ভূমি থেকে প্রায় চারশ ফুট উঁচু, ৩৬৫ একর বিস্তৃত এবং যাতায়াতে দুর্গম বারেক টিলা। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী এক নৈসর্গিক জনপদ। এই টিলায় অবস্থিত বসুন্ধরা শুভসংঘ স্কুল। এখানে নেই কোনো স্থায়ী শহীদ মিনার। এমনকি বিদ্যালয় ও আশপাশের কয়েক কিলোমিটারের মধ্যেও নেই ভাষা শহিদদের স্মরণে নির্মিত কোনো স্মৃতিস্তম্ভ।
রাত পোহালেই একুশে ফেব্রুয়ারি। মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে সামনে রেখে বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষক ও অভিভাবকদের সহায়তায় বাঁশের কোটা, রশি ও কাগজ দিয়ে নিজ হাতে তৈরি করে অস্থায়ী শহিদ মিনার।
রক্তে অর্জিত ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিকে ধারণ করে এই অস্থায়ী শহীদ মিনারেই তারা অর্পণ করবে পুষ্পার্ঘ্য। একুশের প্রথম প্রহরে বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও বারেক টিলার বাসিন্দারা প্রভাতফেরি শেষে স্কুল মাঠে নির্মিত শহিদ মিনারে ফুল দিয়ে দিনের কর্মসূচি শুরু করবে।
বিদ্যালয়টিতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও বাঙালি মিলে শতাধিক শিক্ষার্থী প্রাক-প্রাথমিক থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করছে। শিক্ষার্থীদের ইচ্ছা-শহীদ দিবসে যথাযথ শ্রদ্ধা জানানো, প্রভাতফেরি করা, গান ও কবিতা আবৃত্তির আয়োজন করা। কিন্তু স্থায়ী শহিদ মিনার না থাকায় তারা নিজেরাই উদ্যোগ নেয়। শিক্ষকদের উৎসাহ ও দিকনির্দেশনায় সবাই মিলে গড়ে তোলে এই অস্থায়ী শহিদ মিনার।
বারেক টিলা অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগতভাবে পিছিয়ে পড়া একটি অঞ্চল। এখানে ৬৭টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী পরিবারসহ আরও শতাধিক পরিবার বসবাস করে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠিরা তুলনামূলকভাবে অগ্রসর হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব চর্চা কমে যাচ্ছে। তবে শহীদ মিনার নির্মাণে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী শিশুদের আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো।
তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী সিলভা সাংমা, জাকিয়া বেগম ও রামিন মিয়া জানায়, “শিক্ষকদের সহযোগিতায় আমরা নিজেরাই শহীদ মিনার তৈরি করেছি। মোবাইলে দেখে বানিয়েছি। খুব ভালো লাগছে নিজের হাতে তৈরি করতে পেরে।”
শিক্ষার্থী ইকন আজিম, ব্রাইসটন সাংমা ও তাবাসসুম আক্তারের চোখেমুখেও আনন্দের ছাপ। বুকে কালো ব্যাজ ধারণ করে তারা শহিদদের স্মরণ করে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রমিথা নকরেক ও রেক্সিনা নকরেক বলেন, “এভাবে শহীদ মিনার তৈরি করে ভাষা শহীদদের স্মরণ করা এই বিদ্যালয় ও এলাকায় প্রথম। ভবিষ্যতেও এ ধারা অব্যাহত রাখার চেষ্টা থাকবে।”
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র বারেক টিলার উত্তরে ভারতের মেঘালয়ের খাসিয়া পাহাড়, পূর্বে রূপময় যাদুকাটা নদী, পশ্চিমে আঁকাবাঁকা সড়ক ও টিলা, দক্ষিণে মাহারাম নদী ও হাওর-সব মিলিয়ে এক মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ। ৩৬৫ একর আয়তনের এই টিলায় প্রায় তিন হাজারেরও বেশি মানুষের বসবাস। ভূমি থেকে চারশ ফুট উঁচু এই দুর্গম এলাকায় দুই কিলোমিটারের মধ্যে নেই কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়।
২০২৪ সালে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কথা বিবেচনায় এখানে বসুন্ধরা শুভসংঘ স্কুল চালু করা হয়। বর্তমানে তিনজন শিক্ষক ও শতাধিক শিক্ষার্থী বিনামূল্যে শিক্ষা গ্রহণ করছে। পাশাপাশি তারা পায় পোশাক, জুতা ও শিক্ষা উপকরণ।
ছাত্র অভিভাবক মালবিকা আজিম বলেন, “খুব ভালো উদ্যোগ। গুণী ও বরণ্যদের স্মরণ করার মাধ্যমেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেশপ্রেম গড়ে উঠবে।”
সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মাসুক মিয়া বলেন, “এমন দুর্গম অঞ্চলে বিদ্যালয় চালু হওয়ায় টিলার শিশুরা শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে। সাংস্কৃতিক কার্যক্রম তাদের দেশপ্রেমিক ও সংস্কৃতিমুখী করে তুলবে।”
বসুন্ধরা শুভসংঘ তাহিরপুর উপজেলা শাখার উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মসূচির সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন উপদেষ্টা গোলাম সরোয়ার লিটন, সভাপতি শেখর রায়, সাধারণ সম্পাদক রুপম আখঞ্জি, শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক নবী হোসেন মনির ও সদস্য তৃপ্ত বনোয়ারি। বাস্তবায়নে সহযোগিতা করেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রমিথা নকরেক, রেক্সিনা নকরেক ও মর্জিনা বেগম।
দুর্গম পাহাড়ি টিলায় দাঁড়িয়ে শিশুদের হাতে গড়া অস্থায়ী শহীদ মিনার যেন প্রমাণ করে-ভাষার প্রতি ভালোবাসা ও শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা কোনো সীমাবদ্ধতায় থেমে থাকে না।
বিডি-প্রতিদিন/তানিয়া