শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ২১ মে, ২০১৬ ০০:০০ টা
আপলোড : ২০ মে, ২০১৬ ২৩:৫২

ধর্মতত্ত্ব

পাপমুক্তির রাত

মুফতি আমজাদ হোসাইন

পাপমুক্তির রাত

আগামী ১৪ শাবান ১৪৩৭ হিজরি মোতাবেক ২২ মে রবিবার দিবাগত রাত পবিত্র লাইলাতুল বরাত বা মুক্তির রাত। প্রতিটি মুসলিম ভাইকে চিন্তা করে নিজের জীবনের অপরাধসমূহের একটি তালিকা তৈরি করতে হবে। যদিও এ কাজটি অনেক কঠিন তারপরও জান্নাতে যাওয়ার আশায় জাহান্নাম থেকে মুক্তির আশায় এমনটি করার চেষ্টা করতে হবে। বান্দা যখন কোনো কাজ করার চেষ্টা করে আল্লাহপাক বান্দার চেষ্টায় বরকত দান করেন এবং কাজটি সহজ করে দেন। পবিত্র কোরআনে সূরা বাকারার ৪৫ ও ৪৬নং আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে, তোমরা ধৈর্যের সঙ্গে সাহায্য প্রার্থনা কর নামাজের মাধ্যমে। অবশ্য তা যথেষ্ট কঠিন। কিন্তু সেসব বিনয়ী লোকের পক্ষেই তা সম্ভব। যারা এ কথা খেয়াল করে যে, তাদের সম্মুখীন হতে হবে স্বীয় পরওয়ারদেগারের (সামনে) এবং তারই দিকে ফিরে যেতে হবে। আলোচ্য আয়াতে তিনটি মৌলিক বিষয়ের প্রতি আল্লাহপাক ইঙ্গিত করছেন। এক. ধৈর্য, অর্থাৎ জীবনের সব ক্ষেত্রে ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে। বিশেষ করে ইবাদতের ক্ষেত্রে। বান্দার ইবাদতে বিঘ্ন সৃষ্টি করার জন্য ইবলিস-শয়তান বিভিন্নভাবে কুমন্ত্রণা দেয়। সে বান্দার সামনে দুনিয়াবি বিভিন্ন চাকচিক্যময় বস্তু পেশ করে বান্দাকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে। সামনে পবিত্র লাইলাতুল বরাত বা মুক্তির রজনী আসছে। এ রাতে যে বান্দা ইবলিসের সব যড়যন্ত্রের মোকাবিলা করে ধৈর্যের সঙ্গে পুরো রাত ইবাদত করতে পারবে সে-ই প্রকৃত মরদে মোমেন। দুই. সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে হবে।

সালাতের মাঝে যেমনিভাবে আল্লাহর বড়ত্ব মহত্ব ঘোষণা করা হয়, অনুরূপ বান্দার তাওয়াজু বা বিনয়ও প্রকাশ পায়। লাইলাতুল বরাতে নামাজের মাধ্যমে নিজের সবকিছু আল্লাহর কাছ থেকে চেয়ে নিতে হবে এবং নিজেকে পাপ থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিন. বিনয়ের মাধ্যমে তামাম ইবাদত করতে হবে। হজরত ইব্রাহীম নখয়ী রহ. বলেন, মোটা কাপড় পরিধান করা, মাথানত করার সঙ্গে বিনয়ের সম্পর্ক নয় বরং বিনয়ের সম্পর্ক দিলের সঙ্গে। বিনয়ের সারকথা হলো ইচ্ছাকৃতভাবে কৃত্রিম উপায়ে মানুষকে দেখানোর জন্য বিনয়ীদের রূপ ধারণ করা শয়তান ও প্রবৃত্তির প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়। তা অত্যন্ত নিন্দনীয় কাজ। বরং তাওয়াজু বা বিনয়ী প্রকাশ করতে হবে আল্লাহকে রাজি-খুশি করার জন্য, কোনো মাখলুককে দেখানোর জন্য নয়। সুতরাং পবিত্র লাইলাতুল বরাতে একাধারে ধৈর্যের সঙ্গে, সালাতের মাধ্যমে এবং বিনয় প্রকাশ করার মাধ্যমে ইবাদতে নিজেকে ডুবিয়ে রাখতে হবে। আমাদের সমাজে এ রাতটি পবিত্র শবেবরাত নামে প্রসিদ্ধ। এ রাত এলে আলোকসজ্জা, আতশবাজি, মোমবাতি জ্বালানো, ছোট বাচ্চাদের পটকা ফোটানো, হালুয়া রুটি তৈরি করার মধ্যেই শবেবরাতের মাহাত্ম্য লুকায়িত আছে বলে মনে করে। বিশেষ করে মা-বোনেরা ১৪ শাবান বিকাল থেকে হালুয়া রুটি তৈরির পেছনে সময় ব্যয় করে। এভাবে খেয়েদেয়ে, গল্প-গুজব আর আলাপচারিতায় পুরো রাত শেষ হয়ে যায়। অনেক সময় এশার এবং ফজরের নামাজও ছুটে যায়। অথচ তিরমিজি, ইবনে মাজাহ ও বায়হাকি শরিফের এক হাদিসে শবেবরাতের ফজিলত ও আমল সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে। রসুল (সা.) ইরশাদ করেন, যখন শাবান মাসের অর্ধেক হয়ে যায়, অর্থাৎ শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত হয়, তখন তোমরা সেই রাত জাগরণ কর ও পরের দিন রোজা রাখ। নিশ্চয়ই আল্লাহপাক এ রাতে প্রথম আকাশে এসে বান্দাদের ডেকে ডেকে বলতে থাকেন, যারা পাপ থেকে মুক্তি চাওয়ার আছ মুক্তি চাও, মুক্ত করে দেব, যারা অভাব-অনটন থেকে মুক্তি চাও, মুক্তি দিয়ে দেব। যারা নিজেদের রিজিক বৃদ্ধি করতে চাও, রিজিক বাড়িয়ে দেব। এভাবে আল্লাহপাক ফজরের ওয়াক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত বান্দাদের বলতে থাকেন তুমি আমার কাছে আজ রাতে যা চাইবে তা-ই আমি তোমাকে দিয়ে দেব। আলোচ্য হাদিস দ্বারা যেমনিভাবে শবেবরাত প্রমাণিত হয় অনুরূপ শবেবরাতের আমল সম্পর্কেও সংক্ষিপ্তভাবে দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়। নববী আদর্শে সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িন, তাবে তাবেয়িনসহ সব পীর আউলিয়া এ শিক্ষাই দিয়ে গেছেন ও সব কিছু বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন। আল্লাহ আমাদের সঠিকভাবে ইবাদত করার তৌফিক দান করুন।  আমিন।

লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া মাদানিয়া, বারিধারা, ঢাকা।


আপনার মন্তব্য