করলেন। হেস্টিংসকে সাধারণত আক্রমণ করত তার স্ত্রীর নাম করে। তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রূপ, কটাক্ষ এবং ভিত্তিহীন গুজব প্রকাশের কারণে জনগণের কাছ থেকে বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেন। হিকির সরকারবিরোধী মনোভাব লক্ষ্য করে কোম্পানি-সরকারই বার্নার্ড মেসিংক এবং পিটার রিডকে পরোক্ষভাবে সাহায্য দিয়ে ‘দ্য ইন্ডিয়ান গেজেট’ পত্রিকা প্রকাশ করায়। সরকার ডাক বিভাগের মাধ্যমে এই পত্রিকা পাঠানোর সুযোগ দেয়। অন্যদিকে হিকির সঙ্গে সরকারের সম্পর্কে টানাপড়েন দেখা দেয়। এরই জের ধরে পরের বছর হিকির বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেন হেস্টিংস। এতে হিকি কারাগারে গেলেও একইভাবে ‘বেঙ্গল গেজেট’-এর প্রকাশ অব্যাহত থাকে। ১৭৮২ সালে সরকার হিকির ছাপাখানার সব টাইপ কেড়ে নেয়। এভাবেই ভারতবর্ষের প্রথম পত্রিকার অপমৃত্যু ঘটে।

up-arrow